শেবাচিম হাসপাতালের রোগী ওয়ার্ডে বার বার কেন আগুন লাগে

Spread the love

নাগরিক রিপোর্ট : শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতাল বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান ও উন্নত সরকারি স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান। ১০০০ শয্যার এ হাসপাতালে প্রতিদিন চিকিৎসাধীন থাকেন দেড় হাজারেরও বেশী রোগী। তাদের সঙ্গে থাকেন স্বজনরাও। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত শেবাচিম হাসপাতাল এখনও চলছে ৫০০ শয্যার জনবল দিয়ে। ফলে চিকিৎসক-নার্স সংকটের পাশাপাশি রয়েছে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর জনবল সংকট। নানামুখী সংকটে জর্জরিত শেবাচিম হাসপাতালের অভ্যন্তরীন নিরাপত্তা ও অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থাও নাজুক। প্রায়ই রোগী ও স্বজনদের টাকা, মোবাইল ও ওষুধ চুরি হয়। ঘটে ছোট-বড় অগ্নিকান্ডের ঘটনা। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টায় হাসপাতালের করোনারী কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) সংঘটিত অগ্নিদূর্ঘটনায় চিকিৎসাধীন এক রোগীর মৃত্যুও ঘটেছে। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবী, ওই রোগীর মৃত্যুর সঙ্গে অগ্নিকান্ডের কোন সম্পৃক্ততা নেই। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, কর্তৃপক্ষের দূর্বল ব্যবস্থাপনার কারনে শেবাচিম হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা মারাত্মক ব্যহত হচ্ছে। মানুষ উন্নত চিকিৎসা সেবা নিতে এসে নানাভাবে হয়রানি ও দূর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
করোনারী কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) চিকিৎসাধীন পিরোজপুরের স্বরূপকাঠী উপজেলার নারায়ন মন্ডলের (৬৫) ছেলে সত্যরঞ্জন মন্ডল বুধবার দুপুরে বলেন, মঙ্গলবার রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টায় সিসিইউ ৫ নম্বর শয্যার পাশ থেকে হঠাৎ ধোয়া দেখতে পাই। মুহুর্তে পুরো ইউনিট ধোয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। তখন চিকিৎসাধীন রোগী ও স্বজনরা আতংকে ছোটাছুটি শুরু করেন। নারায়ন মন্ডল বলেন, দূর্ঘটনার অল্প কিছু পরই আগুন নিয়ন্ত্রনে আসলেও চিকিৎসাধীন রোগীদের পোষ্ট সিসিইউতে স্থানান্তর করা হয়।
গতকাল বুধবার দুপুরে শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ডা. এ.এইচ.এম সাইফুল ইসলাম সমকালকে বলেন, অগ্নিকান্ডের ঘটনা তদন্তে কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. জাকির হোসেনকে প্রধান করে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে গণপূর্ত, ফায়ার সার্ভিস এবং জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধিও রাখা হয়েছে। ৩ কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিকে অগ্নিকান্ডের কারন উদঘাটন করে এবং প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সুপারিশ সহ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
মঙ্গলবার রাতে মারা যাওয়া রোগী রমণী চন্দ্র দাসের ছেলে গণেশ চন্দ্র দাস অভিযোগ করেন, অগ্নিকান্ডের আগে তার বাবা মোটামুটি সুস্থ ছিলেন। ঘটনার সময় তারাহুরো করে সিসিইউ ওয়ার্ড থেকে বের হতে গিয়ে আতংকে তিনি মারা যান। তবে কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. জাকির হোসেন বলেছেন, রমনী দাস মারা গেছেন রাত ১১টার পর। তার অনেক আগেই আগুন নিয়ন্ত্রনে এসেছে। রমনী দাস ১ ডিসেম্বর হার্টের মারাত্মক জটিলতা নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। তিনি আশংকাজনক অবস্থায় ছিলেন। দূর্ঘটনার সঙ্গে রমনী দাসের মৃত্যুর কোন যোগসুত্র নেই।
শেবাচিম হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট একাধিক সুত্র জানিয়েছে, হাসপাতালের বৈদ্যুতিক সরবরাহ লাইন অত্যন্ত নাজুক। নেই দক্ষ অগ্নিনির্বাপন ইউনিট। ছোটখাট দূর্ঘটনা ঘটলে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা নিয়ন্ত্রনে এগিয়ে আসেন। মঙ্গলবার রাতেও তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মীরা ছুটে এসে আগুন নিয়ন্ত্রন করেন। শেবাচিমে দক্ষ অগ্নিনির্বাপক ইউনিট না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে হাসপাতাল পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালে আগুন নেভানোর প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আছে। কিন্ত প্রশিক্ষিত আলাদা কোন দক্ষ ইউনিট নেই। কর্মরত তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের ফায়ার সার্ভিসের মাধ্যমে প্রাথমিক প্রশিক্ষন দেয়া হয়েছে। তারাই ছোটখাট দূর্ঘটনা প্রতিরোধে কাজ করেন।
বৈদ্যুতিক সরবরাহ লাইনও ঝুকিপূর্ন জানিয়ে পরিচালক বলেন, শেবাচিম হাসপতালের বৈদ্যুতিক সরবরাহ লাইন দেখভাল করেন গণপূর্তের মেডিকেল উপবিভাগ। তাদের নিয়মিত তাগাদা দেওয়া হয় হাসপাতালের বৈদ্যুতিক লাইন পরীক্ষা-নীরিক্ষা করার জন্য। কিন্ত বৈদ্যুতিক লাইন যথাযথভাবে তদারকি করা হয়না। এজন্য কয়েকদিন আগে গণপূর্ত বিভাগকে বৈদ্যুতিক লাইন পরীক্ষা-নীরিক্ষার জন্য লিখিতভাবে বলা হয়েছে।
এ ব্যাপারে গণপূর্তের মেডিকেল উপবিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. ফিরোজ আলম বলেন, মঙ্গলবার রাতের দুর্ঘটনা বৈদ্যুতিক লাইন থেকে হয়নি। সিসিইউ ইউনিটের শয্যার পাশে থাকা চিকিৎসা যন্ত্র থেকে অগ্নিকান্ডের সুত্রপাত হয়। পরে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই যন্ত্রটির সঙ্গে বিদ্যুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। তবে মেডিকেলের একাধিক দায়িত্বশীল সুত্র জানিয়েছে, রোগী ও তাদের স্বজনরা হাসপাতালের ওয়ার্ডে নিয়মিত মোবাইল চার্জার ব্যবহার করেন। ছোটখাট দূর্ঘটনা ওই চার্জার থেকে ঘটে।
বিশাল হাসপাতাল ভবনের নিরাপত্তার জন্য কর্মরত আছেন মাত্র ৪০ জন আনসার সদস্য। কলেজভবনের নিরাপত্তারও দায়িত্বেও থাকেন এই ৪০ জনের মধ্যে থেকে। ফলে যথাযথভাবে হাসপাতাল ও কলেজের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব না হওয়ার কথা স্বীকার করে হাসপাতাল পরিচালক ডা. এইচ.এম সাইদুল ইসলাম বলেন, আরও ৫০ জন আনসার সদস্য হাসপাতাল এবং কলেজ ভবন নিরাপত্তার জন্য চাওয়া হয়েছে। এই ৫০ জন আনসার সদস্য পাওয়া গেলে নিরাপত্তার বিষয়টি আরও জোরদার করা সম্ভব হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশাল মহানগর শাখার সাধারন সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বলেন, শেবাচিম হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই নাজুক। প্রায়ই রোগী ও স্বজনদের টাকা ও মূল্যবান মালামাল খোয়া যায়। চিকিৎসা নিতে এসে দুরদুরান্তের মানুষ নানা ভোগান্তির শিকার হন। রফিকুল ইসলাম বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অধীনে পৃথক অগ্নিনিবার্পন ইউনিট ও শক্তিশালী নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা উচিত।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) বরিশালের সভাপতি অধ্যাপক শাহ সাজেদা বলেন, শেবাচিম হাসপাতালের মতো স্পর্শকাতর সেবাপ্রতিষ্ঠানে অবশ্যই স্বয়ংসম্পুর্ন অগ্নিনিবার্পক ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা ইউনিট থাকা দরকার। কিন্ত কতৃর্পক্ষের এ ব্যাপারে যথেষ্ট গাফেলতি এবং দায়িত্বহীনতা রয়েছে। মানুষের চিকিৎসাসেবা নেওয়ার প্রতিষ্ঠানটি নিরাপদ করা প্রয়োজন।##

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *