নাগরিক ডেস্ক : বিশ্বব্যাপী মহামারি হিসেবে ঘোষণা করা করোনাভাইরাস ইতোমধ্যে বাংলাদেশেও হানা দিয়েছে। এর প্রকোপ যাতে না বাড়ে সেজন্য সরকার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে নানাভাবে। প্রাণঘাতী ভাইরাসটি দেশে শনাক্তের আগে থেকেই এ নিয়ে নানা শঙ্কার কথা, এর থেকে বাঁচতে দেশের মানুষকে সচেতন করা এবং এ বিষয়ে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের কথা প্রতিনিয়ত দেশবাসীর কাছে তুলে ধরছেন একজন নারী। তার নাম মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক সেব্রিনা নিরলসভাবে কাজ করে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামাল দিচ্ছেন এক হাতে।
ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরার এই ভূমিকা কিন্ত এবারই প্রথম নয়। এর আগেও তাকে দেখা গেছে চিকুনগুনিয়ার সময়, জিকা ভাইরাসের আক্রমণের সময়টাতেও সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে। বিভিন্ন দুর্যোগে তিনি এগিয়ে এসেছেন সাহসের সঙ্গে, মানুষের কাছে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরেছেন বার্তাগুলো। সবাইকে অভয় দিয়েছেন বরাবর। তার পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র।
২০১৭ সালে জিকা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সময়টায় মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। এবার যখন করোনা ভাইরাসের মহামারি ধীরে ধীরে ছড়াচ্ছে বাংলাদেশে, এবারও ফ্রন্টলাইনে এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি। এই মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত মানুষদের একজন তিনি, সারাক্ষণই খোঁজখবর রাখতে হচ্ছে তাকে, আপডেট দিতে হচ্ছে মিডিয়াকে। সবকিছু সামলাচ্ছেন দক্ষ ও চমৎকারভাবে। রাষ্ট্র আর জনগণের মাঝখানে আরও একবার সেতুবন্ধন রচনা করছেন ডা. ফ্লোরা।
মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়া মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা ঢাকা মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন ১৯৮৩ সালে। নেতৃত্বের সহজাত গুণাবলিটা সেখানেই আয়ত্ব করেছেন তিনি। প্রতিকূল পরিবেশে দাঁড়িয়ে বিরুদ্ধ স্রোতে সাঁতার কাটতে তিনি শিখেছিলেন ঢাকা মেডিকেলের ডরমিটরিতে কাটানো দিনগুলোতেই। জড়িত ছিলেন ছাত্র রাজনীতির সঙ্গেও। কৃতিত্বের সঙ্গে এমবিবিএস পাশ করার পরে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন কাজ করেছিলেন। পরে জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, যেটাকে এখন সবাই ‘নিপসম’ নামে চেনে- সেখান থেকে রোগতত্ত্বে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলে সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগদান করে তিন বছর গবেষণা করেছেন। তিনি নিপসমে সহকারী অধ্যাপক হিসেবেও কাজ করেছেন। পরে উচ্চশিক্ষার জন্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন দেশের বাইরে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়েছেন পিএইচডি ডিগ্রি।
মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরাকে ২০১৬ সালে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পাবার পর তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মহামারী সৃষ্টিকারী ভাইরাস ও রোগ বিস্তার প্রতিরোধে বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও গবেষণা করেন। সেব্রিনা ফ্লোরা পরিচালক হবার পরে সংস্থাটির কাজে অন্যরকম একটা গতি এসেছে, নিরসন হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে লেগে থাকা অনেক জটিলাবস্থার। তার তত্ত্বাবাধানেই ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে জিকা ভাইরাস, মধ্য প্রাচ্যের শ্বাসযন্ত্রের সিন্ড্রোম সম্পর্কিত ভাইরাস এবং অতি সাম্প্রতিক করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারি প্রতিরোধে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। অপ্রতুল ব্যবস্থাপনার মধ্যেও তিনি এবং তার দল ২০১৭ সালে বাংলাদেশে চিকনগুনিয়া প্রতিরোধে কাজ করেছেন, সফলতাও পেয়েছেন।
মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব দ্য ন্যাশনাল পাবলিক হেল্থ ইনস্টিটিউটের সহ-সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ফাউন্ডেশন ফর অ্যাডভান্সমেন্ট অব ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল অ্যাডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের একজন সম্মানিত ফেলো তিনি। মানুষের জন্যে নিজেকে উজাড় করে দেয়ার অভ্যাসটা ছোটবেলা থেকেই বাস করছে তার ভেতরে, মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতে পারলে খুশি হন তিনি। করোনার উপদ্রবের এই দিনগুলোতে তিনি প্রচণ্ড ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন, সারা দেশের মানুষ সবশেষ তথ্য জানার জন্যে তাকিয়ে থাকছে তার দিকে।
করোনা ভাইরাস বাংলাদেশের জন্য কতটুক চ্যালেঞ্জ- এমন প্রশ্নে আইইডিসিআর-এর এই পরিচালক বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রোগটিকে মহামারি হিসেবে আখ্যা দেয়ার পর আমার আর এই বিষয়ে বলার কিছু থাকে না। আমরা অধিক জনসংখ্যার একটি দেশ। তাই করোনা প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলাটাই আমাদের জন্য যথার্থ হবে।’
করোনা ভাইরাস নিয়ে সবশেষ তথ্য জানতে সারা দেশের মানুষ তার দিকে তাকিয়ে থাকে। এটাকে কি চাপ হিসেবে নিচ্ছেন তিনি? এমন প্রশ্নে সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘একজন রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি নিজে থেকেই এক ধরনের তাড়না বা চাপ বোধ করছি। কারণ এই গোটা বিষয়টি আমাদেরসহ সমগ্র পৃথিবীর জন্যই বেশ উদ্বেগের। যেহেতু আমরা এখন পর্যন্ত নিরাপদে আছি, আমাদের বাড়তি সচেতনতা জরুরি।

করোনা পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত ব্রিফ শুরু করার দিন থেকে নিত্যনতুন শাড়ি পরা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপনাকে নিয়ে অনেকে মন্তব্য করছেন। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. ফ্লোরা বলেন, ‘মানুষের চোখ আছে, মানুষের মুখ আছে, মানুষ কমেন্ট করতেই পারে। আমি বৈজ্ঞানিক তথ্যের বাইরে কোনও কমেন্ট করতে রাজি না।’
মানুষের জন্যে, দেশের জন্যে অকাতরে কাজ করে যাওয়া এই মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরাদের অবদান অসংখ্য তারকা খ্যাতিসম্পন্ন পরিচিতি মুখদের চেয়ে কোটি গুণ বেশি- সেটা আমরা মাঝেমধ্যেই ভুলে যাই। বিপর্যয়ের দিনগুলোতেই শুধু এইসব সাহসিকাদের কথা মনে পড়ে, নচেত সারা বছর কে রাখে ডা. ফ্লোরাদের খোঁজ? অথচ জাতির এই দুঃসময়ে, মহাসংকটকালে মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরারাই তো আমাদের আইকন, সত্যিকারের আয়রন লেডি।
সুত্র- পূর্বপশ্চিম

I’m definitely going to share this article with my friends and audience.
Your blog brightens my day like a ray of warmth and positivity. Thank you for sharing your uplifting words.