লকডাউন স্থগিত: বিসিসি- স্বাস্থ্যবিভাগের সমন্বয়হীনতার খেসারত দিচ্ছে নগরবাসী

শেয়ার করুনঃ

নাগরিক রিপোর্ট: বরিশাল নগরীতে গত ৭দিনে দৈনিক গড়ে প্রায় ৩২জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। সংক্রামনের হার বিবেচনায় গত ১৫ জুন বরিশাল নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৭টি রেড জোন চিহিৃত হয়। তখন থেকেই নগরী লকডাউন করার প্রস্ততি চলছে। কিন্তু লকডাউন কার্যকরের দায়িত্বে থাকা বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) এক সপ্তাহ নগরীর একটি ওয়ার্ডও লকডাউন কার্যকর করতে পারেনি।
পরীক্ষামুলকভাবে ১২ ও ২৪ নম্বর ওয়ার্ড মঙ্গলবার (২৩ জুন) থেকে লকডাউন করার সিদ্ধান্ত থাকলেও সোমবার গভীর রাতে এ সিদ্ধান্ত স্থগিত করে বিসিসি। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় অন্যান্য সরকারি দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমম্বয় না করে বিসিসি একক সিদ্ধান্তে কার্যক্রম পরিচালনায় নগরীতে লকডাউন প্রচেস্টা আলোর মুখ দেখছে না। ফলে করোনা সংক্রামন রোধে কার্যকরী ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন নগরীর সব মহল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেয়া তথ্যানুযায়ী গত ১৫ জুন বরিশাল মহানগরীতে শনাক্ত হওয়া করোনা রোগী ছিল ৭৫২ জন। মঙ্গলবার (২২ জুন) এ সংখ্যা উন্নীত হয় ৯৭৪ জনে। অর্থাৎ এক সপ্তাহে রোগী বেড়েছে ২২২ জন। প্রতিদিন রোগী বৃদ্ধির গড় হার প্রায় ৩১ দশমিক ৭১ জন।
রোগীর বৃদ্ধির এ হার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় দপ্তরের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. শ্যামল কৃঞ্চ মন্ডল। তিনি বলেন, এখন শুধুমাত্র ২৭টি ওয়ার্ড নয়, পুরো নগরীরই ঝুকিপূর্ন। সংক্রামন বৃদ্ধি রোধ করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর রেড জোন চিহিৃত করে লকডাউন করার সুপারিশ করেছে। বাস্তবায়নের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের।
এদিকে ১৫ জুন ২৭টি ওয়ার্ড রেড জোন চিহিৃত হলেও বিসিসি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ গত ১৭ জুন রাতে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা সিভিল সার্জনসহ প্রশাসনের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে ভার্চুয়াল সভা করে ১২ ও ২৪ নম্বর ওয়ার্ড ২১ দিন লকডাউন করার সিদ্ধান্ত নেন। মঙ্গলবার (২৩ জুন) সকাল ৬টা থেকে কার্যকরের ঘোষণা থাকলেও সোমবার রাত ১১টায় লকডাউন স্থগিতের ঘোষণা দেন প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মতিউর রহমান। তিনি জানান, লকডাউন এলাকায় জনপ্রশাসন মন্ত্রাণালয় থেকে ছুটি অনুমোদন না হওয়ায় স্থগিতাদেশ দেয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বরিশাল জেলা সিভিল সার্জন ডা. মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘সিটি মেয়র একক সিদ্ধান্তে দুটি ওয়ার্ড লকডাউন ঘোষনা দিয়েছেন। বিষয়টি দাফতরিকভাবে চিঠি দিয়ে আমাকে জানানো হয়নি। ২১ জুন বিকালে সভার রেজুলেশন বিসিসি থেকে পাঠনো হয়। এ অবস্থায় আমি নিজ উদ্যেগে লডকাউনের বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দফতরে পাঠাই। সোমবার (২৩জুন) রাত পর্যন্ত সেখান থেকে অনুমোদন পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রাণায়ের অনুমোদন ছাড়া লকডাউন করা যায়না।
সিভিল সার্জন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মাত্র দুটি ওয়ার্ড কেন লকডাউন হবে, অন্য ওয়ার্ডে কি করোনা রোগী নেই? আর দুটি ওয়ার্ডের স্থগিতের খবর বিসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মতিউর রহমান আমাকে জানিযেছেন মঙ্গলবার দুপুরে’।
জেলা সিভিল সার্জনের এ অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে বিসিসির স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মতিউর রহমান এবং দুই প্যানেল মেয়র গাজী নঈমুল ইসলাম লিটু ও রফিকুল ইসলাম খোকনকে ফোন দেয়া হলে তারা রিসিভ করেননি। দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা: ফয়সাল হাজবুন বলেন, আমিও শুনেছি ১২ ও ২৪ নং ওয়ার্ড লকডাউনের সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়েছে। কবে হবে তা পরে জানানো হবে। তিনি উল্টো গণমাধ্যমের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘নগরীতে শুরুতে যখন করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছিল, তখন তো গনমাধ্যম চুপ ছিল। এখন কেন গনমাধ্যম এ বিষয়ে কথা বলছে’?
১২ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর জাকির হোসেন বলেন, লকডাউনে মন্ত্রাণালয়ের অনুমোদন পাওয়া নিয়ে পুলিশ কমিশনারসহ প্রশাসনের অন্যদের সমন্বয়ের প্রয়োজন ছিল।
এদিকে নগরীতের করোনা সংক্রামনের হার বৃদ্ধি পেলেও বিসিসি কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে নাগরিক সমাজে। বরিশালের প্রবীন রাজনীতিক ও শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ মহসিন উল ইসলাম হাবুল বলেন, বরিশালে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের মধ্যে সমম্বয়য়ের অভাব আছে। যার খেসারত দিতে হচ্ছে জনগণকে। কেউ এককভাবে মহামারি মোকাবেলা করতে পারবেন না’। তিনি বলেন, নগরীতে করোনায় ভয়াবহতার দায় স্থানীয় এমপি, সিটি মেয়র, জেলা প্রশাসন, সিভিল সার্জন এড়াতে পারবেন না। প্রবীন সাংবাদিক ও বরিশাল প্রেস ক্লাব সভাপতি মানবেন্দ্র বটব্যাল বলেন, করোনা সংক্রামন বিস্তার রোধে সিটি করপোরেশন স্বাস্থ্য বিভাগ ও জেলা প্রশাসনকে সমম্বয় করে কাজ করা জরুরী। এর ব্যাত্যয় ঘটলে সাধারন জনগণের জন্য তার খেসারত হবে অত্যন্ত দু:খ্যজনক ও ভয়াবহ। বাসদ এর বরিশাল জেলা সদস্য সচিব মনিষা চক্রবর্তী বলেন, লকডাউন বাস্তবায়নে সিটি করপোরেশন সমোন্বিত উদ্যোগ না নেয়ায় নগরীতে করোনার সংক্রমন ভয়াবহ আকার ধারন করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *