নাগরিক রিপোর্ট:
স্ত্রী নাজনীন আক্তার (১৯) জানতেন না যে তার স্বামী সাকিব হোসেনের (২৩) পারিবার দরিদ্র। এক বছর পর তাই বাবা অসুস্থ্য এমন অযুহাত দেখিয়ে বরিশালের গৌরনদীর গ্রামের বাড়িতে স্ত্রীকে নিয়ে আসে স্বামী সাকিব। এ নিয়ে ঝগড়ার একপর্যায়ে নাজনিন তার স্বামীকে ‘ভিক্ষুকের বাচ্চা’ বলে ভৎসনা করলে সাকিব ক্ষিপ্ত হয়ে স্ত্রীকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর লাশ গুম করে। পরে সাকিব স্বভাবিক অবস্থায় বগুরা সেনানিবাসের কর্মস্থলে যোগ দেয়।
হত্যাকান্ডের এক সপ্তাহ পর গতকাল মঙ্গলবার গৌরনদী উপজেলার বাটাজোর ইউনিয়নের হরহর গ্রামে সাকিবের বাড়ির সেপটি ট্যাংক থেকে নাজনিনের শরীরের চামরার খন্ডাংশ এবং ওড়না উদ্ধার করা হলেও বিকেল পর্যন্ত পাওয়া যায়নি নাজনিনের লাশ এমনটাই জানিয়েছে পুলিশ।
বগুরা সদর থানা পুলিশ গৌরনদী থানা পুলিশের সহায়তায় মঙ্গলবার সারাদিন হরহর গ্রামে সাকিবের বাড়ির সেপটি ট্যাংকি ও সম্ভাব্য স্থানগুলোতে অভিযান চালিয়েছে। গ্রেফতার হওয়া সাকিবের স্বীকারোক্তীর ভিত্তিতে তাকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশ এ উদ্ধার অভিযান চালায়।
গৌরনদী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তৌহিদুজ্জামান সর্বশেষ বিকাল ৪টায় জানান, সাকিবের স্বীকারোক্তী অনুযায়ী সেপটি ট্যাংকে অভিযান চালিয়ে নিহত নাজনিনের ওড়না ও শরীরের চামরার খন্ডাংশ উদ্ধার করেছেন। তবে ট্যাংকিতে ও বাড়ির বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে লাশ পাওয়া যায়নি। সম্ভাব্য আরও একাধিক স্থানে তাদের অভিযান চলছে।
জানা গেছে, সাকিব হোসেন হরহর গ্রামের বাসিন্দা ভ্যানচালক আব্দুল করিমের ছেলে। সে বগুরা সামরিক ক্যান্টমেন্টে পরিচ্ছন্নতা পদে চাকুরী করতো। নিহত নাজনিন বগুড়া সদর উপজেলার উত্তরপাড়া গ্রামের মো. আব্দুল লতিফ প্রামানিকের কন্যা। নিজের পরিবারের দারিদ্রতার খবর গোপন রেখে স্বচ্ছল পরিবারের মেয়ে নাজনিনকে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর বিয়ে করেছিল সাকিব।
সে পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তীতে জানিয়েছে, বিয়ের পর তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা জানতে পারলে নাজনিন প্রায়ই তার সঙ্গে ঝগড়ায় লিপ্ত হতো। তাকে ভিক্ষুকের বাচ্চা বলে গালি দিতো নাজনিন। এর প্রতিশোধ নিতে সে নাজনিনকে হরহর গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এনে তাকে পরিকল্পিতভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে। পরে লাশ বাড়ির সেপটি ট্যাংকির মধ্যে ফেলে দেয়। গতকাল উদ্ধার অভিযানের আগেই সাকিবের বাবা-মা বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়।
বগুড়া সদর থানার উপ পরিদর্শক ও তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. গোলাম মোস্তফা জানান, নাজনীন নিখোঁজ হওয়ার তথ্য জানিয়ে তার বাবা আব্দুল লতিফ গত ২৬ মে বগুড়া থানায় একটি সাধারন ডায়েরী করেছেন। জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সাকিব গত ২৪ মে স্ত্রী নাজনীকে ফোন দিয়ে বলেন, তার বাবা খুব অসুস্থ। বাবাকে দেখতে নাজনীনকে গৌরনদীর বাটাজোর ইউনিয়নের হরহর গ্রামে যেতে হবে। সাকিব নাজনীনকে গোদাপাড়া চারমাথা বাসস্ট্যান্ডে দ্রæত আসতে বলেন। নাজনীন তার বাবা-মায়ের অনুমতি নিয়ে সাকিবের সঙ্গে গৌরনদীর উদ্দেশ্যে রওনা হন। এরপর নাজনীনের সঙ্গে আর তার বাবা-মায়ের যোগযোগ হয়নি। নাজনিন ও সাকিব দুজনেরই ফোন বন্ধ পেয়েছেন তারা।
এসআই গোলাম মোস্তফা বলেন, তিনি জিডির তদন্তের দায়িত্ব পেয়ে সোমবার সাকিব হোসেনের কর্মস্থলে গিয়ে তাকে জিজ্ঞাসবাদ করেন। সে মিথ্যা কথা বলে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেস্টা করে। পরে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সাকিব জানায় গ্রামের বাড়ি গৌরনদীতে নিয়ে যাওয়ার পর গলায় ফাঁস দিয়ে নাজনিকে হত্যার পর সেফটি ট্যাংকের মধ্যে লাশ লুকিয়ে রেখেছেন। তাকে ভিক্ষুক বলে গালি দেয়ায় স্ত্রী নাজনিকে হত্যা করেছেন। তার স্বীকরোক্তীনুযায়ী মঙ্গলবার সাকিবকে নিয়ে গৌরনদীর হরহর গ্রামে পৌছার পর লাশ উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছেন।
বোনের লাশের খোজে বরিশালের গৌরনদীতে আসা নাজনিনের ভাই আব্দুল আহাদ বলেন, সাকিব প্রতারনার আশ্রয় নিয়ে তার বোনকে বিয়ে করেছেন। সাকিবের বাবা আব্দুল করিম পেশায় একজন ভ্যান চালক। তার বোন গত ২৪ মে থেকে নিখোজ হন। তারা তার বোনের লাশ চান। হত্যার কঠোর বিচারও দাবী করেন।
এব্যপারে গৌরনদী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. তৌহিদুজ্জামান জানান, মঙ্গলবার সাকিবকে সঙ্গে নিয়ে বগুড়া সদর থানা পুলিশের একটি দল গৌরনদী পৌছায়। তারা সকাল থেকে হরহর গ্রামে অভিযান চালালে গৌরনদী পুলিশ তাদের সহযোগীতা করেছে। প্রথমে সেফটি ট্যাংকি পরিস্কার করে তার মধ্যে তল্লাশি চালিয়ে নাজনীন আক্তারের ওড়না ও শরীরের চামড়ার কিছু অংশ পাওয়া গেলেও লাশ পাওয়া যায়নি। ওসি (তদন্ত) তৌহিদুজ্জামান বিকেলে জানান, নতুন করে অন্য একটি স্থানের সন্ধ্যান পেয়েছেন। তারা লাশ উদ্ধারে বগুড়া থানা পুলিশের সাথে সেখানে অভিযান চলামান রেখেছেন।
