ওয়ার্কার্স পার্টির ‘আতুরঘর’ হিসাবে পরিচিত বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলা। বরিশাল- ৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) সংসদীয় আসনটি ঘরের আসন মনে করতেন দলটির নেতাকর্মীরা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত) আসনটি নৌকা প্রতীকে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী দেয়া হলেও স্থানীয় আওয়ামীলীগের বিরোধীতায় হেরে যান তারা। এনিয়ে গৃহবিবাদে বহিস্কার ও দলত্যাগের হিড়িকে খোদ বাবুগঞ্জেই অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে ওয়ার্কার্স পার্টি। এছাড়া আওয়ামীলীগের সঙ্গে বেড়েছে দুরত্ব। যার চুড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে গত শনিবার বরিশাল জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সম্মেলনে রাশেদ খান মেননের বক্তৃতায়।
রাশেদ খান মেনন এমপি বাবুগঞ্জ উপজেলার দেহেরগতি ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের সন্তান। তার পিতা জব্বার খান ছিলেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পীকার। মেননও এখানকার সাবেক এমপি। উত্তারাধীকার সুত্রেই এ পরিবারের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব রয়েছে বাবুগঞ্জে। বাবুগঞ্জের বেশীরভাগ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বর নির্বাচিত হতো ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে।
স্থানীয় সুত্রগুলো জানিয়েছে, সংসদ নির্বাচনের পর ২৪ মার্চ অনুষ্ঠিত বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন নিয়ে আওয়ামীলীগের সঙ্গে ওয়ার্কার্স পার্টির বিরোধ আরও প্রকাশ্য হয়। দলীয় গৃহবিবাদে একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে বাবুগঞ্জ, মুলাদী ও সংলগ্ন উজিরপুর উপজেলায় অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী বহিস্কার হন। অনেকে স্বেচ্ছায় দল ত্যাগ কিম্বা নিস্ক্রীয় হন।
সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই রাশেদ খান মেনন এমপি বিভিন্ন সভায় তার ক্ষোভের কথা বলা শুরু করেন। স্ত্রী লুৎফুনন্নেছা খান সংরক্ষিত সংসদ সদস্য হওয়ার গত ৬ মার্চ বরিশালে রাশেদ খান মেনন এমপিকে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনে রাতে ভোট ডাকাতি হয়েছে, উপজেলা নির্বাচনে দিনে ডাকাতি করা হবে’। নির্বাচনের পরদিন ২৫ মার্চ জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সাংবাদিক সম্মেলনে আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে কেন্দ্র দখল করে তাদের প্রার্থীর বিজয় ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ করা হয়।
সংকট যেভাবে শুরু ঃ ২০০৯ সালে রাশেদ খান মেনন এমপি ঢাকা- ৮ আসনে নির্বাচন করলে তার আসন হিসাবে পরিচিত বরিশাল- ৩ আসনে মহাজোটের প্রার্থী হয়ে জয়ী হন জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু। ‘১৪ সালের নির্বাচন বিএনপিসহ সব দল বর্জন করলে আওয়ামীলীগের সহযোগীতায় জাপার টিপুকে পরাজিত করেন ওয়ার্কার্স পার্টির শেখ টিপু সুলতান। এরপরই উন্নয়ন বরাদ্দের ভাগ-বন্টন নিয়ে এমপি শেখ টিপুর সঙ্গে আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দের দুরত্বের সৃষ্টি হয়।
গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে শেখ টিপু সুলতান নৌকা প্রতীকে মহাজোটের প্রার্থী হলে জাপার গোলাম কিবরিয়া টিপু ও ওয়ার্কার্স পার্টির অঙ্গসংগঠন যুব মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি (পরে বহিস্কৃত) আতিকুর রহমান হন স্বতন্ত্র প্রার্থী। বাবুগঞ্জ ও মুলাদী উপজেলার আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে নৌকার বিরুদ্ধে জাপার টিপু ও স্বতন্ত্র আতিকুর রহমানের পক্ষে ভোটযুদ্ধে নামেন। নির্বাচনের মধ্যেই আতিকুর রহমানের বাবা বজলুর রহমান মাষ্টার (কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি) ও ভাই দেহেরগতি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মশিউর রহমান ওয়ার্কার্স পার্টি ছেড়ে আওয়ামীলীগে যোগ দেন। আতিকুর রহমানের পক্ষে কাজ করায় পার্টির মাঠ পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী বহিস্কৃত হন। নির্বাচনে জাপা প্রার্থীর কাছে হেরে তৃতীয় হন নৌকা প্রতীকের শেখ টিপু।
এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই স্থানীয় ওয়ার্কার্স পার্টিতে গৃহবিবাদ চরমে পৌছে। দল থেকে বহিস্কৃত হন বাবুগঞ্জ উপজলো ওয়ার্কার্স পার্টির সম্পাদক এনায়েত করীম ফারুক, মুলাদী উপজেলা সম্পাদক সেলিম চৌকিদার, জাতীয় কৃষক সমিতির থানা সম্পাদক মনিরুজ্জামান হাওলাদারসহ অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী। তারা এজন্য সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারন সম্পাদক শেখ টিপু সুলতানকে দায়ী করেন। সেলিম চৌকিদার বলেন, মেনন পতিœ লুৎন্নেছা খান এমপির নামে বরাদ্দের টাকা আত্মসাত করেছেন শেখ টিপু সুলতান। ফেসবুকে ষ্টাটার্স দিয়ে তিনি বিষয়টি প্রকাশ করায় মার্চে তাকে বহিস্কার করা হয়েছে। সেলিম চৌকিদারের দাবী তার বহিস্কারের পর নেতাকর্র্মীরা দলত্যাগ ও নিস্ত্রিয় হওয়ায় মুলাদীতে ওয়ার্কার্স পার্টি কাগুজে দলে পরিনত হয়েছে।
টানা ২৮ বছর ওয়ার্কার্স পার্টির করার পর গত ডিসেম্বরে দলত্যাগী প্রবীন নেতা বজলুর রহমান মাষ্টার বলেন, ‘রাশেদ খান মেনন এমপি দূর্নীতিপরায়ন। তিনি লোভে পড়ে ১৪ দলে যোগ দিয়ে ওয়ার্কার্স পার্টির মূল আদর্শ থেকে সরে গেছেন। এজন্য তিনিসহ (বজলু) বাবুগঞ্জের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী পার্টি ছেড়েছেন।
তবে এসব বিষয়ে জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারন সম্পাদক সাবেক এমপি শেখ টিপু সুলতান কোন বক্তব্য দিতে অস্বীকার করেন। সভাপতি নজরুল ইসলাম নিলু বলেন, গত নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরোধীতা করায় অনেককে বহিস্কার করা হয়েছে। কেউ স্বেচ্ছায় দল ছাড়েননি। পার্টি তার নিজস্ব গতিতেই চলছে। ##
২০১৯-১০-২৩
