নাগরিক রিপোর্ট: রুপালী ইলিশ আহরনকে কেন্দ্র করে ঘুরে দাড়াচ্ছে দক্ষিনাঞ্চলের অর্থনীতিক চিত্র। গত এক সপ্তাহ ধরে বরিশাল, পাথরঘাটা, মহিপুর ও দ্বীপ জেলা ভোলার মৎস্য মোকাম সরগরম হয়ে উঠেছে। ইলিশের লোকাল চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় করোনায় পিষ্ঠ এ অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃস্টি হয়েছে। তারা ইলিশ ও এর অংশবিশেষ বেচাকেনায় নানাভাবে সম্পৃক্ত হয়ে জীবিকা নির্বাহ শুরু করছেন। সংশ্লিস্টরা মনে করছেন, স্থানীয় চাহিদা মেটাতে ইলিশ আহরনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে দক্ষিনের অর্থনীতিক অবস্থা ধীরে ধীরে চাঙ্গা হবে।
বরিশাল মৎস্য অবতরন কেন্দ্রের তথ্যমতে, চলতি মাসের শুরু থেকে ইলিশ ধরাপড়া শুরু করেছে। দৈনিক হাজার মনের বেশি ইলিশ আমদানী হচ্ছে বরিশাল মোকামে। গত ৮ দিনে বরিশাল মৎস্য মোকামেই ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার মনের বেশি ইলিশ আমদানী হয়েছে বলে জানান মৎস্য আড়তদার সমিতির সভাপতি অজিৎ দাস। তিনি বলেন, টানা ৬৫ দিন সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার পর চলতি মাসের এ ক’দিন ইলিশ ধরা পড়ছে। এর আগেও ৮ মাস জাটকা নিধনে বিধিনিষেধ ছিল। এর উপর প্রাণঘাতী করোনা মৎস্যজীবীদের মেরুদন্ড অনেকটা ভেঙ্গে দিয়েছে। ইলিশ আমদানী শুরু হওয়ায় অভ্যন্তরীন বাজার চাঙ্গা হচ্ছে। এর সাথে জড়িত জেলে, ব্যবসায়ী, শ্রমিকদের জীবিকা নির্বাহ সহজ হচ্ছে। তিনি বলেন, ইলিশ কে কেন্দ্র করে নানা ধরনের ক্ষুদ্র ব্যবসাও শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার বরিশাল মৎস্য অবতরন কেন্দ্র ও এর আশপাশ ঘুরে দেখা গেছে বেশ প্রানচাঞ্চল্য। মোকামের ভেতরে ব্যস্ত আড়তদাররা। পাশাপাশি সাজিতে নিয়ে অর্ধশত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ইলিশ বিক্রি করছেন। তাদের ঘিরে আছেন কয়েকশ ক্রেতা। কথা হয় ইলিশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আ: রহমানের সাথে। তিনি বলেন, করোনার মাঝে ইলিশ আসায় তারা কোন রকম কোমড় সোজা করে দাড়াতে পেড়েছেন। দৈনিক ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা আয় হচ্ছে। স্থাণীয় ক্রেতার ভীড় ক্রমশই বাড়ছে। এই বেচাকেনা অব্যাহত থাকলে তাদের অভাব কিছুটা ঘুচবে।
মোকামের মধ্যে এক শ্রেনীর শ্রমিককে দেখা গেল সাগর থেকে আসা বোট থেকে ইলিশ নামাচ্ছেন। তাদের একজন রহমত আলী বলেন, এই ঘাটে অনেক দিন পর ইলিশ এসেছে। যেকারনে তাদের আয়ের পথ সৃস্টি হল। আজকাল ইলিশ তো নানাভাবে অন্যত্র চলে যায়। তিনি বলেন, স্থাণীয় বাজারে ইলিশের বেচাকেনা থাকলে তারা বাঁচবেন, অন্যথায় টিকবেন না।
মোকামের মধ্যে কয়েকজন নারী ও পুরুষ শ্রমিক নরম ইলিশ সংগ্রহ করছেন। তারা জানালেন, এগুলো কেনারও এক শ্রেনীর স্থানীয় ক্রেতা রয়েছে। মোকামে ইলিশ আসলে তাদের কিছুটা আয় হয়।
পোর্ট রোড ইলিশ মোকামের বাইরে চলছে লোনা ইলিশ সংরক্ষনের ধুম। লোনা ইলিশ সংরক্ষনে থাকা একাধিক ব্যবসায়ী জানান, দক্ষিনাঞ্চলের বিভিন্ন মোকাম থেকে আসা নরম ইলিশ তারা লবন দিয়ে সংরক্ষন করছেন। পরে এগুলো রাজধানীসহ উত্তরাঞ্চলের জেলোগুলোতে পাঠাবেন। করোনায় অর্থনীতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে এ মৌসূমে লোনা ইলিশ সংরক্ষনের সাথে কয়েক হাজার লোক সম্পৃক্ত হয়েছেন।
মৌসূম ঘিরে ইলিশের আইশ সংগ্রহও করছেন এক শ্রেনীর মানুষ। এগুলো বিক্রি করেও জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে করোনাকালে। তাদের দাবী করোনাকালে কর্মসংস্থান সৃস্টিতে এই অবস্থা স্থানীয়ভাবে অব্যাহত রাখা জরুরী।
গত ক’দিন ধরে সবচেয়ে চোখে পড়ছে বরিশাল নগরীর অলি গলিতে শত শত ভ্রাম্যমান ইলিশ বিক্রেতাদের। নগরীর নিউ সার্কুলার রোডে কথা হয় জসিম উদ্দিন নামে এক ভ্রাম্যমান ইলিশ বিক্রেতার সাথে। তিনি এর আগে ফল বিক্রি করতেন। জানালেন, ইলিশের আমদানী বাড়ায় এই ব্যবসা শুরু করেছেন তারা। মানুষের চাহিদা ব্যাপক। ওই এলাকায় দৈনিক মাছ বিক্রি করেন মো: মনির উদ্দিন। তিনি বলেন, এর আগে চাষের মাছ বিক্রি করতে তিনি। কিন্তু ইলিশের ক্রেতা ১০ গুন বেশি। নগরীর মানুষের ইলিশ কেনার চাহিদার শেষ নেই। মনির দাবী করেন, নগরবাসীর ঘরে ঘরে ইলিশের এই চাহিদা আরও এক মাস থাকবে।
খোজ নিয়ে জানা গেছে, মহিপুরেও স্থাণীয় বাজার বেশ চাঙ্গা। সেখানকার ট্রলার সমিতির সাধারন সম্পাদক নুরু মাঝী বলেন, ইলিশ ধরা পড়ায় কুয়াকাটা, কলাপাড়ার জেলেদের পথ সৃস্টি হয়েছে। স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানও সৃস্টি হয়েছে। একই তথ্য পাওয়া গেছে পাথরঘাটা ইলিশ মোকামে।
জানতে চাইলে বরিশাল মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা (ইলিশ) ড: বিমল চন্দ্র দাস বলেন, ইলিশ আহরন বৃদ্ধি পাওয়ায় গত এক সপ্তাহে মৎস্য সেক্টরে অর্থনৈতিক অবস্থা চাঙ্গা হয়েছে। দক্ষিনাঞ্চলের জেলে, ব্যবসায়ী, শ্রমিক থেকে শুরু করে এই সেক্টরের কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের চাকা ঘুরতে শুরু করেছে। তারা করোনার ক্ষত কাটিয়ে ওঠার চেস্টা করছেন।
এব্যপারে বরিশাল জেলা মার্কেটিং কর্মকর্তা এ এস এম হাসান সারোয়ার শিবলি বলেন, ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা এবং করোনায় দীর্ঘদিনের অলসতা সৃস্টি হয়েছিল মৎস্য সেক্টরে। মানুষ দীর্ঘদিন মাছ খেতে পারেননি। মাছের ঘাটতি ছিল ব্যাপক। কিন্তু ইলিশকে কেন্দ্র করে কর্মতৎপরতায় মৎস্য সেক্টরে ব্যবসা চাঙ্গা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে ইলিশের চাহিদা ব্যাপক। এটিকে ঘিরে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থানও সৃস্টি হয়েছে। তিনি বলেন, এ অঞ্চলে ইলিশের বেচাকেনা অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিক অবস্থা ঘুরে দাড়াবে।
