সাগরে ছিল পর্যাপ্ত, নদ-নদীতে ছিল তীব্র সংকট

Spread the love

সুমন চৌধুরী, অতিথি রিপোটার : সাগরে ছিল প্রচুর ইলিশ, সে তুলনায় অভ্যন্তরীন নদ-নদীতে ছিল অনেক কম- ফলে এবছর সুস্বাদের জন্য খ্যাত নদীর ইলিশের সংকট ছিল পুরো মৌসুম। দামও ছিল সাধারন মানুষের নাগালের বাইরে। এমন অবস্থার মধ্যদিয়ে দেশের ‘রূপালী শষ্য’ ইলিশের এবছরের ভরপুর মৌসুম শেষ হবে আজ মঙ্গলবার। আজ মধ্যরাত থেকে ২২দিন ইলিশ নিধন বন্ধ থাকবে। মৎস্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, অন্তত ৩টি কারনে এবার নদীতে ইলিশ পাওয়া গেছে কম।
দেশের মোট ইলিশের ৬০ ভাগ আহোরিত হয় বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদী ও সংলগ্ন সাগর থেকে। ইলিশের ভরপুর মৌসুম ধরা হয় জুলাই থেকে অক্টোবরের মধ্যভাগ পর্যন্ত। ২০১৬ ও ১৭ সালের মৌসুমে দক্ষিণের মোকামে রেকর্ড পরিমান ইলিশ কেনাবেচার পর পরের দুইবছর কমে গিয়েছিল। গতবছর থেকে অবস্থার উন্নতি হতে থাকলেও সাগরের চেয়ে অভ্যন্তরীন নদীতে ইলিশ কম পাওয়া যাচ্ছে।
বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তর সুত্রে জানা গেছে, এবছর জুলাই-সেপ্টেম্বর তিনমাসে ১ লক্ষ ৭ হাজার ৯৪৭ মেট্রিক টন ইলিশ কেনাবেচা হয়েছে বিভাগের ৬ জেলায়। গতবছর এর পরিমান ছিল ৯৯ হাজার ১৫৩ মেট্রিক টন। এ তিন মাসের হিসাবে গতবছরের তুলনায় এবার ৮ হাজার ৭৯৪ টন বেশী ইলিশ কেনাবেচা হয়েছে দক্ষিণের মোকামে। সবচেয়ে বেশী ইলিশ কেনাবেচা হয় গত সেপ্টেম্বরে ৭১ হাজার ৫২৯ টন।
এবার দক্ষিণের মোকামে গতবছরের চেয়ে ইলিশ বেশী কেনাবেচা হলেও গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে মাত্র ৪-৫ দিন দাম ছিল সাধারন নাগালের মধ্যে। তখন কেজি সাইজের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ৭০০ টাকার মধ্যে। এছাড়া পুরো মৌসুমে ইলিশের দাম ছিল কেজি সাইজ হাজার টাকার ওপরে এবং ৭০০-৮০০ গ্রামের ইলিশ ৭০০-৭৫০ টাকা। তবে এসব ছিল সাগর থেকে আহোরন করা। অভ্যন্তরীন নদ-নদীতে ইলিশ কম ধরা পড়ায় পুরো মৌসুমে নদীর জেলেদের মধ্যে ছিল হাহাকার। গত ১০ সেপ্টেম্বর ভারতে ১৪৫০ টন ইলিশ রপ্তানীর ঘোষনা দেয়ার পরই মজুদের কারনে দক্ষিণাঞ্চলের স্থানীয় বাজারে ইলিশ সংকট দেখা দেয়।
যে-সব কারনে ইলিশ কম পাওয়া যাচ্ছে : বরিশালের মৎস্য কর্মকর্তা (ইলিশ) ড. বিমল চন্দ্র দাস বলেন, সাগরে পর্যাপ্ত ইলিশ থাকলেও নদীতে কম আসায় এবার জেলেরা ইলিশ ধরতে পেরেছেন অনেক কম। এর কারন সম্পর্কে তিনি বলেন, মোহনা ও নদীতে নাব্য সংকট রয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়েছে সাগরের মোহনাগুলোতে নিরবিচ্ছিন্নভাবে জাল পেতে রাখায় প্রবেশমুখেই ইলিশ জালে আটকা পড়েছে। এরপক্ষে যুক্তি দেখিয়ে এ মৎস্য বিশেষজ্ঞ বলেন, খারাপ আবহাওয়ায় সাগর উত্তাল হলে জেলেরা তীরে চলে আসে। তখন নদীতে বেশী ইলিশ পাওয়া গেছে।
জাতীয় ক্ষুদ্র জেলে সমিতির সাধারন সম্পাদক আনোয়ার হোসেন সিকদার, বলেন, বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে নদীর সংযোগ মোহনা হচ্ছে ৬টি। তারমধ্যে মেঘনার ২টি, আন্ধারমানিক-পায়রা নদের ২টি, তেতুলিয়া এবং ধলেশ্বর নদের ১টি করে মোহনা। আনোয়ার সিকদার বলেন, এসব মোহনা কমপক্ষে ৫০ ফুট গভীর থাকা কথা। অনেক মোহনার গভীরতা ১০-৫০ ফুটে নেমে এসেছে। যে কারনে ইলিশের চলার পথ বাঁধাগ্রস্থ হওয়ায় সাগর ছেড়ে নদীতে আসছেনা। মোহানায় জেলেদের নিরবিচ্ছিন্নভাবে জাল পাতার কথাও স্বীকার করেন তিনি।
নাব্য সংকটে ইলিশ তার গতিপথ পরিবর্তন করে এমন কথা গত কয়েক বছর যাবত বলে আসছেন চাঁদপুর ইলিশ গবেষনা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিছুর রহমান। তিনি গতকালও (সোমবার) বলেন, পদ্মা-মেঘনাসহ অভ্যন্তরীন নদ-নদীতে যেভাবে নাব্য হ্রাস পাচ্ছে তাতে গভীর জলের সন্ধানে ইলিশের গতিপথ পরিবর্তন করে ফেলা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তার দেওয়া তথ্য মতে, ইলিশের অভয়শ্রম মেঘনার চাঁদপুরের হরিণঘাটা, আনন্দবাজার, ভোলার ইলিশা, মেহেন্দিগঞ্জের কালীগঞ্জ, পদ্মা মাওয়া ঘাটসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ন নদ-নদীর নাব্য আশংকাজনভাবে হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া বিভিন্নভাবে নদী দূষনের ফলে নদীতে ইলিশশের খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। এসব প্রতিকুল পরিবেশে ইলিশের গতিপথ পরিবর্তন হওয়ার আশংকা করছেন তিনি।
এদিকে মা ইলিশের প্রজনন নিরাপদ করতে আগামী আজ মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টায় ইলিশ নিধনে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরুর মধ্যদিয়ে শেষ হবে এ বছরের মৌসুম। এ নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই ১ নভেম্বরের থেকে শুরু হবে জাটকা (১০ ইঞ্চির কম সাইজের ইলিশ) নিধনের ওপর ৮ মাসের (৩০ জুন পর্যন্ত) নিষেধাজ্ঞা। একই সময়ের মধ্যে অভ্যন্তরীর নদীর ৫টি অভয়শ্রমে ২ মাস করে এবং ২৩ জুলাই থেকে ৬৫ দিন সাগরে ইলিশ আরোহন নিষিদ্ধ হবে।##

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *