ইলিশ নিয়ে সংঘবদ্ধ চক্রের গভীর স্বরযন্ত্র

Spread the love

নাগরিক রিপোর্ট: রুপালী ইলিশের দেখা সবে শুরু হল। করোনার চাপে দিশেহারা সাধারন মানুষ এখনও স্বাদ মেটাতেও পারেননি। বাজারে ইলিশের দামও হাতের নাগালে পৌছায়নি। অথচ এরই মধ্যে ইলিশ নিয়ে গভীর স্বরযন্ত্রে নেমেছে শক্তিশালী একটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। তারা অতি মুনাফার লক্ষ্যে ফন্দি এটেছে ইলিশ রপ্তানির। এজন্য নানা সেক্টরে লবিং চালাচ্ছে মৎস্য সেক্টরে সম্পৃক্তরা। তবে এই মুহর্তে ইলিশ রপ্তানির কোন প্রস্তাব দিবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন মৎস্য অধিদপ্তর।

মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় উপ পরিচালক আনিছুর রহমান তালুকদার বলেছেন, ইলিশ রপ্তানি সরকারের নীত নির্ধারকদের ব্যাপার। তবে তড়িঘড়ি করে এটি করা যাবে না। করোনায় সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ। ইলিশ টেকসই উৎপাদনমুখী না হলে রপ্তানি কোনভাবেই সম্ভাব নয়। তিনি বলেন, সরকার সারা বছর ইলিশ পাওয়ার জন্য নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। যেকারনে মৌসূমে কয়েকদিন ধরে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। মৎস্য কর্মকর্তা আনিছুর রহমানের ধারনা- ইলিশ এখন আছে, দু’দিন পরে নাও থাকতে পারে। এর ধারাবাহিকতা বজায় থাকতে হবে। দাম আরও সহনীয় হতে হবে। তখন হয়তো জনগনের চাহিদা মিটিয়ে মৎস্য অধিদপ্তর ইলিশ রপ্তানির প্রস্তাব করতে পারে।

রোববার বরিশাল মৎস্য মোকামে গিয়ে দেখা গেছে দুই দিন আগে ৩-৪টি বোট সাগর থেকে এসেছে। ভরা মৌসূমে এটি অতি সীমিত বলে ব্যবসায়ীরা জানান। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সব ইলিশ সাগরের। এর মধ্যে একটি অংশ নরম। তবে অধিকাংশই বড় আকারের। নদীর ইলিশ নাই বললেই চলে।

কথা হয় সেখানকার একাধিক ক্ষুদ্র মৎস্য ব্যসায়ীর সাথে। তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কয়েকজন প্রভাশীলী মৎস্য ব্যবসায়ীর একটি সিন্ডিকেট নানা অবৈধ পন্থায় পার্শবর্তী দেশে ইলিশ পাচার করে এসেছে। এখন তারা অতি মুনাফার লোভে ইলিশ বিদেশে পাঠানোর বৈধতা চায়। কিন্তু এখনই ইলিশ রপ্তানির উপযুক্ত সময় আসেনি। এমনটা হলে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়বেন। জনগনের চাহিদা মেটানোও সম্ভব হবে না।

মৎস্য আড়তাদর সমিতির সভাপতি অজিৎ দাস মনু বলেন, রোববার বরিশাল মৎস্য মোকামে প্রায় ২ হাজার মন ইলিশ আমদানী হয়েছে। গতকাল এলসি (৬০০-৯০০ গ্রাম) সাইজের ইলিশ প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৬০০ টাকা দরে। কেজি সাইজের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা দরে। গত ৫ থেকে ৬দিন ধরে ইলিশ আসা শুরু করেছে। তারা এবছর ইলিশ রপ্তানি করার চেস্টা করছেন। সরকারের কাছে এজন্য জোর দাবী করা হচ্ছে। রপ্তানি সংশ্লিস্ট ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ লবিং করছেন। কিন্তু সরকার তো সাড়া দিচ্ছে না। মৌসূমের শুরুতেই রপ্তানির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তা বলা যাচ্ছে না। তবে যা আসছে তা সাগরের, নদীতে ইলিশ সীমিত।

তবে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের এমন দাবীর তীব্র বিরোধীতা করেছেন বরিশালের বিভিন্ন শ্রেনীপেশার মানুষ। কনজ্যুমার এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর বরিশালের সাধারন সম্পাদক রনজিৎ দত্ত বলেন, রপ্তানি করতে হলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত অংশ বাহিরে পাঠানো যেতে পারে। ইলিশ কেবল ধরা শুরু হয়েছে। বরিশালসহ দেশের ক’জনে ইলিশ এর স্বাদ নিতে পেরেছেন! যে দর বর্তমানে চলছে তা সাধারন মানুষের কেনার সামর্থের মধ্যে পৌছায়নি। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফারে পায়তারা করতে ইলিশ রপ্তানির ফন্দি এটেছেন। জেলা প্রশাসনের টাক্সফোর্স কমিটির আগামী সভায় ক্যাব গনমানুষের চাহিদা মেটাতে এখনই ইলিশ রপ্তানির বিরোধীতা করবেন বলে জানান তিনি।

সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন বরিশাল জেলা সাধারন সম্পাদক কাজী এনাতে হোসেন শিবলু বলেন, ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেটে ইলিশ জনগনের মুখ থেকে কেড়ে নেয়ার পায়তারা করছেন। একজন রিকশাওয়ালা, শ্রমিক কি চাইলেই ৬০০ টাকায় ইলিশ কিনতে পারছেন? যেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী স্বল্পমুল্যে কিনতে পারছেন না সেটি কি করে রপ্তানির প্রশ্ন আসে। তিনি দাবী করেন, বরিশালের ১০ ভাগ মানুষও এ মৌসূমে ইলিশ খেতে পারেনি। করোনায় মাছের দামও চড়া। তার উপর ইলিশ রপ্তানি হলে বাজারে নেতীবাচক প্রভাব পড়বে। জনগন এমন অপতৎপরতায় ক্ষুব্ধ।

জানতে চাইলে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জ্যোতির্ময় বিশ্বাস বলেন, দেশের চাহিদা মিটানোর পরে উদ্বৃত্ত থাকলে ইলিশ রপ্তানির কথা ভাবতে হবে। কিন্তু বহুদিন ইলিশ ধরা বন্ধের পর এখনই যদি রপ্তানি করা হয় তবে সাধারন মানুষ বঞ্চিত হবেন। সরকারকে সর্বাগ্রে নজর দিতে হবে যে সাধারন মানুষ ইলিশ সহজে কিনতে পারছে কি না। তিনি বলেন, করোনাকালীন অর্থনীতিক মন্দায় এই মুহর্তে ইলিশ রপ্তানি যুক্তিযুক্ত নয়।

এব্যপারে বরিশাল জেলা মার্কেটিং কর্মকর্তা এ এস এম হাসান সারোয়ার শিবলি বলেন, ইলিশ কেবল ধরা পড়া শুরু করলো। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দেশীয় অন্যসব মাছের তুলনায় ইলিশের দাম সহনীয় নয়। যেকারনে স্থানীয় চাহিদা মেটাতে না পাড়লে রপ্তানি করার চিন্তা করা উচিৎ হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *