নাগরিক রিপোর্ট: বরিশাল নগরীর নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশে পৌছলে দুই কিলোমিটারের ব্যবধানে রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতু (দোয়ারিকা) ও মেজর এম.এ জলিল সেতু (শিকারপুর)। দুই দশক আগে নির্মিত এ সেতুর জন্য রহমতপুর বিমানবন্দর মোড় থেকে উজিরপুরের জয়শ্রী বাজার পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক স্থাপিত হয়। ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কের এই অংশে এক ডজন মোড় থাকায় যেন ডেঞ্জারা জোনে পরিনত হয়েছে এই ৬ কিলোমিটার। স্মরনকালের মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ দূর্ঘটনা এবং সর্বাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে এখানে। সর্বশেষ বুধবার বিকালে কার্ভাড ভ্যানের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে মরদেহবাহি অ্যাম্বুলেন্সের ৬ যাত্রীর। এমন দূর্ঘটনায় ২/৪ জন হতাহত হওয়া এখানে নিত্যদিনের ঘটনায় পরিনত হয়েছে।
মহাসড়কের শুধুমাত্র এ ৬ কিলোমিটারের মধ্যে কেন এত দূর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা ঘটছে এর সঠিক কারন সুনির্দিষ্টভাবে কেউ চিহিৃত করতে পারেননি। তবে বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) এবং হাইওয়ে পুলিশ। স্থানীয়রা বাসিন্দারাও এর স্থায়ী একটি সমাধান চেয়ে নানা দাবী তুলে ধরেছেন।
জানতে চাইলে হাইওয়ে পুলিশের গৌরনদী থানার অফিসার ইনচার্জের দায়িত্বে থাকা উপ পরিদর্শক নিত্যরঞ্জন বলেন, মহাসড়কের বরিশাল থেকে ফরিদপুর পর্যন্ত অংশের মধ্যে সবচেয়ে ভাল অংশ হচ্ছে দোয়ারিকা ও শিকারপুর সেতুর ৬ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক। এখানে খানাখন্দ কম কিন্তু মোড় রয়েছে বেশ। এ কারনে চালকরা ঝুকিপূর্ন ওই এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত গতিতে চালাতে গিয়ে দূর্ঘটনায় পতিত হচ্ছে। তিনি বলেন, মহাসড়কের ওই অংশে সর্বোচ্চ গতিসীমা ৬০ কিলোমিটার। কিন্ত কেউ তা না মেনে প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হচ্ছেন। করোনা সংকটের কারনে অনিয়ন্ত্রিত গতির যানবহনের বিরুদ্ধে কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। যে কারনে চালকরা আরও বেপরোয়া হয়েছেন বলে জানান নিত্যরঞ্জন।
বুধবার বিকালে আটিপাড়া এলাকায় কাভার্ডভ্যান ও অ্যাম্বুলেন্সের মুখোমুখি সংঘর্ষ প্রত্যক্ষ করেছেন সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দা বিএম কলেজ ছাত্র মো: জুনায়েদ। তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে একটি কিছুটা মোড় রয়েছে। দুটি যানবহনই গতি ছিল বেপরোয়া। একটি বাস ওভারটেক করতে গেলে বিপরীত দিক থেকে আসা কাভার্ডভ্যানের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ অ্যাম্বুলেন্সটি দুমড়েমুচড়ে যায়। এতে চালকসহ ৬জন ঘটনাস্থলেই নিহত হন।
কলেজ ছাত্র জুনায়েদের দেয়া তথ্যমতে, জয়শ্রী বাজারের মোড়, সাজু ফিলিং স্টেশন মোড়, আটিপাড়া রাস্তার মাথার মোড়, মুন্ডপাশা মোড়, নতুন শিকারপুরের মোড়, সোনার বাংলা স্কুল মোড়, মেজর এম.এ জলিল সেতুর ঢাল মোড়, রাকুদিয়া নতুন হাট মোড়, ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন সেতু সংলগ্ন মোড়গুলো সবচেয়ে বেশী ঝুকিপূর্ন। দূর্ঘটনাগুলোও হয় এ স্পটগুলোতে সবচেয়ে বেশী। তাই এলাকাবাসী ডেঞ্জার জোন হিসেবে চিহিৃত এই এলাকায় পথ চলতে আতংকিত থাকেন।
স্থানীয় তথ্যমতে, ২০১৪ সালে জনবহুল এলাকা ইচলাদি বাসষ্টান্ডে একটি যাত্রীবাহি বাস ব্রেক ফেল করলে ১১জন পথচারীর প্রাণ কেড়ে নিয়ে খাদে পড়েছিল। একইভাবে চলতি বছরের ফেব্রæয়ারীতে বাসের চাপায় মহাসড়কের সোনার বাংলা মোড়ে আবুল হোসেন নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। গত দুই মাস পূর্বে মোটরসাইকেল আরোহী ২ যুবক মহাসড়কের সাজু ফিলিং স্টেশনের সামনে এলে ট্রাকের ধাক্কায় প্রান হারায়। গত মাসে বাস থেকে নেমে প্রকৃতির ডাকে সারা দিতে গিয়ে মহাসড়ক ক্রোস করাকালে ঘটনাস্থলেই মৃতবরন করেন।
জয়শ্রী বাজার কমিটির সভাপতি জুবায়ের মিয়া বলেন, প্রায় প্রতিদিনই দূর্ঘটনায় হতাহতদের উদ্ধার কাজে অংশ নিতে হচ্ছে তাকে। তিনি নিজেও একবার মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় আটিপাড়ায় বাসের ধাক্কায় আহত হন। ব্যবসায়ী জুবায়ের মতে, সংযোগ সড়কটি সোজা নির্মিত হয়নি। যানবাহন চালকরা প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, দুই পাশে ঘন বনায়ন হওয়ায় মোড়গুলো ঝুকিপূর্ন। খানাখন্দক না থাকায় ডেঞ্জার জোনে পরিনত এ সড়কে পরিবহনের গতি থাকে বেশী। তারমতে দূর্ঘটনা নিয়ন্ত্রনে আনতে গাছগুলো কেটে অথবা ছেটে দিয়ে এবং দিক নির্দেশক স্থাপন এখন জরুরী। এই মহাসড়কে বহু লাশ পড়তে দেখেছেন। যেকারনে এলাকাবাসী আতংকিত। তারা এর স্থায়ী সমাধান চান বলে জানান ব্যবসায়ী জুবায়ের।
এব্যাপারে সড়ক ও জনপথ বিভাগের বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ খান বলেন, ৬ কিলোমিটার সংযোগ সড়কে একের পর এক দূর্ঘটনা তাদেরকেও ভাবিয়ে তুলেছে। এটি চার লেন করার জন্য জমি অধিগ্রহন চলছে। তা সময় সাপেক্ষ হওয়ায় দূর্ঘটনা রোধে আপাতত স্থানীয়দের মতামত নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন কর হবে। গাছ ছেটে দেয়া, দিক নির্দেশক দেয়ার দরকার হলে দ্রত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, দুর্ঘটনায় এভাবে প্রান ঝরা থামাতে যাত্রী, চালকসহ সকলের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধিও করতে হবে।
