মোবাইল ফোন: কেড়ে নিচ্ছে সোনালী সম্পর্ক

Spread the love

সৈয়দ জুয়েল ॥ ডিজিটাল ভালবাসায় আটকে যাচ্ছে আন্তরিকতার মায়ায় ঘেরা সোনালী অতীত। প্রযুক্তি আমাদেরকে যা দিয়েছে, তার চেয়ে কেড়েও কম নেয়নি। ১৯৭৩ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরের মার্টিন কুপার প্রায় এক কে,জি ওজনের প্রথম মোবাইল ফোন আবিস্কার করেন। বাংলাদেশে এর ব্যাবহার আরো দশ বছর পরে। তবে তখন তা ব্যাবহার করতো গুটি কয়েক মানুষে। সাধারন মানুষের চোখে আসে ১৯৯৩ সালের দিকে, তবে সাধারনের ক্রয় ক্ষমতার বাহিরে ছিল তখনও।
১৯৯৯-২০০৪ পর্যন্ত ছিল মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্তের ভিতর সীমাবদ্ধ্ এরপর থেকে মোবাইলের নুতন নুতন প্রতিষ্ঠান এসে ফোন সহজলভ্য হয়ে এখন ঘরে ঘরে একাধিক মোবাইল ফোন। পৃথিবীতে এখন প্রায় ৯০% এর কাছাকাছি লোক মোবাইল ফোন ব্যাবহার করে থাকেন। এ মুঠোফোন এসে পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয় সত্য। প্রিয়জনদের সাথে ভিডিও কলে কথা বলা, অফিসিয়াল অনেক কাজ বাসায় বসেই সেরে নিতে পারা, সুখের খবর, দুখের খবর তাৎক্ষনিক পাওয়া, অনলাইন শপিং, খাবার, অর্ডার থেকে শুরু করে হাজারো সুবিধা।
কিন্তু হারিয়ে যেতে বসেছে আগের সেই মধুর ছেলেবেলার দূরন্তপনা, দৌরঝাপ, গোল্লাছুট, দারিয়াবান্ধা, হাডুডু, লাটিম ঘোরানো, মার্বেল খেলা এখন প্রায় বিলীন। শারীরিক কসরত হয় এ সব খেলা খেলতে বর্তমান শিশুদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। দিন দিন, তারা নির্ভর হয়ে পরছে মোবাইল গেমসে। তাদের শৈশব আটকে যাচ্ছে এ যন্ত্রটার ভিতর। শুধু ছোটদের কেন! আমরা অভিবাবকরাও আটকে গেছি এ নেশায়। ঘুম ছাড়া মোবাইল ফোন নিয়ে সময় কাটানো আমাদের অভ্যাসে পরিনত হয়ে গেছে। পুরুষরা ঘরের স্ত্রী, সন্তাদের যতটুকু সময় দেয়া হয় তার চেয়ে ঢের সময় দেয়া হয় এ মোবাইলকে। স্ত্রীদের বেলায়ও ওই একই।
আগে পরিবারের লোকজন একসাথে হলে হৈ হুল্লোর, গল্প, হাসি, তামাশায় ভরে থাকতো। ঘরগুলি একে অপরের প্রতি আন্তরিকতাও ছিল চোখে পরার মত। এখন পরিবার, বন্ধুরা একজায়গায় মিলিত হলেও যে যার ফোন নিয়ে ব্যাস্ত থাকেন। আনন্দ খূঁজে বেড়ান ওই প্রযুক্তির ভিতর। ফলে দূরত্ব বাড়ছে একে অপরের প্রতি, বিশ্বাসের জায়গাগুলি হয়েছে নড়েবড়ে। ভালবাসার জায়গাগুলিও কম ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি। সংসারও নেহায়েত কম ভেঙ্গে যাচ্ছেনা।
গত পনের বছরে যত সংসার ভেঙ্গে গেছে, এর আগের তিরিশ বছরেও অতগুলি সংসার ভাঙ্গেনি। এটা আমাদের জন্য অশনি সংকেত। ঘরের পুরুষ অথবা মহিলা যারাই আগে কাজ থেকে ফিরতো, সন্তানরা দৌড় দিয়ে এসে ঘিরে রাখতো তাদের বাবা, মাকে। হাজারো প্রশ্ন ছিল তাদের, সবই ছিল মায়ায় ভরা।
এখন শুধু হায়, হ্যালোর ভিতর সীমাবদ্ধ। এরপর তারা ওই ফোনেই ডুবে, থাকে। এমনকি সারাদিন ক্লান্ত শেষে স্বামী, স্ত্রী যখন বিছানায় আসেন, তখন দু’জন দু ফোনে ব্যাই। এ এক সম্পর্ক অবনতির মরন খেলায় মেতে উঠছি আমরা। যান্ত্রিক ভালবাসার দোরগোড়ায় আমরা। হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সংস্কৃতির আলোঝরা দিনগুলি। যে আলোঝরার দিনগুলি থেকে বের হত গভীর ভালবাসার নানান রঙ্গের চাঁদর। যে চাঁদরে জড়িয়ে থাকতো আমাদের নির্ঘুম রাতের ক্লান্তহীন ভালবাসা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *