নাগরিক রিপোর্ট: ১০ বছরে পদার্পন করলো দক্ষিনাঞ্চলের অন্যতম বিদ্যাপিঠ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি)। ২০১১ সালের ২২ ফেব্রæয়ারী প্রধানমন্ত্রী শেষ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এ উপলক্ষে কর্তৃপক্ষ আজ শনিবার ‘বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ পালনের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু নানা সংকট ঘিরে রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে। প্রতিষ্ঠার ৯ বছরেও শেষ হয়নি প্রথম ধাপের অবকাঠামো উন্নয়ন। নতুন কোন প্রকল্পও পেশ করতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা। যেকারনে থমকে আছে ববি’র উন্নয়ন। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়টির ৯৫ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজের সময়সীমা ৩ বার বৃদ্ধি পেয়ে নির্মান ব্যয় ১৭৩ কোটি টাকায় পৌছেছে। অপরদিকে শেষনজট, শিক্ষক, ক্লাস রুম, আবাসন, পরিবহন ও লাইব্রেরীতে বই সংকটে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থাও। বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. ছাদেকুল আরেফিন এ তথ্যের সত্যতা স্বীকার করে বলেছেন, এধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জুনের মধ্যে প্রথম ধাপের উন্নয়ন কার্যক্রম শেষ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ বছরই ডিপিপি’র মাধ্যমে নতুন প্রকল্প পেশ করারও পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: মুরশীদ আবেদিন বলেন, ১০ বছরে পদার্পন করলেও ববি অকাঠামো উন্নয়নে পিছিয়ে আছে। নতুন উপাচার্য যোগদান করে ইতোমধ্যে সব ধরনের সংকট কাটাতে উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী এসব উন্নয়ন কাজ অনেক আগেই শেষ হওয়া উচিৎ ছিল। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন ববি’র সাথে একই সময় শুরু হয়েছিল। সেখানকার কাজের প্রথম ধাপ অনেক আগে শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপের উন্নয়ন কাজও অনেকটা শেষের পথে। কিন্তু ববি’র প্রথম ধাপের কাজই শেষ হয়নি। উদাহরন হিসেবে তিনি বলেন, ৩ বছরেও শেষ হয়নি কেন্দ্রীয় মসজিদ নির্মান। ৬ থেকে ৭ বছর হল একটি ডরমেটরির নির্মান কাজ শেষ হয়নি। বঙ্গমাতা ফজিলাতুনন্নেছ মজিব হল ৩ বছরেও শেষ করা যায়নি। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে এ হলের নির্মান কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। ল্যাবরেটরির বিভিন্ন সরঞ্জামাদিও ক্রয় সম্পন্ন হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নিচু এলাকায় বালু ফেলার কাজ এখনও চলমান।
২০১২ সাল থেকে শুরু হওয়া এই উন্নয়নর প্রথম ধাপের ৯৫ ভাগ শেষ হয়েছে। এজন্য তিনি শিক্ষা ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের গাফিলতিকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, বর্তমান উপাচার্য আগামী জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
শিক্ষা ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গির হোসেন বলেন, জুনের মধ্যে নির্মান কাজ শেষ হয়ে যাবে। দীর্ঘ সময় লাগার কারন হিসেবে তিনি জমি অধিগ্রহনে বিলম্বসহ নানা যুক্তি দেখিয়েছেন। আর ব্যয় বৃদ্ধির কথা অস্বীকার করে বলেছেন, পিপিতে যে ব্যয় ধরা হয়েছে ওই অর্থেই তার কাজ শেষ করছেন।
এ প্রসঙ্গে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্পের দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা (পিডি) আবুল বাশার বলেন, তিনি ২০১৮ সালে দায়িত্ব গ্রহন করলেও আর্থিক ক্ষমতা পাননি। যেকারনে ৯৫ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজের সময় সীমা ৩ বার বৃদ্ধি হয়ে এখন ১৭৩ কোটি টাকায় পৌছেছে। কাজ শেষ করতে শিক্ষা ও প্রকৌশল অধিদপ্তরকে বার বার তাগিদ দিলেও তারা নানা অযুহাত দেখিয়েছে। তিনি মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজ পিছিয়ে গেছে। কিন্তু এটি হওয়া উচিৎ হয়নি। এখন পর্যন্ত নতুন কোন প্রকল্প গ্রহন না করতে পারা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০১৮ সারে এ বিষয়ে তৎকালীন ভিসি একটি কমিটি করে দেন। ওই কমিটির ২জন অনুপস্থিত ছিল। তিনি কমিটির প্রতিবেদন এরপরও পেশ করেছেন।
এদিকে নানা সংকটে শিক্ষা ব্যবস্থা বাধাগ্রস্থ হচ্ছে বলে শিক্ষক ও ছাত্ররা দাবী করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র সুজয় বিশ্বাস বলেন, ১০ বছরে পা দিলেও সংকটের শেষ নেই এ বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। লাইব্রেরীতে গেলে পাঠ বইও পাওয়া যায় না। ক্লাস রুম না থাকায় দাড়িয়ে থাকতে হয় শিক্ষার্থীদের। বিজ্ঞানাগার নেই মান সম্মত। আবাসন ব্যবস্থা অতি সীমিত। ছোট্ট একটি খাটে ২জনকে থাকতে হয়। পরিবহন সংকট তীব্র। এর উপর শেষন জট দেখা দিয়েছে বিভিন্ন বিভাগে। বৃস্টি এলেই ক্যাম্পাস পানিতে ডুবে যায়। অথচ সুয়েরেজ ব্যবস্থা নেই সেখানে।
শিক্ষক সমিতির সভাপতি সহকারী অধ্যাপক রো: আরিফ হোসেন বলেন, এখানে শিক্ষক সংকট তীব্র। অনেক বিভাগে ৩/৪জন শিক্ষক রয়েছে। ক্লাস রুমের অভাব প্রকট। ল্যাব ফেসিলিটিজ পর্যাপ্ত নেই। শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের পরিবহন সংকট। আবসিক সমস্যা দুর করা দরকার। বিগত প্রশাসনের দুর্বলতার কারনে প্রথম ধাপের উন্নয়ন কাজ এখনও শেষ হয়নি। এর দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। তিনি বলেন, শেষন জট থাকলেও শিক্ষকরা চেস্টা করছেন তা কাটিয়ে উঠতে। একইমত দিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি আবু জাফর মিয়া।
এসব সংকটের কথা অকোপটে স্বীকার করেছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. ছাদেকুল আরেফিন। তিনি বলেন, ১০ বছরে পদার্পন করলেও ববিতে অনেক অসম্পূর্নতা রয়েছে। একাডেমিক ভবন, আবাসিক হল, আবাসিক ভবন, মেডিকেল সেন্টার, জায়গা বৃদ্ধি করা দরকার। এখন পর্যন্ত প্রথম ধাপেরই কাজ শেষ হয়নি। এমনকি নতুন কোন প্রকল্পও পেশ করা হয়নি। অথচ পুরানো প্রকল্পের সময় বার বার বৃদ্ধি করা হয়েছে। তিনি আগামী জুনের মধ্যে এসব কাজ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন। নতুন প্রকল্প গ্রহনের জন্য কাজ শুরু করেছেন। এবছরের মধ্যেই তা পেশ করা হবে। শিক্ষা ও গবেষনার দিক থেকে অভিজ্ঞ শিক্ষক সংকট তীব্র। ২৪টি বিভাগের মধ্যে মাত্র ২টি বিভাগে অধ্যাপক লেভেলের শিক্ষক আছেন। তিনি এসব সংকট কাটিয়ে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছেন। শেষসজট কমাতে চেয়ারম্যানদের সাথে কথা বলেছেন। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বেশ কিছু কাজ করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়তন আরও ৩০০ একর বৃদ্ধির চেস্টা করছেন বলে জানান উপাচার্য ড. ছাদেকুল আরেফিন।

