সম্পাদকীয়: শনিবার ভোররাতে একটি খবর পড়ে আতঁকে উঠলো মনটা। কুড়িগ্রামের একজন সংবাদকর্মী আরিফুল ইসলামকে বাসার দরজা ভেঙ্গে টেনে হিচরে মারতে মারতে জেলা প্রশাসক কার্যালয় নিয়ে যাওয়া হয়। তার চোখ বেঁধে পোশাক খুলে নির্যাতন করা হয়েছে বলে আরিফ এর স্ত্রী মোস্তারিমা সরদার নিতু অভিযোগ করেছেন। এ সংক্রান্ত একটি সংবাদ ডেইলি নাগরিকে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হয়েছে।
সংবাদের তথ্যমতে, আরিফের কাছে মাদক পাওয়া গেছে এমন অভিযোগে ভ্রাম্যমান আদালতে কারাদন্ড দিয়ে কারাগারে প্রেরন করা হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে এর নেপথ্যে রয়েছে কুড়িগ্রামের জেলাপ্রশাসক সুলতানা পারভীন এর নামে একটি পুকরের নামকরন। সংবাদকর্মী আরিফ গনমাধ্যমে একটি সংবাদে উল্লেখ করেছিলেন যে, সেখানকার একটি সরকারী পুকুর কাবিখার টাকায় সংস্কার করে এর নাম রাখা হয়েছিল “সুলতানা সরবর”।
জেলা প্রশাসক জেলার প্রশাসনিক প্রধান। তাই হয়তো ওনার সাধ জেগেছে যাওয়ার আগে একটি সরকারী পুকুর তার নামে করার। জেলা প্রশাসকরা জনগনের অর্থে এমন অনেক খায়েশই মেটান। যেমন মিটিয়েছিলেন বরিশালের জনৈকি একজন জেলা প্রশাসক। গুঞ্জন রয়েছে বরিশালের বিভিন্ন দপ্তরে দপ্তরে তার স্বজনদের চাকির পাকাপোক্ত করেও গিয়েছিলেন। কিন্তু গনমাধ্যম কর্মী হিসেবে আমরা মনে করি সংবাদকর্মী আরিফুলকে এভাবে রাতের আধারে ধরে না এনে, উলাঙ্গ করে মারধর না করে, মিথ্যা মাদক মামলায় না ফাঁসিয়ে আর একটু ভদ্র ভাবে ডিসি সাহেব সায়েস্তা করতে পারতেন। এখন নির্যাতনের ভিডিও ফাঁস হওয়ায়, দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠায় ‘সাংবাদিক’ নাম শুনলেই যাদের গায়ে জা¡লা ওঠে তারা ধীরে ধীরে নানা তত্ত্ব বের করবেন।
এর আগে পাপিয়া কান্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় প্রবীন সাংবাদিক দৈনিক মানবজমিনের সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মাগুরার সাংসদ সাইফুজ্জামান শিখর মামলা দায়ের করেন। ডেইলি নাগরিকে এ সংক্রান্ত সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদ শেয়ার করার দায়ে ওই মামলার অন্যতম আসামী ছিলেন সাংবাদিক শফিকুল কাজল। তিনি গত ক’দিন ধরে নিখোজ। তার স্ত্রী, সন্তান শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে কাজলকে ফেরত দেয়ার আকুতি জানিয়েছেন।
যুগ যুগ ধরে এভাবে সাংবাদিক কাজল ভাইয়েরা নিখোজ হয়েছেন। আরিফুল কারাবরন করেছেন। তখন সাংবাদিক সংগঠনগুলো দায়সারা প্রেসবিজ্ঞপ্তি দিয়ে নিন্দার ঝড় তুলেন। কোথাও আবার সাংবাদিক নেতারা ঘোমটা পড়ে থাকেন। মতি ভাই, কাজল ভাই আর আরিফুল ভাইয়ের সহকর্মী এবং শুভাকাংখীরা আহাজারি করলেও ঘোমটা পড়া সাংবাদিক নেতাদের মন গলে না। ভোটের সময় কেবল নেতাদের মাঠের সাংবাদিকদের কথা মনে পড়ে। তখন পেশাদার সাংবাদিকদের কাছে কেউ যান গুলিস্থান থেকে আনা পারফিউম নিয়ে, কেউ যান কমলা নিয়ে, কেউ যান বাইসাইকেল নিয়ে, আবার কেউ যান কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে আনা নকল ‘ভালবাসা’ নিয়ে।
আহারে সাংবাদিকতা। জেলা প্রশাসক, সাংসদদের দোষ দিয়ে কি লাভ? আমরাই তো আমাদের রক্ষায় একটু করুনাও করি না। বরং অনুপ্রবেশকারীদের লালনপালন করি। স্বার্থের জন্য সাংবাদিক প্রতিষ্ঠানও বিক্রি করে দেই।
আমরা পেশাদার সাংবাদিকদের বলতে চাই- আহাজারি করবেন না, হতাশ হবেন না, বিচারও চাইবেন না। দেখবেন তারাও একদিন হয়তো মতি ভাই, কাজল ভাই আর আরিফুল ভাইয়ের মত ফেঁসে যেতে পারেন। তখন হয়তো ঘোমটা পড়া সাংবাদিক নেতাদের জন্য কাউকে মাঠে খুজে নাও পাওয়া যেতে পারে!
২০২০-০৩-১৪
