যেভাবে নারায়নগঞ্জে ছড়িয়েছে করোনাভাইরাস

Spread the love

নাগরিক ডেস্ক : করোনা সংক্রমনে নারায়ণগঞ্জের স্বাভাবিক জীবন-যাত্রা বিপর্যস্থ। সর্বত্র উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। মারণঘাতি করোনাভাইরাসের হটস্পট হিসাবে চিহিৃত হয়েছে নারায়ণগঞ্জ। একদিকে এ জেলাতে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন জেলায় সংক্রমণ ছড়াচ্ছে নারায়নগঞ্জ থেকে যাওয়া ব্যক্তিরা। দেশের অন্তত ১৫টি জেলায় সংক্রমিত প্রথম ব্যক্তি নারায়ণগঞ্জ ফেরত। রোববার সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত নারায়নগঞ্জে করোনায় মৃত্যের সংখ্যা ২৬। আর আক্রান্ত হয়েছেন ৩৩০।
যেসব কারণে হটস্পট নারায়ণগঞ্জ
প্রথমত আইইসিডিআর এর তথ্যমতে, দেশে প্রথম ২ পুরুষ ও এক নারী করোনা শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। পুরুষ দুইজন ইতালি প্রবাসী। স্বামীর সংস্পর্শে এসে ওই নারী সংক্রামিত হয়। তারা তিনজনই নারায়ণগঞ্জ শহরের ব্যস্ততম ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র টানবাজার এলাকায় আল জয়নাল প্লাজায় থাকতো। যদিও পরবর্তীতে তারা সুস্থ হয়েছেন। প্রবাসী এই ব্যক্তি বিদেশ থেকে আসার ৫দিন পর তার করোনা পজেটিভ আসে। এই ৫দিন সে তার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের সাথে মিশেছে। হোটেল-রেস্তোরায় গিয়েছে। শহর ঘুরে বেড়িয়েছে। শপিংয়ে গিয়েছে স্ত্রীকে নিয়ে। মোটকথা যত জায়গায় ওই ৫দিন সে গিয়েছে সব জায়গায় সে ভাইরাসটি ছড়িয়েছে। কিন্তু কোথায় কোথায় এবং কার কার মধ্যে এটা ছড়িয়েছে তা চিহ্নিত করা হয়নি।
দ্বিতীয়ত ৩০ এপ্রিল করোনার উপসর্গ নিয়ে কুর্মিটোলা হাসপাতালে প্রথম মারা যায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের বন্দরে ২৩নং ওয়ার্ডের রসুলবাগে পুতুল (৫০) নামে এক নারী। ২ এপ্রিল তার নমুনা পরীক্ষায় করোনা পজেটিভ আসে। কিন্তু এই নারী অসুস্থ থাকা অবস্থায় নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টরিয়া) হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। সেখানে তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। হাসপাতালের সেবা প্রদানকারী চিকিৎসক, নার্স, এ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার, প্রাইভেট ল্যাবের টেকনিশিয়ান, এক্সরে টেকনিশিয়ান, আয়া ও চেম্বার এসিস্ট্যান্ট আক্রান্ত হয়েছেন। অসুস্থ্য অবস্থায় তিনি শহরের পাইকপাড়ায় তার বাপের বাড়িতেও গিয়েছেন। সেখানে যারাই তার সংস্পর্শে এসেছে তারা সবাই সংক্রামিত হয়েছে। এখানেই শেষ নয়। কুর্মিটোলায় মারা যাওয়ার পর ওই নারীর মরদেহ সেখান থেকে প্যাকেটবন্দি করে বলে দেয়া হয় প্যাকেট যাতে না খোলা হয়। এবং প্যাকেটবন্দি অবস্থায় দাফন করার জন্য নির্দেশনা দিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু স্বজনরা বাড়িতে লাশ আনার পর প্যাকেট থেকে মরদেহ বের করে ফেলে। এসময় স্বজননা লাশ স্পর্শ করে কান্নাকাটি করে। প্রতিবেশীরা লাশ দেখেতে বাড়িতে আসে।
তৃতীয়ত্ব ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষনা করে। এতে করে বাংলাদেশ নিট ওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারাস অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) ও বিজেএমইএ গত ২৯ মার্চ জরুরি সভা করে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত গার্মেন্টস বন্ধ ঘোষণা করে। ছুটি বাড়ানোর ঘোষণা না দেওয়ায় কর্মস্থলে যোগ দিতে করোনার ঝুঁকি মাথায় নিয়েই পায়ে হেঁটে, রিকশা-ভ্যান ও পণ্যবাহী ট্রাকে চড়ে হাজার হাজার শ্রমিক নারায়ণগঞ্জ চলে আসেন। হাজারো শ্রমিকের সমাগমে অনেকেই সংক্রামিত হয়। যার প্রমান বিভিন্ন জেলায় আক্রান্ত হওয়া প্রথম ব্যক্তি নারায়ণগঞ্জ ফেরত।
চতুর্থত: নারায়ণগঞ্জের প্রশাসনের উদাসীনতা। কারণ ৬ হাজার ২১ জন প্রবাসী শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলায় প্রবেশ করে। সবশেষ তথ্য অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন মাত্র ১ হাজার ২৫৯ জনের নাম ঠিকানা ও অবস্থান চিহ্নিত করতে পেরেছে। এবং তাদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করেন। কিন্তু বিপুল সংখ্যক প্রবাসী হোম কোয়ারেন্টাইনের বাইরে রয়ে যায়। তাদের অবাদ বিচরণ বিভিন্ন এলাকার মানুষকে সংক্রামিত করেছে।
পঞ্চমত সরকারের সাধারণ ছুটির পরও জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন ফ্যাক্টরী চালু ছিল, এখনো আছে। ওই সব ফ্যাক্টরীতে হাজারো শ্রমিকের মধ্যে কোন প্রকার সামাজিক দুরুত্ব বজায় রাখা হয়নি। ফলে একজন শ্রমিক সংক্রামিত হয়ে থাকলে সে আরো অনেককেই সংক্রামিত করেছে। এছাড়া কাচাবাজারে বিপুল পরিমান ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম নিয়ন্ত্রনে প্রশাসন থেকে কার্যকরী কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আবার ত্রাণ বিতরণ করার সময়ও ত্রাণদাতারা অসংখ্য মানুষের সমাগম ঘটিয়েছে লকডাউনের আগে। তখন একে অপরের সংস্পর্শে এসে অনেকেই সংক্রামিত হয়েছে। লকডাউন ঘোষণার ক্ষেত্রেও বিলম্ব হয়েছে। লকডাউন ঘোষণা করা হলেও অনেকে তা মানছেন না।
এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন (ভারপ্রাপ্ত) ডা. ইকবাল বাহার গণমাধ্যমকে বলেন, নারায়ণগঞ্জ হটস্পট হওয়ার কারণটা আমরা এখনো নির্নয় করতে পারিনি। তবে আমার ধারণা নারায়ণগঞ্জ একটা ঘণবসতিপূর্ণ এবং শ্রমিক অধুষ্যিত এলাকা। অল্প জায়গায় মানুষ বেশি। নারায়ণগঞ্জে অনেক ইতালি ফেরত মানুষ আছে। ওদেরকে সত্যিকার অর্থে আমরা চিহ্নিত করতে পারি নাই। বাংলাদেশে প্রথম যে করোনা রোগী পাওয়া গেছে সেটা নারায়ণগঞ্জে। তিনি কিন্তু ইতালি ফেরত ছিলেন। ইতালি থেকে আসার ৫ দিন পর তার করোনা ধরা পড়ছে। কিন্তু এই ৫দিনে সে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা চুষে ফেলছে। নারায়ণগঞ্জের হোটেলে গেছে, রেস্তোরায় গেছে, দোকানে গেছে, বাজারে গেছে, আত্মীয়-স্বজনদের বাসা বাড়িতে গেছে। পরিবারের সঙ্গে মিশছে। তাহলে সে এই সব জায়গায় ছড়িয়েছে। যেহেতু এটা ছোঁয়াছে একটি ভাইরাস। এছাড়া অন্যান্য যে সকল ইতালি ফেরত ছিল তাদের অনেকেই হয়তো করোনা বহন করে নিয়ে এসেছে। তাদের পুরো পুরি চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে প্রথম বন্দরে পুতুল (৫০) নামে যে মহিলা মারা গেছে। ওনার স্বজনরা অনেকগুলো মিথ্যে কথা বলেছে আমাদের কাছে। কুর্মিটোলা থেকে ওই নারী মরহেদ প্যাকেট করে দিয়ে প্যাকেট খুলতে নিষেধ করেছিল তাদের। এবং প্যাকেটসহ লাশ দাফন করতে বলেছিল। কিন্তু তারা প্যাকেট খুলে লাশের গোসল দিয়েছে। এই কথাটা আমাদের কাছে তারা গোপন করেছে। আবার জানাজা দিয়েছে। আত্মীয়-স্বজনরা বাড়িতে আসছে। এছাড়া তিনি অসুস্থ অবস্থায় শহরের বাপের বাড়ি গিয়েছে, হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। এতে করে অনেক মানুষ সংক্রামিত হয়েছে ওই নারীর কারণে। এখন মানুষ যদি করোনা নিয়ে মিথ্যে কথা বলে তাহলে আমাদের কি করার আছে।
অপরদিকে ৪ এপ্রিল রাতে হাজার হাজার গার্মেন্টস শ্রমিকরা নারায়ণগঞ্জে ঢুকেছে। এতে একজন থেকে একশত জনের মধ্যে ছড়িয়ে গেছে করোনা। সবশেষে বলবো সিম্পটম ডেভলোপমেন্ট (উন্নতি) করার আগেই তারা হাজার হাজার মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে। এগুলো আমার কাছে সম্ভাব্য কারণ বলে মনে হয়। পরবর্তীতে বিশেষজ্ঞরা বলতে পারবে প্রকৃত কারণটা।

সংগৃহীত- মানবজমিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *