নাগরিক রিপোর্ট ॥ ইলিশের ভরা মৌসুম শুরু হয়েছে গত ২৪ জুলাই থেকে। মঙ্গলবার শেষ হল এ মৌসূমের ৫৬ দিন। কিন্তু কাংক্ষিত ইলিশ পাননি জেলেরা। নদীর ইলিশ এবার অনেকাংশে অধরাই থেকে গেছে। সাগরের ইলিশের পরিমানও গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেকাংশে কম। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ইলিশের ভরা মৌসূম এবছর জুলাই-আগষ্টে গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫ হাজার টন কম ইলিশ আহরন হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছে, গভীর সাগর ছেড়ে ইলিশ নদীতে প্রবেশ না করায় এবার আহরনের পরিমান গত বছরের তুলনায় কম হয়েছে। যেকারনে অনেকাংশে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন জেলে ও বিশেষজ্ঞরা।
দেশের মোট ইলিশের দুই-তৃতীয়াংশ আহরিত হয় দক্ষিণাঞ্চলের সাগর ও নদী থেকে। তবে বরিশাল মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, কয়েকটি কারনে ইলিশ এবার সাগর ছেড়ে নদীতে কম প্রবেশ করেছে। যার অন্যতম হলে বৃস্টি কম হওয়া, নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস এবং জলবায়ুর পরিবর্তন। বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ১৬ ও ১৭ সালের মৌসুমে দক্ষিণে রেকর্ড পরিমান ইলিশ পাওয়া গিয়েছিল। গতবছর এর পরিমান অনেক কমে যায়। অধিদপ্তরে এবছরের ৩০ আগষ্ট পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী এর পরিমান আরও এক ধাপ কমেছে।
অধিদপ্তরটির তথ্যনুযায়ী, ইলিশের ভরা মৌসূম এবছর জুলাইতে বিভাগের ৬ জেলায় মোট ১১ হাজার ৭৮৬ টন ইলিশ পাওয়া গেছে। গতবছর জুলাইতে এর পরিমান ছিল ১০ হাজার ৬০০ টন। অথচ গত বছর ১ জুলাই থেকে নির্বিগ্নে ইলিশ ধরা শুরু হলেও এবার ২৩ জুলাই পর্যন্ত সাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ ছিল। তারপরও গত বছরের চেয়ে এবছর জুলাইতে সহ¯্রাধিক টন বেশী ইলিশ পাওয়া যায়। এর আগে ২০১৭’র জুলাইতে ১৩ হাজার ৫৭৪ টন এবং ২০১৬’র জুলাইতে ১৬ হাজার ৭৭৫ টন ইলিশ আহরিত হয়েছিল বরিশাল বিভাগে।
ইলিশের ভরার মৌসূম এবছর আগষ্টে গত বছরের তুলনায় ৬ হাজার ৩০২ টন কম ইলিশ আহরিত হয়েছে। বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের দেয়া হিসাব অনুযায়ী এবারের আগষ্টে ১৬ হাজার ১৬৩ টন ইলিশ আহরিত হয়। গতবছর ইলিশ আহরনের পরিমান ছিল ২২ হাজার ৪৬৫ টন। তার আগের বছর (২০১৭) একই মাসে ২৪ হাজার ২৯৬ দশমিক ৯১৮ মেট্রিক ইলিশ পাওয়া গিয়েছিল। এসব হিসাব-নিকাশে এবছর জুলাই ও আগষ্টে গত বছরের তুলনায় ৫ হাজার ১১৬ টন কম ইলিশ আহরিত হয়েছে বলে মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যে পাওয়া গেছে।
যে কারনে ইলিশ আহরন কম: মৌসুমের শুরু থেকেই মৎস্য অধিদপ্তর দাবী করেছে ইলিশ উৎপাদন বেড়েছে। মঙ্গলবার সকালেও বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের সিনিয়র সহকারী পরিচালক আজিজুল হক বলেন, ‘ইলিশ কি কমেছে, প্রচুর ইলিশ হাটবাজারে।’ কিন্তু এবার আমাবশ্যা-পূর্নিমা গেলেও ইলিশের কাংখিত দেখা মেলেনি জেলেদের জালে। যেকারনে মৌসুমের শেষ পর্যায়ে এসে হতাশ ও চিন্তিত হয়ে পড়েছে জেলে এবং ইলিশ বিশেষজ্ঞরা।
জানতে চাইলে বরিশাল মৎস্য কর্মকর্তা (ইলিশ) ড. বিমল চন্দ্র দাস বলেন, সাগরে পর্যাপ্ত ইলিশ থাকলেও নদীতে প্রবেশ করতে না পারায় এবার ইলিশ কম ধরা পড়েছে। গতবছর আগষ্টে বরিশাল নগরীর পোর্ট রোড মোকামে ১ হাজার টন ইলিশ ইলিশ বিক্রি হয়েছিল। এবার একই মাসে বিক্রি হয়েছে ৬০০ টন। এর কারন সম্পর্কে ইলিশ নিয়ে গবেষনা করা ড. বিমল বলেন, জলবায়ুর প্রভাবে বৃষ্টি কমে যাওয়ায় সাগরের ইলিশ নদীতে আসছে না। তাছাড়া সাগরের মোহনাগুলোতে নিরবিচ্ছিন্নভাবে জাল পেতে রাখায় নদীতে প্রবেশে বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে। এবার ভরা মৌসূমে ইলিশ কম ধরা পড়ার বিষয়টি চিন্তার বিষয় জানিয়ে ড. বিমল বলেন, ‘এর প্রকৃত কারন খুজতে গবেষনার প্রয়োজন।’
এ প্রসঙ্গে চাঁদপুর ইলিশ গবেষনা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিছুর রহমান বলেন, অভ্যন্তরীন নদ-নদীতে যেভাবে নাব্য হ্রাস পাচ্ছে তাতে গভীর জলের সন্ধানে ইলিশের গতিপথ পরিবর্তন করে ফেলা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তিনি বলেন, ইলিশের অভয়শ্রম মেঘনার চাঁদপুরের হরিণঘাটা, আনন্দবাজার, ভোলার ইলিশা, মেহেন্দিগঞ্জের কালীগঞ্জ, প™§ার মাওয়া ঘাটসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ন নদ-নদীর নাব্য হ্রাস পেয়েছে। অভয়শ্রম এলাকায় সেতু, বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ স্থাপনা নির্মান এবং নদী দুষনের কারনে সেখানে ইলিশ বিচরন বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে।
এব্যাপারে বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরে উপ পরিচালক ড. অলিয়ুর রহমান বলেন, এবার ইলিশ একটু অন্য বছরের তুলনায় কম। তবে আরও ক’টা দিন অপেক্ষা করার কথা বলে তিনি বলেন, ইলিশ বেশি আহরন হয়েছে তা বলা যাবে না। এর কারন হিসেবে তিনি, বৈরী আবহাওয়া, সমুদ্র থেকে ইলিশ উজানে আশার মুখে বাধা ও বিভিন্ন স্থানে ডুবচরকে দায়ী করেন।
প্রসঙ্গত, মা ইলিশের প্রজনন নিরাপদ করতে আগামী ৯ অক্টোবর রাত ১২টায় ইলিশ নিধনে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরুর মধ্যদিয়ে শেষ হবে এ বছরের মৌসুম। বছরের লক্ষমাত্রার ৬০ ভাগেরও বেশী ইলিশ পাওয়া যায় জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে।
২০১৯-০৯-১৯
