আবাসিক হোটেলের সেই পরীক্ষায় সভাপতির স্বজনরাই পেলেন নিয়োগ

Spread the love

নাগরিক রিপোর্ট : বাকেরগঞ্জ হযরত আলী ডিগ্রী কলেজের ব্যাস্থাপনা কমিটির সভাপতি আর এ হাওলাদারের শ্যালকের স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার। গত ১৮ জুলাই কলেজের অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার অপারেটর পদে নিয়োগ প্রত্যাশী হিসেবে পরীক্ষা দিয়েছিলেন তিনি। মেধা তালিকায় ৩৮ তম ছিলেন সুমাইয়া। তখন সভাপতি সকল নিয়ম ভেঙে তাকে নিয়োগ দেয়ার চেস্টা করেছিলেন। কিন্তু বাধ সাধে নিয়োগ বোর্ডের অন্য সদস্যরা। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সভাপতি ওই পরীক্ষা বাতিল করে পুনঃনিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেন ওই পদে। গত বৃহস্পতিবার ওই পদে নিয়োগ পরীক্ষা নেয়া হয় বরিশালের আবাসিক হোটেল এরিনার কনফারেন্স কক্ষে। আর ওই পরীক্ষায় উক্ত পদে( অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর) নির্বাচিত হন সুমাইয়া।
একই পদে নিয়োগ পেয়েছেন কলেজের বিদ্যুৎসাহী সদস্য ও নিয়োগ বোর্ডের সদস্য জাপা নেতা বশির আহমেদ সবুজের ভাগ্নেবধু কামরুন্নাহার কলি। তিনি ১৮ জুলাই অনুষ্ঠিত নিয়োগ পরীক্ষা ২৫ তম হয়েছিলেন। কিন্তু গত বৃহস্পতিবারের পরীক্ষায় তিনি সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে নিয়োগ পেয়েছেন।
আর এতে হতবাক নিয়োগ বোর্ডের সদস্য ও নিয়োগ প্রত্যাশীরা। তারা এর ঘোর বিরোধীতা করে নিয়োগ বাতিল দাবি করেছেন। কেবল সুমাইয়াই নয় যে ৯ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তারা সকলেই সভাপতি ও নিয়োগ বোর্ড সদস্যদের স্বজন। একই সাথে পুর্বের অনুষ্ঠিত নিয়োগ পরীক্ষায় অংশনিয়ে পেছনের সারিতে থাকা নিয়োগ প্রত্যাশী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলেজ ব্যাবস্থাপনা কমিটির সদস্য এবং নিয়োগ বোর্ডে থাকা এক সদস্য বলেন, গত বৃহস্পতিবার হযরত আলী ডিগ্রী কলেজের যে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে তা কলেজ ব্যাবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও নিয়োগ বোর্ডে থাকা কয়েকজন সদস্যর নিকটাত্বীকে নিয়োগ দিতেই সাজানো হয়েছে। পূর্বে সিদ্ধান্ত ছিলো কলেজেই পরীক্ষা হবার। কিন্তু তা হঠাৎ করেই পাল্টে আবাসিক হোটেল এরিনায় নেবার সিদ্ধান্ত হয়। যাদের পরীক্ষায় পাশ করার যোগ্যতা নেই তাদেরকে সর্বোচ্চ নম্বর দিয়ে নির্বাচিত করার হয়েছে নিয়োগ দেবার জন্য। আমরা এর বিরোধিতা করেছি। কিন্তু তাতে কোন কাজ হয়নি। গত ১৮ জুলাই নিয়োগ পরীক্ষায় যাদের কৃতকার্য হতে হিমশিম খেতে হয়েছে ২৬ ডিসেম্বরের নিয়োগ পরীক্ষায় তাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ৯টি পদে যাদের নিয়োগ চুড়ান্ত করা হয়েছে তারা কেউ সভাপতির আত্মীয়, কেউ ব্যাবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের আত্মীয় আবার রাজনৈতিক নেতাদের স্বজনও রয়েছে যাদের নিয়োগ চুড়ান্ত হয়েছে। তবে এদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না করে গোপনে নিয়োগ পত্র দেবার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন নিয়োগ বোর্ডের এই সদস্য।
বাকি ৭টি পদে যাদের নিয়োগ চুড়ান্ত হয়েছে: ল্যাব সহকারী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ঝর্ণা আক্তার। তিনি সভাপতি আর এ হাওলাদারের নিকটাত্মীয়। একইসাথে কলেজ সংলগ্ন তার শশুরের থাকা জমি কলেজে দান করার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে চাকুরী পেয়েছেন। গত পরীক্ষায় এই পদ সংযুক্ত না থাকলেও এবার সৃস্টি করে তাকে নিয়োগ দেয়া হয়। আয়া হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অনীমা রানী। তার কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ নেয়ার অভিযোগ রয়েছে ব্যাবস্থাপনা কমিটির সদস্য এম এ জব্বার বাবুল এর বিরুদ্ধে। অফিস সহায়ক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে মিলন ফকির, মিলন হাওলাদার এবং রায়হান হাওলাদার। মিলন ফকির কলেজ অধ্যক্ষ জাকির হোসেনের নিকটাত্মীয়। মিলন হাওলাদার কলেজ ব্যাবস্থাপনা কমিটির সদস্য ও দাড়িয়াল ইউনিয়ন চেয়ারম্যান এম এ জব্বার বাবুলের বড় চাচার ছেলে। আগের পরীক্ষায় নিয়োগ বোর্ডে নিজের নাম লিখতে গিয়ে অচেতন হয়ে পরেন মিলন হাওলাদার। রায়হান হাওলাদার জাসদের কন্দ্রীয় নেতা মো. মহসীন এর খালাত ভাইয়ের ছেলে। নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন কলেজ ব্যাবস্থাপনা কমিটির সদস্য ও দাড়িয়াল ইউনিয়ন চেয়ারম্যান এম এ জব্বার বাবুলের বাবুর্চি সোহেল হাওলাদার। অভিযোগ রয়েছে ইউপি চেয়ারম্যান সোহেল এর কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ নিয়েছেন চাকুরী পাইয়ে দিতে। নৈশ প্রহরী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন আমিন আকন। তিনি জাপা নেতা বশির আহমেদ সবুজের নিকটাত্মীয়। অভিযোগ রয়েছে তার কাছ থেকেও মোটা অংকের টাকা নেয়া হয়েছে।
তবে এ নিয়োগ অবৈধ দাবী করে বিক্ষোভ করেছেন নিয়োগ প্রত্যাশীরা। সোমবার কলেজ কম্পাউন্ডে গিয়ে তারা বিক্ষোভ করেন। এসময় তারা নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফলও দাবী করেন। তবে কলেজ প্রশাসন তাদের জানিয়ে দেন কোন ফলাফল দেয়া হবে না। যারা নিয়োগ পেয়েছেন তাদের নিয়োগ পত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন। বিক্ষোভকারী নিয়োগ প্রত্যাশী রিপা আক্তার এবং হাসান মাহামুদ বলেন, অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার অপারেটর পদে নিয়োগ প্রত্যাশী হিসেবে পরীক্ষা দিয়েছিলাম। আমাদের আত্মবিশ্বাস আমাদের চেয়ে সর্বোচ্চ নম্বর কেউ পেতে পারেনা। কিন্তু এখনও পর্যন্ত পরীক্ষার ফলাফল দেয়া হয়নি। কলেজ অধ্যক্ষ বলছেন যারা নিয়োগ পেয়েছে তাদের নিয়োগপত্র দেয়া হয়েছে। এটা কোন আইনের মধ্যে পরেনা। তারা নিজেদের লোকদের নিয়োগ দিলে পাতানো পরীক্ষার কোন প্রয়োজন ছিলোনা। আমরা এই পরীক্ষা বাতিলের দাবি জানাচ্ছি। অন্যথায় আইনের আশ্রয় নিবো।
হযরত আলী ডিগ্রী কলেজ অধ্যক্ষ জাকির হোসেন বলেন, ৯ জনকে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। তাদের নিয়োগপত্র পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে ফলাফল নোটিশবোর্ডে না দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা ব্যাক্তিগত বিষয়। গত পরীক্ষায় যারা পেছনের সারিতে ছিলো তারা কিভাবে নিয়োগ পেল জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি সভাপতি জানেন বলে ব্যাস্ততা দেখিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। তবে কলেজ ব্যাবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আর এ হাওলাদারের সাথে এ বিষয়ে যোগাযোগ করার চেস্টা করা হলে তার ব্যাক্তিগত সেলফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *