নাগরিক রিপোর্ট: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার দায়ে ক্যাপ্টেন (বরখাস্তকৃত) আব্দুল মাজেদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, রবিবার রাত ১২টা এক মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসি দড়িতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।
এদিকে শনিবার রাতে কারা চিকিৎসক কারাগারের ভেতর ঢোকেন। এছাড়াও রাত সোয়া ১০টার দিকে ঢাকার সিভিল সার্জন এবং জেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ঢাকা জেলার সিভিল সার্জন, একজন মাওলানা, একজন ইমাম কারাগারের ভেতরে যান। পরে রাত ১০টা ৫২ মিনিটে কারাগারে প্রবেশ করেন কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তফা কামাল পাশা।
ফাঁসি কার্যকর করেন দশ জল্লাদ: জল্লাদ শাহজাহান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে মো. আবুল, তরিকুল ও সোহেলসহ দশ সদস্যের একটি দল আব্দুল মাজেদের ফাঁসির রায় কার্যকর করেন বলে জানা গেছে। মো. শাহজাহান ভূঁইয়া দীর্ঘ ৪১ বছর ধরে কারাবন্দি। জল্লাদ শাহজাহান এর আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫ ঘাতককে ফাঁসির দড়িতে ঝুঁলিয়েছেন। এদেশে তিনিই একমাত্র জল্লাদ যিনি একরাতেই দুই কারাগারে ৪ আসামিকে ফাঁসি দড়িতে ঝুলিয়েছেন।
স্বজনদের সাক্ষাৎ: এর আগে শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় স্বজনদের পাঁচ সদস্যের একটি দল কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারে মাজেদের সঙ্গে দেখা করেন। সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত তারা সেখানে অবস্থান করেন। মাজেদের স্বজনদের মধ্যে ছিলেন স্ত্রী সালেহা, স্ত্রীর বোন ও বোন জামাই, ভাতিজা ও এক চাচা শ্বশুরসহ মোট পাঁচ জন।
আব্দুল মাজেদকে গ্রেপ্তার: এর আগে গত ৬ এপ্রিল দিনগত রাত ৩ টায়রাজধানীর মিরপুর থেকে আব্দুল মাজেদকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। আদালতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধুর খুনি মাজেদকে সোমবার দিবাগত রাত ৩ টা ৪৫ মিনিটে রাজধানীর গাবতলী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপপরিদর্শক (এসআই) আদালতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, নিয়মিত টহলের অংশ হিসেবে তিনি দায়িত্বে ছিলেন। রাত ৩টা ৪৫ মিনিটে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডের সামনে দিয়ে সন্দেহজনকভাবে রিকশায় করে যাওয়ার সময় ওই ব্যক্তিকে থামান। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি অসংলগ্ন কথা বলতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি নিজের নাম-ঠিকানা প্রকাশ করেন এবং বলেন, তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। জিজ্ঞাসাবাদে মাজেদ স্বীকার করেন, গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্য ভারতসহ বিভিন্ন দেশে আত্মগোপন করে ছিলেন।
মাজেদকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ: গত ৭ এপ্রিল বেলা সোয়া ১২টার দিকে তাকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। এরপর মামলার শুনানির ১ ঘণ্টা পর দুপুর ১টা ৫ মিনিটের দিকে তাকে প্রিজন ভ্যানে কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। শুনানির সময় খুনি মাজেদের পক্ষে আদালতে কোনো আইনজীবী ছিলেন না।
আব্দুল মাজেদের বিচার শুরু: মামলার বিবরণে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে ১৯৯৬ সালের ১৪ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার তিন প্রধান আসামি লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুরকে গ্রেফতার করা হয়। একই বছরের ২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর একান্ত সহকারী (পিএ) এ এফ এম মোহিতুল ইসলাম ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সংঘটিত নারকীয় হত্যাকান্ডের ঘটনায় থানায় একটি এফআইআর করেন।
১৯৯৬ সালের ১৪ নভেম্বর খুনিদের বিচারের হাতে ন্যাস্ত করতে পার্লামেন্টে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করা হয়। ১৯৯৭ সালের ১৫ জানুয়ারি সিআইডি এই মামলায় ২০ জনকে অভিযুক্ত করে মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে চার্জশিট দাখিল করে এবং একই বছরের ১২ মার্চ ছয় আসামির উপস্থিতিতে আদালতে বিচার শুরু হয়। ১৯৯৭ সালের ১৯ জুন পর্যন্ত বিচারক বিব্রত হওয়াসহ নানা কারণে আটবার বিচার কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। এভাবে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর মামলার রায়ে বিচারক কাজী গোলাম রসুল ১৫ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তার মৃত্যুদন্ডাদেশ দেন।
অন্যদিকে ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বেঞ্চ ২৪ দিনের শুনানি শেষে বিভক্ত রায় দেন। বিচারক এম রুহুল আমিন অভিযুক্ত ১৫ আসামির মধ্যে ১০ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বজায় রাখেন। কিন্তু অপর বিচারক এ বি এম খায়রুল হক অভিযুক্ত ১৫ জনকেই সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডাদেশ দেন। পরে হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চে ১২ আসামির মৃত্যুদন্ডাদেশ বহাল থাকে।
পরবর্তীতে ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে বিচার কাজ বন্ধ থাকে। দীর্ঘ ছয় বছর পর ২০০৭ সালের ২৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের মুখ্য আইনজীবী বর্তমান সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সুপ্রিম কোর্টে সংক্ষিপ্ত বিবৃতি প্রদান করেন এবং ২৩ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ ২৭ দিনের শুনানি শেষে ৫ আসামিকে নিয়মিত আপিল করার অনুমতিদানের লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেন। ২০০৯ সালের ১২ নভেম্বর চূড়ান্ত আপিল শুনানি শেষ হয় এবং আদালত ১৯ নভেম্বর রায়ের তারিখ নির্ধারণ করেন। ওইদিন (১৯ নভেম্বর) বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চে হাইকোর্টের দেয়া রায় বহাল রেখে মৃত্যুদন্ডাদেশপ্রাপ্ত ৫ আসামির দায়ের করা আপিল আবেদন খারিজ করা হয়। পরে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের রিভিউ খারিজ হলে ২৮ জানুয়ারি ৫ আসামির ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়।
মৃত্যুদন্ডের পরোয়ানা জারি : গত ৮ এপ্রিল আব্দুল মাজেদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের সাজার পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। ওই দিন দুপুরে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ মো. হেলাল চৌধুরী বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে এ পরোয়ানা ইস্যু করেন। এদিন সকালেই রাষ্ট্রপক্ষে আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল প্রথমে মাজেদকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন। তবে আদালত বন্ধ থাকায় ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ কোনো পদক্ষেপ না নিতে পারার বিষয়টি সুপ্রিমকোর্টের নজরে আনেন। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন এরপর ওই বিচারকের ছুটি শুধু ৮ এপ্রিলের জন্য বাতিল করেন। এরপর আদালত মাজেদের বিরুদ্ধে প্রডাকশন ওয়ারেন্ট (হাজিরা পরোয়ানা) ইস্যু করলে তাকে কেরানীঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পুরান ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় আদালত প্রথমে তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন।
প্রাণভিক্ষা চেয়ে ছিলেন মাজেদ : গত ৮ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেছেন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আত্মস্বীকৃত খুনি মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন (বরখাস্তকৃত) আব্দুল মাজেদ। গত ৯ এপ্রিল আব্দুল মাজেদের প্রাণভিক্ষার আবেদন রাষ্ট্রপতি বাতিল করে দেন। পরে ওই চিঠি ওই দিনই কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে মাজেদের পলায়ন: বিদেশে পলাতক বঙ্গবন্ধুর ছয় আসামির একজন ছিলেন আব্দুল মাজেদ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু বিপথগামী সেনা সদস্যদের হাতে নির্মমভাবে সপরিবারে খুন হন। এখন বঙ্গবন্ধুর পাঁচ দন্ডপ্রাপ্ত খুনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিয়ে আছেন।
এর মধ্যে রাশেদ চৌধুরী আমেরিকায় ও নূর চৌধুরী কানাডায় অবস্থায় করছেন বলে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে সংবাদ বেরিয়েছে। এছাড়া শরিফুল হক ডালিম, কর্নেল রশীদ, মুসলেহউদ্দীন রিসালদার পালাতক রয়েছেন।
ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপপরিদর্শক (এসআই) আদালতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, নিয়মিত টহলের অংশ হিসেবে তিনি দায়িত্বে ছিলেন। রাত ৩টা ৪৫ মিনিটে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডের সামনে দিয়ে সন্দেহজনকভাবে রিকশায় করে যাওয়ার সময় ওই ব্যক্তিকে থামান। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি অসংলগ্ন কথা বলতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি নিজের নাম-ঠিকানা প্রকাশ করেন এবং বলেন, তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। জিজ্ঞাসাবাদে মাজেদ আরও স্বীকার করেন, গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্য ভারতসহ বিভিন্ন দেশে আত্মগোপন করে ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষ ক্যাপ্টেন মাজেদকে জামিন না দিয়ে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করে। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন সরকারি কৌঁসুলি হেমায়েত উদ্দিন খান। আবদুল মাজেদ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর আরও কয়েকজন খুনির সঙ্গে ব্যাংকক হয়ে লিবিয়া চলে যান।
১৯৮০ সালে দেশে ফিরে আসার পর মাজেদকে বিআইডবিøউটিসিতে উপসচিব পদমর্যাদায় তিনি চাকরি করেন। পরে তিনি সচিব পদে পদোন্নতি পান। পরে যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ে পরিচালক পদে যোগদান করেন।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার শুরু করে। সে সময় আত্মগোপনে চলে যান মাজেদ। তার স্ত্রী ক্যান্টনমেন্ট আবাসিক এলাকায় বসবাস করছেন। মাজেদের চার কন্যা ও এক ছেলে রয়েছে। তার ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।
২০২০-০৪-১২
