ঘূর্নিঝড় আম্পানের প্রভাবে বিপর্যস্ত দক্ষিনের জনপদ, নিহত-১

Spread the love

নাগরিক রিপোর্ট: সুপার সাইক্লোন আম্পানের প্রভাবে বুধবার সারাদিন থেমে থেমে বৃস্টি ও দমকা হাওয়া বয়ে গেছে গোটা দক্ষিনাঞ্চলে। মেঘনায় দুই ট্রলারের সংঘর্ষে রাসেল হাওলাদার নামে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। কলাপাড়ায় ঘূর্নিঝড়ের প্রচারনা চালাতে গিয়ে নৌকা ডুবে শাহআলম মীর নামে এক স্বেচ্ছাসেবক নিখোজ রয়েছে। উপকূলীয় এলাকা বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলায় নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ ব্যাবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। এ অবস্থায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দক্ষিনের জনপদ। বিভাগের ৬ জেলার প্রায় সাড়ে ১০ লাখ মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে আনা হয়েছে বলে বরিশাল বিভাগীয় প্রশাসন সুত্রে জানা গেছে।
জানা গেছে, উপকূলীয় এলাকা বরগুনার তিনটি নদী বিষখালী, বুড়িশ্বর ও বলেশ্বর নদীর পানি বিপদসীমার ৩৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বুধবার এ তথ্য জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের পানি পরিমাপক মো: মাহতাব হোসেন। তিনি জানান, স্বাভাবিক সময় জোয়ারের উচ্চতা থাকে ২.৮৫ সেন্টিমিটার। বুধবার দুপুরে বরগুনায় জোয়ারের পানির উচ্চতা ছিল ৩.১৮ সেন্টিমিটার। যা বিপদসীমার ৩৩ সেন্টিমিটার উপরে। জেলার আমতলী ও তালতলীর ১২৮টি সাইক্লোণ সেল্টারে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। বিদ্যুৎ সরকরাহ বন্ধ থাকা দুর্ভোগে পরেছে আশ্রয় নেয়া মানুষ। তালতলীর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন, সাইক্লোণ সেল্টারগুলোতে আলোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আমতলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মনিরা পারভীন বলেন, সাইক্লোণ সেল্টারে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানগণ জেনারেটরের ব্যবস্থা করবেন। বরগুনার জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, আম্পান মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।

উপকূলীয় এলাকা পটুয়াখালীর কলাপাড়া ও কুয়াকাটায় সকাল থেকে বৃস্টি ও দমকা হাওয়া বইছে। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে ঢেউ ক্রমশ পাড়ছে। সাগর উত্তল বলে স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে। কলাপাড়ায় প্রচারনা চালাতে গিয়ে নদীতে নৌকা ডুবে শাহআলম মীর (৫৫) নামের এক স্বেচ্ছাসেবক নিখোজ হয়েছে। বুধববার সকাল ১০টার দিকে উপজেলার ধানখালী ইউনিয়নের হাফেজ প্যাদার খালে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিখোজ শাহআলম মীর লোন্দা গ্রামের মৃত সৈয়দ কদম আলীর পুত্র। কলাপাড়া ঘূর্নিঝড় প্রস্তুত কর্মসূচির সহকারী পরিচালক আসাদুজ্জামান জানান, ফারাস সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার কাজ চালাচ্ছে।
দ্বীপ জেলা ভোলার বিভিন্ন নদীতে পানি বেড়েছে। সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের নি¤œাঞ্চল তলিয়ে গেছে বলে জানান সেখানকার কলেজ ছাত্র এম ইফতিয়াজ। ভোলার লালমোহন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুদিপ্তর মিশ্র জানান, ঝড় শুরুর আগেই মেঘনার পাড় প্লাবিত হয়েছে। প্রমত্ত মেঘনার এমন রূপ দেখে আতংকিত স্থানীয় বাসিন্দারা। লালমোহন উপজেলার মেঘনা তীরের অধিকাংশ জেলে নৌকা তীরে চলে এসেছে।
এদিকে বিভাগীয় শহর বরিশালে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে সকাল থেকেই থেমে থেমে বৃস্টি হয়েছে। সেই সাথে বাড়ছে ঝড়ো হাওয়া। বরিশাল আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষক আব্দুল কুদ্দুস বুধবার বিকেলে জানান, বরিশালে বিকেলে পর্যন্ত বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘন্টায় ৪০-৪৫ কিলোমিটার। বিকেল নাগাদ বৃস্টিপাত হয়েছে ৫২.৮ মিলি মিটার। তিনি বলেন, সন্ধ্যা নাগাদ বাতাসের গতিবেগ বাড়বে। বরিশাল নৌ বন্দর কর্মকর্তা আজমল হুদা মিঠু সরকার জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পান বুধবার সন্ধ্যা নাগাদ প্রায় ১৫০-১৬০ কিমি বেগে সুন্দরবনর নিকট দিয়ে উপকূল অতিক্রম করতে পারে। উপকূলে ১০-১৫ ফুট জলোচ্ছাস হতে পারে। ফলে প্লাবিত হবে উপকূলীয় নিম্মাঞ্চল। একারনে বরিশাল নদী বন্দরের সকলকে সতর্ক করা হয়েছে।
বুধবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা গেছে, আম্পানের প্রভাবে ফুসে উঠেছে কীর্তণখোলা নদী। এরই মধ্যে নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়ায় নগরীর নি¤œাঞ্চলে পানি ঢুকে পড়েছে। নগরীর পলাশপুর, রসুলপুর, জিয়ানগরের নদী তীরবর্তী এলাকায় পানি বেড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বুধবার দুপুরের দিকে কীর্তনখোলা নদীর পানি বিপদসীমার ২ সে: মি: উপর দিয়ে বইছে।
হিজলায় মঙ্গলবার গভীর রাতে মেঘনায় দুই ট্রলারের সংঘর্ষে নিখোজের ১২ ঘন্টা পর ট্রলার মাঝি রাসেল হাওলাদারের মৃতদেহ উদ্ধার করেছে স্থানীয়রা। উপজেলার হরিনাথপুর ইউনিয়নের নাচোকাঠি সংলগ্ন মেঘনায়। এদিকে বরিশালেরও বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, দমকা বাতাসে অনেক স্থানে গাছপালা পড়ায় সাবধানতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
বরিশাল বিভাগীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে বিভাগে ১০ লাখ ৬৫ হাজার মানুষ আশ্রায়ন কেন্দ্রে পৌছেছে। এর মধ্যে বরিশাল জেলায় রয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার জন। অভিযোগ উঠেছে, ঘূর্নিঝড় আম্পান আঘাত হানতে পারে বিলম্ব এমন গুঞ্জনে আশ্রয়কেন্দ্রে আসা অনেকেই বুধবার সকালে নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন। এ প্রসঙ্গে ঘুর্নিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচীর (সিপিপি) উপপরিচালক মো: আব্দুর রশিদ বলেন, পরিস্থিতি খারাপ হলে দ্রæত তারা আশ্রয়কেন্দ্রে ফিরবে।
বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার মুহাম্মদ ইয়ামিন চৌধুরী এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, বাড়িতে চলে যাওয়া মানুষদের আশ্রয়কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের খবর ভোর থেকেই উপকূলীয় এলাকাগুলোতে প্রচার করছে সিপিপি ও রেডক্রিসেন্টের কর্মীরা। সব জেলাতেই অবস্থান বুঝে বাড়ানো হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা। গঠন করা হয়েছে মেডিকেল টিম এবং উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম।
বরিশাল শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের আশ্রয়ের জন্য আশ্রয়ণ কেন্দ্র হিসেবে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে খোলা রাখার আহবান জানানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠান প্রধানকে সার্বক্ষনিক চাবিসহ কর্মস্থলে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। খোলা হয়েছে কন্টোল রুমও।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *