নাগরিক প্রতিবেদন : নৌযান দূর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন ও অভিযুক্ত লঞ্চের রুট পারমিট স্থগিত করা বিআইডব্লিউটিএর রুটিন ওয়ার্ক কাজ। এরপর তদন্ত কমিটি কখনও আলোর মুখ দেখেনা। এক পর্যায়ে অভিযুক্ত লঞ্চটিও যাত্রী পরিবহন শুরু করে। নৌপথের দূর্ঘটনায় নদীপথের নিয়ন্ত্রক বিআইডব্লিউটির এমন রেওয়াজ যেন পরিবর্তন হচ্ছেনা। গত ১৩ জানুয়ারী দিবাগত গভীর রাতে চাঁদপুর সংলগ্ন মেঘনার নামারচর এলাকায় ফারহান- ৯ লঞ্চের ধাক্কায় কীর্তণখোলা- ১০ লঞ্চের তৃতীয় শ্রেণীর (ডেক) যাত্রী শিশু সন্তানসহ গর্ভবতী নারী নিহত হওয়ার ঘটনাও একইপথে অগ্রসর হচ্ছে।
ঘটনার দিনই গঠিত ৪ সদস্যের কমিটি তদন্ত কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। গতকাল শনিবার ১৯ দিন পেরিয়ে গেলেও তদন্ত কমিটি এ পর্যন্ত প্রতিবেদন দেয়নি। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সুত্র জানিয়েছে, ওই দূর্ঘটনায় অভিযুক্ত লঞ্চ ফারহান- ৯ এর মালিক জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু। ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পরই তিনি নৌসেক্টরে মহাপ্রভাবশালী ব্যক্তিতে অবিভূত হন। ফলে গত ১৩ জানুয়ারীর দূর্ঘটনানার তদন্তও বিগত দিনগুলোর মতো হিমাগারে যাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।
ওই ঘটনার জন্য গঠিত তদন্ত দলের প্রধান হচ্ছেন বিআইডব্লিউটিএ’র অতিরিক্ত পরিচালক (বন্দর) মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি বৃহস্পতিবার নিশ্চিত করেছেন যে এখন পর্যন্ত তদন্ত সম্পন্ন করতে পারেননি। তিনিসহ তদন্ত দলের অন্যান্য সদস্যদের দাপ্তরিক আরো অনেক কাজ থাকায় তদন্ত সম্পন্ন করতে পারেননি বলে জানান। তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত ১০-১২ জনের স্বাক্ষ্য গ্রহন করেছেন। আগামী সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে পারবেন।
দূর্ঘটনায় স্ত্রী ও সন্তান হারানো বাকেরগঞ্জের মাইক্রো ড্রাইভার রুবেল খান আব্বাস বলেন, এ ঘটনার বিচার চেয়ে মামলা করার জন্য অনেক স্থানে ঘুরেছেন। পরে হিজলা থানায় মামলা দায়ের করেন গত ২১ জানুয়ারী। মামলায় লঞ্চ মালিক, মাস্টার ও সুকানিকে আসামী করতে চাইলে ওসি বলেছেন, মালিক তো লঞ্চ চালায়নি। পরে ওসি লঞ্চ মালিকের নাম বাদ দিয়ে তার মনমত এজাহার লিখেছেন। ফারহান লঞ্চ- ৯ লঞ্চের মালিক পক্ষ থেকে সহায়তা তো দুরে থাক, একটি ফোনও দিয়েও শান্তনা জানায়নি।
বিআইডব্লিউটিএ একাধিক সুত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ওই দূর্ঘটনার জন্য অভিযুক্ত ফারহান- ৯ লঞ্চটিতে নিয়ামানুযায়ী প্রথম শ্রেণীর চালক নিয়োগ দেয়া ছিলনা। দূর্ঘটনার দিন লঞ্চটির চালক ছিলেন দ্বিতীয় শ্রেণীর। তিনি সেদিন তীব্র ঘণ কুয়াশায় লঞ্চটি নোঙ্গর না করে সামনের দিকে এগুতে থাকে। একপর্যায়ে দিক হারিয়ে ঢাকা-বরিশাল রুটের কীর্তণখোলা- ১০ লঞ্চের ওপর আছড়ে পড়ে। এতে কীর্তণখোলা- ১০ লঞ্চের যাত্রী গর্ভবতী মা ও ১০ বছর বয়সী শিশু সন্তান নিহত ও ১০ জন আহত হয়।
সুত্রগুলো জানিয়েছে, ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চল রুটে চলাচলকারী ফারহান ও টিপু নামক লঞ্চগুলোর মালিক গোলাম কিবরিয়া টিপু। তিনি নৌ সেক্টরে প্রভাবশালী হওয়ায় এ কোম্পানীগুলোর লঞ্চগুলোও নৌপথে বেপরোয়া। ১৩ জানুয়ারী দূর্ঘটনার পর ১৬ জানুয়ারী মেঘনায় টিপু- ১২ লঞ্চ আওলাদ- ৪ নামক একটি লঞ্চকে মেঘনায় ধাক্কা দিলে কয়েকজন যাত্রী আহত হন। গোলাম কিবরিয়া টিপুর মালিকানাধীন ফারহান- ৪ লঞ্চের বিরুদ্ধে সম্প্রতি বিআইডব্লিুটিএ আরও একটি মামলা করেছে। সুত্রগুলো জানায়, মালিক টিপুর প্রভাব-প্রতিপত্তির কারনে বিআইডব্লিউটিএ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারও অনেকটা অসহায়। এ প্রতিষ্ঠানের লঞ্চগুলোর বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারেননা। কীর্তণখোলা লঞ্চের যাত্রী মা ও শিশু সন্তানের ঘাতক ফারহান- ৯ লঞ্চটিও একইভাবে পার পেয়ে যাওয়ার সম্ভবনা আছে।
তবে অভিযোগ প্রসঙ্গে লঞ্চ মালিক গোলাম কিবরিয়া টিপু বলেন, তার প্রতিষ্ঠানের লঞ্চের সংখ্যা বেশী এবং তিনি ভিন্ন মতালম্বের রাজনীতি করায় অন্য মালিকরা মিথ্যাচার করছেন। যা ঘটে ফেসবুকের মাধ্যমে তার চেয়ে বেশী গুজব ছড়ানো হয়। দূর্ঘটনার দিন ফারহান- ৯ লঞ্চে দ্বিতীয় শ্রেণীর চালক ছিলেন স্বীকার করে টিপু দাবী করেন, প্রথম শ্রেণীর মাষ্টার ওইদিন ছুটিতে ছিলেন। নিহতদের পরিবারের খোঁজ না পাওযায় তাদের সহযোগীতা কিম্বা সহমর্মিতা জানাতে পারেননি দাবী করে এ লঞ্চ মালিক বলেন, যেসসব যাত্রীরা তার কাছে এসেছেন তাদের ক্ষতিপুরন দেয়া হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএ’র বরিশাল বন্দর কর্মকর্তা (যুগ্ন পরিচালক) আজমল হুদা মিঠু বলেন, দূর্ঘটনার দিন দুপুরে ফারহান- ৯ লঞ্চের মাষ্টার ও সুকানীকে ভান্ডারিয়া থেকে গ্রেফতার করার পর তারা কারাগারে আছেন। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর এ লঞ্চটির বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অভ্যন্তরীন নৌযান পরিবহন সংস্থার (মালিক সমিতি) সহ সভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, দূর্ঘটনার পর দায়ী লঞ্চের বিরুদ্ধে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া উচিত। অনথ্যায় নৌপথের ওপর যাত্রীরা আগ্রহ হারাবে। তাছাড়া অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মালিক সমিতি বিআইডব্লিউটিএ’র ওপর কখনও হস্তক্ষেপ করেনা।##
২০২০-০২-০১
