পুলক চ্যাটজি : অতিথি প্রতিবেদক : তেতুলিয়া ও কালাবদর নদী বিভাগীয় সদর বরিশালকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে দ্বীপ জেলা ভোলাকে। দুই জেলার মধ্যে সড়কপথে দুরত্ব মাত্র ৫৬ কিলোমিটার। ভোলায় পাওয়া গেছে প্রাকৃতিক গ্যাস। ওই গ্যাস দিয়ে উৎপাদিত হচ্ছে বিদ্যুৎ। সরবরাহ হচ্ছে শিল্প কারখানায়। একদশক আগ থেকে আবাসিক গ্যাস সেবা পাচ্ছে ভোলার মানুষ। অথচ দক্ষিণের প্রধান শহর বরিশাল এখনও বঞ্চিত ভোলার গ্যাসসেবা থেকে। স্থাপিত হয়নি সড়ক যোগাযোগ।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারী বরিশালের বঙ্গবন্ধু উদ্যানে অনুষ্ঠিত এক নির্বাচনী জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ভোলায় পাওয়া গ্যাস পাইপ লাইনের মাধ্যমে বরিশালে সরবরাহ ও ভোলার সঙ্গে বরিশালের সড়ক যোগাযোগ স্থাপনে সেতু নির্মান করা হবে। বরিশালের মানুষ প্রধানমন্ত্রীর ওই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন চায়। বরিশালের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার সচেতন মানুষ বলেছেন, কমপ্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস (সিএনজি) না আসায় শিল্পে পিছিয়ে পড়ছে বরিশাল। ফলে বাড়ছে না কর্মসংস্থান। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় ভোলার মাছ ও উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না কৃষক ও মৎসজীবীরা। বরিশালের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভোলার গ্যাস বরিশালে সরবরাহ এবং সড়ক যোগাযোগ স্থাপন এখন সময়ের দাবী।
তবে এ ব্যাপারে আশার কথা শুনিয়েছেন বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার মো. ইয়ামিন চৌধুরী। তিনি বৃহস্পতিবার রাতে বলেছেন, ভোলার সঙ্গে সড়কপথে বরিশালকে যুক্ত করতে সেতু বিভাগের সচিবসহ একাধিক সচিব ডিসেম্বরে সরেজমিনে পরিদর্শনে এসেছিলেন। ১২ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক ও সেতু নির্মানের প্রাথমিক সমীক্ষা শুরু হয়েছে। সমীক্ষা শেষে প্রকল্প গ্রহন করে কাজ শুরু হবে। সড়ক ও সেতুর কাজ শুরু হলেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস পাইপলাইন নির্মানের কাজও এগিয়ে যাবে। বিভাগীয় কমিশনার মো. ইয়ামিন চৌধুরী আশা প্রকাশ করেন আগামী ৩ বছরের মধ্যে বরিশালের সঙ্গে ভোলার সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। গ্যাসও আসবে বরিশাল।
একই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন বরিশাল- ৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব:) জাহিদ ফারুক শামীম। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদেই ভোলার গ্যাস বরিশালে আসবে, স্থাপিত হবে সড়ক যোগাযোগ।
বরিশাল নাগরিক পরিষদের সদস্য সচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, প্রাকৃতিক গ্যাস না থাকায় বরিশালে শিল্পের তেমন বিকাশ ঘটছেনা। বিদ্যুৎ ও ডিজেল দিয়ে লাভজনক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারছেন না উদ্যোক্তারা। বরিশালে এখনও আবাসিক এবং ছোটখাট বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এলপিজি গ্যাস নির্ভর। এতে ভোগান্তির পাশাপাশি বাড়তি খরচ হচ্ছে মানুষের।
বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাষ্ট্রিজের সভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে বরিশালের শিল্প প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ করা গেলে এ অঞ্চলের ব্যবসা বানিজ্য ও শিল্পখাতে নতুন দিগন্তের সুচনা হবে। সড়ক যোগাযোগ হলে ভোলার মাছ ও কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবেন সংশ্লিষ্টরা। সাইদুর রহমান রিন্টু আরও বলেন, প্রাকৃতিক গ্যাস আসলে ঢাকা-চট্রগ্রাম ও গাজীপুরের মতো বরিশালেও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়তে উদ্যোক্তারা প্রতিযোগীতা শুরু করবেন। ফলে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বদলে যাবে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি।
বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, পদ্মাসেতু, পায়রা বন্দর এবং তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ঘিরে বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলে যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কর্মযজ্ঞ চলছে তাতে প্রাকৃতিক গ্যাস এখন একান্ত আবশ্যক হয়ে পড়েছে। তাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভোলার গ্যাস বরিশালে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক নেতা অধ্যাপক মহসিন উল ইসলাম হাবুল বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুত ভোলার গ্যাস বরিশালে না আসলে দক্ষিণাঞ্চল অবহেলিতই থাকবে।
উল্লেখ্য, বরিশাল থেকে সড়কপথে মাত্র ৫৬ কিলোমিটার দুরের জেলা ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার শাহবাজপুরে প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান পাওয়া যায় ১৯৯৩ সালে। ১৯৯৫ সালে শাহবাজপুর গ্যাস ফিল্ড উদ্বোধন করা হয়। ২০০৯ সালে ভোলার একাধিক বিদ্যুৎ প্লান্টে ওই গ্যাস ফিল্ড থেকে সরবরাহ শুরু হয়। পরবর্তীতে ভোলার শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং বানিজ্যিক ও আবাসিক সেক্টরেও গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে।
২০২০-০১-০৪
