বরিশালে রিয়াজ হত্যা : পুলিশী নির্যাতনে খুনের দায় নিল স্ত্রী

Spread the love

মো: সুমন চৌধুরী, অতিথি প্রতিবেদক : বরিশালে আলোচিত একটি হত্যা মামলায় পুলিশের দুই তদন্ত কর্মকর্তার তদন্তে পৃথক স্বীকারোক্তী আদায় নিয়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। মামলার আসামী ও নিহতের স্ত্রী আমিনা আক্তার লিজা (৩০) অভিযোগ করেছেন তাকে নির্যাতন করে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বামী হত্যার স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে। অপরদিকে ঘটনার দেড় বছর গ্রেফতার হওয়া তিন চোর স্বীকার করেছে, তারা চুরি করতে গিয়ে খুন করেছেন গৃহকর্তা দলিল লেখক রেজাউল করীম রিয়াজকে (৪৫)।
পুলিশের এমন পরস্পর বিরোধী তদন্তের বিষয়ে বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারন সম্পাদক অ্যাডভোকেট কাইউম খান কায়সার বলেন, মামলাটির তদন্তে পুলিশ চরম গাফেলতি করেছে। ফলে স্ত্রী ঘাতক না হয়েও স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে রিশাল মেট্রেপলিটন পুলিশ (বিএমপি) ইমেজ সংকটে পড়তে পারেন বলে মত দেন এ আইনজীবী।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, দুটি স্বীকারোক্তির কোনটি সঠিক এবং অপরটির ক্ষেত্রে আসামীকে নির্যাতন করে বাধ্য করা হয়েছিল কি-না এ প্রশ্নটি সামনে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন বিএমপি’র দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। যে কারনে লিজার জবানবন্দিরর পর ঘটা করে সাংবাদিক সম্মেলন করা হলেও দ্বিতীয়বার তিন চোরের দেয়া স্বীকারোক্তি নিয়ে তারা নিশ্চুপ।
লিজা বলেছেন, তাকে গ্রেফতারের পর সারারাত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেছেন কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক বশির আহমেদ। তার মা ও দুই ভাইবোনকে থানায় আটকে রেখে তাদেরকেও মামলায় ফাঁসানোর ভয়ভীতি দেখানো হয়। এমন পরিস্থিতিতে তিনি পুলিশের শিখিয়ে দেয়া স্বীকারোক্তী দিয়েছেন। স্বীকারেক্তি গ্রহনে আদালতেও আইনী প্রক্রিয়া মানা হয়নি বলে লিজার অভিযোগ। লিজা বলেন, তিনি কারাগারে থাকাকালীন জবানবন্দী প্রত্যাহারে আবেদন করলেও আদালত গ্রহন করেনি। এরপরে লকডাউনে আদালত বন্ধ ছিল। এখন আবার আবেদন করবেন।
দলিল লেখক রেজাউল করিম রিয়াজকে গতবছর ১৮ এপ্রিল দিবাগত রাতে বরিশাল সদর উপজেলার চরমোনাই ইউনিয়নের বুখাইনগর গ্রামের বসতঘরে কুপিয়ে হত্যা করে অজ্ঞাত দৃবৃর্ত্তরা। তখন নি:সন্তান লিজা ছিল ঘরের অন্য কক্ষে। লিজা জানান, স্বামী নিহতের সময় তিনি ১৫ দিনের গর্ভবতী ছিলেন। কারাগারে মেয়ে সন্তান প্রসব করেছেন। লিজার গর্ভে সন্তান আছে তা জানত না দেবর রিপন। লিজার অভিযোগ সে কারনেই রিপন ভাইয়ের সম্পতি গ্রাসের পরিকল্পনায় এ মামলায় তাকে ফাঁসিয়েছেন। দলিল লেখক ছাড়াও জমি কেন-বেচা এবং সুদের ব্যবসা করায় রিয়াজ আর্থিকভাবে যথেষ্ট সচ্ছল ছিলেন।
রিয়াজ নিহত হওয়ার পর ভাই মনিরুল ইসলাম রিপন অজ্ঞাতনামাদের আসামী করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা বরিশাল কোতোয়ালী মডেল থানার উপ পরিদর্শক মো. বশির আহমেদ সন্দেজনক আসামী হিসাবে স্ত্রী লিজাকে গ্রেফতার করেন। গতবছর ২০ এপ্রিল মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতের বিচারক আনিসুজ্জামান লিজার ১৬৪ ধারার জবানবন্দী গ্রহন করেন। জবানবন্দীতে লিজা বলেছেন, রিয়াজের সহকর্মী মাসুমের (পলাতক) সঙ্গে তার পরকিয়া প্রেম ছিল। ঘটনার দিন রাতে মাসুম এক সহযোগী নিয়ে লিজার সহযোগীতায় রিয়াজের ঘরে ঢুকে পালিয়ে থাকে। তাদের আনা ঘুমের ওষুধ লিজা দুধের সঙ্গে মিশিয়ে স্বামীকে খেতে দেয়। এতে রিয়াজ ঘুমিয়ে পড়লে রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনা ভিন্নখাতে নিতে ঘরের সিদ কেটে রাখা হয়।
এরপরে একই থানার উপ পরিদর্শক ফিরোজ আল মামুন মামলাটির তদন্তের দয়িত্ব পেলেও নতুন কোন অগ্রগতি হয়নি। মামলার তৃতীয় তদন্ত কর্মকর্তা নগরীর কাউনিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ছগীর হোসেন গত ১৪ আগষ্ট বাকেরগঞ্জ উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রাম থেকে একটি চুরি মামলায় জলিল সিকদার (২৮) নামক এক যুবককে গ্রেফতার করেন। তার স্বীকারোক্তিনুযায়ী ২৭ আগষ্ট ঢাকা থেকে রায়হান চৌকিদার (২০) এবং ২৮ আগষ্ট বরিশাল থেকে শাকিল হাওলাদার (২০) নামক আরও দুই যুবককে গ্রেফতার করেন তিনি। রায়হান ও শাকিল নিহত রিয়াজের প্রতিবেশী।
পরিদর্শক ছগীর জানান, ওই তিন চোর রিয়াজকে হত্যার কথা স্বীকার করে গত ২৮ আগষ্ট বরিশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট মো. শামীম আহমেদের আদালতে রেজাউল করীম রিয়াজকে হত্যার কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায জবানবন্দী দিয়েছেন। জবানবন্দীর বরাত দিয়ে পরিদর্শক ছগীর জানান, তিন চোর নেশার টাকা সংগ্রহের জন্য প্রায়ই চুরি ছিনতাই করে। প্রতিবেশী স্বচ্ছল রিয়াজের ঘরে চুরির জন্য একাধিকবার হানা দিলেও রিয়াজ জেগে থাকায় সম্ভব হয়নি। ঘটনার দিন রিয়াজ ঘুমিয়ে পড়লে পূর্ব পরিকল্পনানুযায়ী তারা দা দিয়ে সিদ কেটে ঘরে ঢুকলে রিয়াজ জেগে ওঠে। তাদের চিনে ফেলায় কিছু বোঝার আগেই হাতে থাকা দা দিয়ে জলিল রিয়াজের গলায় একাধিক কোপ এবং শাকিল পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দেয়। তিন যুবকের দাবী, রিয়াজ বিছানায় একা ছিল, স্ত্রী লিজা ছিল অন্য ঘরে। তিনি ওই কক্ষে আসার আগেই তিনজন পালিয়ে যায়।
পরিদর্শক ছগীর বলেন, মামলাটি স্পর্শকাতর হওয়ায় উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তে অধিকতর তদন্তের জন্য এ বছরের ২৩ ফেব্রয়ারী তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়। তখন তিনি বরিশাল নগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশে কর্মরত ছিলেন। তিনি বলেন, বিগত তদন্তে অনেক অসঙ্গতি দেখে ওই দূর্বল জায়গায়গুলোতে খোঁঝ খবর নেয়া শুরু করেন। খুনীরা রিয়াজের ৪টি মোবাইল সেট নিয়ে গিয়েছিল। গ্রেফতার হওয়া ওই তিন যুবকদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ২টি সেট। মুলত ওই মোবাইল সেট ট্রাকিংয়ের মাধ্যমে তিন যুবককে চিহিৃত করে তাদের পিছু লেগেছিলেন পরিদর্শক ছগির। তিনি বলেন, মামলার গুরুত্ব অনুযায়ী তিনি কাউনিয়া থানার কর্মকর্তা হয়েও কোতোয়ালী থানার মামলার তদন্ত করছেন। যা পুলিশ বিভাগে সহসা ঘটেনা।
মামলার এমন পরিস্থিতিতে লিজার স্বীকারোত্তির ভিত্তি কি জানতে চাইলে প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা উপ পরিদর্শক বশির আহমেদ বলেন, স্বীকারোক্তী আদালত গ্রহন করেছে। তারাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন। লিজাকে নির্যাতন ও অর্থ নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
নিহত রিয়াজের ভাই মামলার বাদী রিপন পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, বিয়ের ১৪ বছরে সন্তান হয়নি লিজার। কারাগারে সন্তান প্রসব রহস্যজনক। ওই সন্তান তার ভাই রিয়াজের নয় বলে স্পষ্ট বলেন তিনি। তিনি তিন যুবকের স্বীকারোক্তি মিথ্যা দাবী করেন বলেন, লিজাই আসল খুনী।
বিএমপি কমিশনার মো. শাহাবুদ্দিন খান রিয়াজ হত্যা মামলার তদন্তের বিষয়ে বলেন, যেহেতু মামলাটির তদন্তে দুই ধরনের স্বীকারোক্তি উঠে এসেছে তাই সত্য উদঘাটনের জন্য একজন দক্ষ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তদন্তে পাওয়া এ পর্যন্ত সকল তথ্য উপাত্ত যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যেহেতু মামলাটি এখনও তদন্তাধীন তাই দু ধরনের তথ্য পাওয়া নিয়ে কোন মন্তব্য করা যাচ্ছেনা। তবে তদন্ত শেষ হলে কোন কর্মকর্তা তদন্তে গাফেলতি বা অনিয়ম করেছেন কি-না তা খতিয়ে দেখা হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *