সুমন চৌধুরী, অতিথি রিপোটার : ‘বিয়েকান্ড’র জন্য চেয়ারম্যান পদ থেকে বহিস্কৃত পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার আওয়ামীলীগ নেতা শাহীন হাওলাদার (৬০) অপকর্মের শেষ নেই। উপজেলার কনকদিয়া ইউনিয়ন পরিষদে দুই মেয়াদে মেম্বর থাকার পর ২০১৬ সালে প্রথম চেয়ারম্যন নির্বাচিত হওয়ার পরই বেপরোয়া হন তিনি। সরকারী কর্মকর্তাকে মারধর, নারী ইউপি সদস্যকে লাঞ্ছিত, ত্রানের চাল আত্মাসাত অসংখ্য অভিযোগে তাকে একাধিকবার কারাগারে যেতে হয়েছে। গত ২১ জুন দ্বিতীয় দফায় চেয়ারম্যান নিবাচিত হয়ে প্রথম শালিসিতেই ৮ম শ্রেণীর এক ছাত্রীকে বিয়ে করায় রোববার রাতে চেয়ারম্যান পদ থেকে বহিস্কার করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রাণালয়। তবে এর আগে অসংখ্য অভিযোগে অভিযুক্ত শাহীন কখনই রাজনৈতিক শাস্তি না পেয়ে পূরস্কৃত হয়েছেন। কিশোরী বিয়ে করে দেশজুরে সমালোচিত হয়ে প্রশাসনিক শাস্তিতে চেয়ারম্যান পদ হারালেও এখনও বহাল আছেন আওয়ামীলীগের বাউফল উপজেলা কমিটির সাধারন সম্পাদক ও কনকদিয়া ইউনিয়নের কমিটির সাধারন সম্পাদক পদে।
জানা গেছে, অভ্যন্তরীনর বিরোধে ত্রিভাগে বিভক্ত বাউফলের উপজেলা আওয়ামীলীগে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আ.স.ম ফিরোজের ঘনিষ্টজন বহিস্কৃত চেয়ারম্যান শাহীন হাওলাদার। যে কারনে কোন বিতর্কিত কর্মের জন্যই তাকে দলীয় শাস্তির মুখে পড়তে হয়নি।
শাহীন হাওলাদার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান মোতালেব হাওলাদার বলেন, সর্বশেষ ইউপি নির্বাচনের পরিচিতি সভায় আ.স.ম ফিরোজ এমপি বক্তৃতায় বলেছেন, ‘শাহীন আমার সিপাহাশালা’। মোতালেব হাওলাদার বলেন, শাহীনের প্রতি এমপির অন্ধ সমর্থনের কারনে এখন আর বিষয়গুলো তাকে জানাই না। আগে আমি নিজে এবং স্থানীয়দের মাধ্যমে নালিশ দেয়া হলেও অদৃশ্য কারনে তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে নৌকা প্রতীক দিয়ে পূরস্কৃত করা হয়েছে।
শাহীনের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ : ২০১৬ সালের অক্টোবরে হতদরিদ্রদের মধ্যে ১০ টাকা দরে চাল বিক্রিতে অনিয়মের অভিযোগে শাহীন হাওলাদারকে প্রধান আসামী করে মোট ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের দূর্ণীতি দমন কমিশন (দূদক)। ওই মামলায় তিনি ২০১৮ সালের ২৮ জানুয়ারী গ্রেপ্তর হয়ে কারাভোগ করেন। দূদকের অভিযোগপত্র দেয়া ওই মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপ সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষন কর্মকর্তা মো. আনছার উদ্দিনকে (৪৯) ২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর কনকদিয়া বাজারে প্রকাশ্যে মারধর করা হয়। ওই মামলায় গ্রেপ্তার হয়েও তিনি কারাভোগ করেন এবং মামলাটি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
এবছরের ২৪ মার্চ কনকদিয়া বাজারে মুক্তিযোদ্ধা মো. ফজলুল হককে (৭০) প্রকাশ্যে বেদম মারধর করেন চেয়ারম্যান শাহীন। এ ঘটনায় ফজলুল হক পটুয়াখালী আদালতে চেয়ারম্যানকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করেছেন। ইউনিয়নের পালপাড়ায় একটি শালিসিতে পরিতোষ পাল নামক এক বৃদ্ধকে মারধর করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলেও চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করার সাহস পায়নি সংখ্যালঘু এ পরিবারটি। একইদিন পরিতোষের স্ত্রীকেও লঞ্ছিত করার অভিযোগ রয়েছে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। ইউনিয়ন পরিষদের নারী সদস্য কুলসুম বেগম ও উপজেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ন সম্পাদক রফিকুল ইসলামও চেয়ারম্যান শাহিন হাওলাদারের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার অভিযোগ আছে। তবে তারা এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। উপজেলা চেয়ারম্যান মোতালেব হাওলাদার বলেন, তিনি এ পর্যন্ত ২শ লোককে বিনা কারনে মারধর করেছেন।
শাহীনের উত্থান : বাউফলের বগা ইউনিয়ন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সাবেক সভাপতি শাহীন ১৯৯৮ সালের ইউপি নির্বাচনে তরুন বয়সে কনকদিয়া ইউনিয়নের মেম্বর নির্বাচিত হন। পরপর দুই মেয়াদে মেম্বর থাকার পর ২০১৬ সালের ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নৌকা প্রতীক নিয়ে বিজযী হন। এরপরই তিনি বেপরোয়া হয়ে উঠেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তারা জানান, বাউফল উপজেলা চেয়ারম্যান মোতালেব হাওলাদারের সঙ্গে ঘনিষ্টতার সুত্রে জানা তিনি কনকদিয়া ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদকের পদের পাশাপাশি উপজেলার সাংগঠনিক সম্পদক পদে পদায়ন হন। এমপির সমর্থনে উপজেলা আওয়ামীলীগের পরবর্তী সাধারন সম্পাদক প্রত্যাশী শাহীন।
সুত্র জানায়, কয়েকবছর আগে মোতালেব হাওলাদারের সঙ্গে এমপি আ.স.ম ফিরোজের দুরত্বের সৃষ্টি হলে শাহীন হাওলাদার এমপির গ্রুপে ভিড়ে যান। তার পৃষ্ঠপোষকতাতেই গত ২১ জুনের নির্বাচনে তিনি নৌকা প্রতীকে দ্বিতীয় দফায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। শাহীনের বিরুদ্ধে আনারস প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করেন মোতালেব হাওলাদারের ছেলে বগা ইউপি চেয়ারম্যান মো. হাসানের মামা শ্বশুর দেলোয়ার গাজী।
শাহীন প্রসঙ্গে পটুয়াখালী জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি কাজী আলমগীর হোসেন বলেন, শালিস বিচারে গিয়ে এক কিশোরীকে বিয়ে করে গর্হিত কাজ করেছেন। আওয়ামীলীগের কোন পদ-পদবীতে থাকার কোন যোগ্যতা তার এখন আর নেই। তার বিরুদ্ধে উপজেলা আওয়ামীলীগ কি ব্যবস্থা নিচ্ছে সেটা দেখার অপেক্ষা আছে জেলা আওয়ামীলীগ। উপজেলা থেকে কোন ব্যবস্থা নেয়া না হলে জেলা আওয়ামীলীগ স্বপ্রনোদিত হয়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে।
তবে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আ.স.ম ফিরোজ বলেন, চেয়ারম্যান শাহীন হাওলাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে কি-না সেটা উপজেলা আওয়ামীলীগ সভা করে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে কবে সভা হবে এ বিষয়ে তিনি কোন সদুত্তর না দিয়ে বলেন, ‘কিশোরীকে বিয়ে করার বিষয়টি চেয়ারম্যানের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়, দেশে এরকম অনেক ঘটনাই ঘটে’। অসংখ্য অভিযোগ থাকার পরও সর্বশেষ নির্বাচনে তাকে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী করা প্রসঙ্গে আ.স.ম ফিরোজ এমপি বলেন, অভিযোগের কিছু সত্য হলেও অনেক বিষয় আবার অতিরঞ্জিত করে প্রচার করা হয়েছে। মামলার বিষয়গুলো দেখবে পুলিশ। আমরা দেখব তার ((শাহীন) রাজনৈতিক বিষয়গুলো।
উল্লেখ্য, কনকদিয়া ইউনিয়নে দিনমজুর নজরুল ইসলামের মেয়ে ৮ম শ্রেণীর ছাত্রী নাজনিন (১৪) তার প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে গেলে তার বিচার দেয়া হয়েছিল চেয়ারম্যান শাহিন হাওলাদারের কাছে। গত শুক্রবার সকালে বিচারের এক পর্যায়ে দরিদ্র নজরুলকে রাজী করিয়ে নাজনিকে বিয়ে করে বাড়িতে নিয়ে যান দুই সন্তানের জনক শাহীন হাওলাদার (৬০)। যদিও পরদিন শনিবার নাজনিন তাকে তালাক দিয়ে প্রেমিক রমজানের কাছে ফিরে গেছে।##
২০২১-০৬-৩০
