খান রফিক:
দেড়শ বছরের ঐতিহ্যবাহী বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরী অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। ব্যবস্থাপনার অভাবে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর উপর লাইব্রেরীর জমিও বেহাত হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। ১৩ ডিসেম্বর রোববার রাতে সীমানা প্রাচীর ভেঙ্গে লাইব্রেরী ভবনের পেছনের অংশের জলাশয় ভরাটের পায়তারা করা হয়। খবর পেয়ে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা ওই কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। সবশেষ তথ্যানুযায়ী, বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরী পরিচালনা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান এক সভায় লাইব্রেরী এলাকার জলাশয় ভরাট করে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের ভবন করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন।
জানা গেছে, জেলা প্রশাসনের পরিচালনাধীন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের বহুতল ভবন নির্মানের জন্য বরিশাল নগরীর বান্দ রোডে স্থান নির্ধরন করা হয়েছে। তার পাশেই পাবলিক লাইব্রেরীর মালিকানাধীন ৫৪ শতাংস জমির কিছুর অংশ জলাশয় রয়েছে। সেটি ভরাট করে বিদ্যালয় ভবনের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করার উদ্দেশ্যে গত ১৩ ডিসেম্বর রোববার রাতে পাবলিক লাইব্রেরীর সীমানা প্রচীর ভেঙ্গে ফেলা হয়।
পাবলিক লাইব্রেরী পরিচালনায় এডহক কমিটির সদস্য কাজী এনায়েত হোসেন শিপলু বলেন, রোববার রাতের ওই ঘটনার পরদিন সোমবার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমানের সঙ্গে সভা করে বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সভায় জেলা প্রশাসক তার এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার কথা জানান।
কাজী এনায়েত হোসেন শিপলু বলেন, রোববার রাত ৮টার দিকে পাবলিক লাইব্রেরীর জমি দখলের খবর পেয়ে তিনিসহ আরও কয়েকজন ঘটনাস্থলে যান। তার আগেই শ্রমিকরা লাইব্রেরীর প্রধান ফটক সংলগ্ন এবং দক্ষিন দিকের দেয়াল ভেঙ্গে ফেলেছে। ঠিকাদারের প্রতিনিধিরা জানান, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে লাইব্রেরী ভবনের পেছনের জলাশয় ভরাটের জন্য দেয়াল ভাঙ্গা হয়েছে।
কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. অলিউল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, বিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ হওয়া ৪৮ শতাংশ জমিতে ৬ তলা ভবন নির্মান অনুমোদন হয়েছে। নির্মান প্রকৌশলী মতামত দেন, অব্যবহৃত জলাশয়টি অন্তর্ভূক্ত করে ভবন নির্মিত হলে বিদ্যালয়ের সামনের অংশে খোলা মাঠের মতো কিছু জায়গা থাকবে। জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি দল একই মত দিলে জলাশয়টি ভরাটের জন্য বালু ফেলতে লাইব্রেরীর সীমানা প্রাচীর ভাঙ্গা হয়েছে। সিদ্ধান্ত বাতিল হওয়ায় আবার তারা প্রাচীর করে দিবেন। অধ্যক্ষ দাবী করেন, জেলা প্রশাসক জানতেন না জলাশয়টি লাইব্রেরীর জমিতে রয়েছে।
লাইব্রেরী পরিচালনা কমিটির আরেক সদস্য মহিউদ্দিন মানিক বীর প্রতিক সাংবাদকিদের বলেন, পাবলিক লাইব্রেরী বরিশালের দেড়শ বছরের ঐতিহ্য। রক্ষানবেক্ষনের অভাবে প্রতিষ্ঠানটি এখন মৃত পায়। প্রতিষ্ঠানটি বাঁচিয়ে রাখতে প্রশাসনসহ নগরীর সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যেগ নেয়া খুব জরুরী।
দীর্ঘবছর পাবলিক লাইব্রেরীর সাধারন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা প্রবীন সাংবাদিক এসএম ইকবাল বলেন, লাইব্রেরীটি বাঁচাতে হলে যোগ্যদের হাতে এর পরিচালনার ভার দিতে হবে। সরকরি অনুদান আনার পাশাপাশি লাইব্রেরীর যে সম্পদ রয়েছে সেগুলো আয়বর্ধক কাজে লাগিয়ে লাইব্রেরী পরিচালনা সম্ভব।
প্রসঙ্গত, ১৮৫৪ সালে স্থাপিত বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরীর আজীবন সদস্য দুই হাজার। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জেলা প্রশাসক পদাধিকার বলে সভাপতি এবং আজীবন সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে দুই বছরের জন্য ১৫ সদস্যের পরিচালনা কমিটি গঠিত হবে। নব্বই দশকে সিলেকশনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলের মনোনীতদের নিয়ে পরিচালনা কমিটি গঠিত হতো। ২০০৪ সাল থেকে এ প্রথাও বন্ধ হয়ে যখন যিনি জেলা প্রশাসক থাকেন তিনি লাইব্রেরীর জন্য এডহক কমিটি করে দেন। সংরক্ষনের অভাবে লাইব্রেরীর ৩০ হাজার বই নষ্ট হওয়ার পথে।
সেখানকার একমাত্র কর্মচারী শহীদ হোসেন জানান, ৩৫ বছর আগ থেকে তিনি এ প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করছেন। এক সময়ে দুজন লাইব্রেরীয়ান ও বিভিন্ন পদে ৫ জন কর্মচারী ছিল। পাঠক আসত প্রতিদিন দুই শতাধিক। এখন পাঠকদের জন্য প্রতিদিন মাত্র একটি জাতীয় ও একটি আঞ্চলিক সংবাদপত্র রাখা হয়। গড়ে ১৫-২০ জন পাঠক আসেন প্রতিদিন।
