নাগরিক রিপোর্ট: ঢাকা-বরিশাল নৌপথে একের পর এক ঘটছে খুন-খারাবি। লঞ্চের কেবিনে পাওয়া যাচ্ছে লাশ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিচয় পেতে বেগ পেতে হয় আইনশৃংখলা বাহিনীকে। সোমবার অজ্ঞাত এক নারীর লাশ পাওয়ার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে লঞ্চের মালিকরা কেবল ব্যবসায়ীক চিন্তা করছে। অপরদিকে বিআইডবিøউটিএ নামক যে সংস্থাটি নৌযান নিয়ন্ত্রনের দায়িত্বে তাদের ভুমিকা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। লঞ্চে এভাবে হত্যাকান্ডের ঘটনায় সাধারন যাত্রীদের মধ্যে আতংকের পাশাপাশি এ নৌযান সার্ভিসের ইমেজ সংকটও দেখা দিয়েছে। যদিও বিআইডবিøউটিএ’র নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, লঞ্চে খুন-খারাবি নিয়ন্ত্রনের দায়িত্ব তাদের নয়, আইনশৃংখললাবাহিনীর।
ঢাকা থেকে বরিশালে আসা যাত্রীবাহি লঞ্চ পারাবত-১১ এর কেবিন থেকে সোমবার অজ্ঞাত এক নারী যাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ধারনা করা হচ্ছে ওই নারীর সাথে কেউ ছিল, যিনি পালিয়ে গেছেন। কেবিনটির বুকিং দেয়া নাম্বারটি ধারনা করা হচ্ছে ভূয়া। ঢাকা-বরিশাল রুটে এমন একাধিক হত্যাকান্ডের ঘটনায় উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে।
গত বছরের (২০১৯) ২০ জুলাই বরিশালে এমভি সুরভী-৮ নামে একটি লঞ্চের স্টাফ কেবিন থেকে আখি নামে এক নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়। তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছিল। গত ২০১৮ সালের ৪ এপ্রিল বরিশালগামী পারাবত-৯ লঞ্চে সিফাত নামে এক তরুনকে দুর্বিত্তরা গলা টিপে হত্যার পর পেট কেটে নদীতে ফেলে দেয়। ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট ঢাকা থেকে বরিশালগামী পারাবাত ১০ লঞ্চ থেকে মিনারা বেগম নামে এক কেবিন যাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়।
জানতে চাইলে জনস্বার্থ রক্ষা কমিটির বরিশালের আহবায়ক মো: মুনাওয়ারুল ইসলাম ওলি বলেন, তিনি প্রায়সই লঞ্চে চলাচল করেন। কিন্তু একের পর এক লঞ্চে লাশ পাওয়ায় সাধারন যাত্রীদের মত তিনিও উদ্বিগ্ন। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে লঞ্চে কেন আনসার রাখা হয়। অবশ্যই প্রতিটি হত্যাকান্ডের দায় লঞ্চ মালিকদের নিতে হবে। তিনি বলেন, পুলিশের দোহাই দিয়ে বিআইডবিøটিএ নিজেদের দায়িত্ব এড়াতে চাইলে তাদের ভুমিকা নিয়ে সাধারন জনগন প্রশ্ন তুলবেন। জনস্বার্থ রক্ষা কমিটি এ বিষয়ে জনগনকে সচতেন করবেন বলে তিনি জানান।
সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন বরিশাল জেলা সাধারন সম্পাদক কাজী এনায়েত হোসেন শিবলু বলেন, লঞ্চের স্টাফ কেবিনে এমনটা প্রায়সই ঘটছে। এসব ঘটনার কারনে যাত্রীদের ভোটার আইডি, পরিচয়পত্র সনাক্ত করা দরকার। বার বার লঞ্চে খুনখারাবি ঘটলে সাধারন যাত্রীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন।
এ প্রসঙ্গে অভ্যন্তরীন লঞ্চ মালিক সমিতির সহ সভাপতি ও এমভি সুন্দরবন লঞ্চের স্বত্তাধীকারী সাঈদুর রহমান রিন্টু বলেন, পারাবাতসহ বিভিন্ন লঞ্চের কেবিনে এভাবে কয়েকবারই যাত্রীর লাশ পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, এভাবে কেবিনের মধ্যে হত্যাকান্ড ঘটলে অপরাধীকে চিহিৃত করা কঠিন। তার লঞ্চে আরও বেশি সিসি ক্যামেরা স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন। সংগঠনের পক্ষ থেকে সকল লঞ্চ কর্তৃপক্ষকেও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের তাগিদ দেয়া হয়েছে। লঞ্চ মালিক নেতা রিন্টু বলেন, দায়দায়িত্ব কিভাবে নেয়া সম্ভব। সোমবার পারাবাত-১১ লঞ্চে যে নারীর লাশ পাওয়া গেছে ওই কেবিনের যাত্রী মোবাইল নাম্বার ভুয়া দিয়েছে। নাম্বারটি অবশ্যই পরীক্ষা করা উচিৎ ছিল। তিনি বলেন, লঞ্চের স্টাফরা স্টাফ কেবিন ভাড়া দেয়। যেকারনে একাধিক হত্যাকান্ড ঘটেছে। লঞ্চ সার্ভিসের ইমেজ ধরে রাখতে যাত্রীদের পরিচয়পত্র নিশ্চিত করতে হবে বলে তিনি জানান।
তবে বিআইডবিøউটিএ’র নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের বরিশালের উপ পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আজমল হুদা মিঠু সরকার বলেন, খুন খারাবি, মার্ডার নিয়ন্ত্রনের দায়িত্ব আইনশৃংখললাবাহিনীর। এটি তাদের বিষয় নয়। তবে লঞ্চ মালিকদের আরও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সুনির্দিস্টভাবে পরিচয় জেনে যাত্রী তুলতে হবে। ২/১টি লঞ্চে সিসি ক্যামারে হয়তো নেই, সবগুলোতে এটি নিশ্চিতে জোর দেয়া হয়েছে।
এব্যপারে বরিশাল সদর নৌ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবদুল্লাহ মামুন জানান, লঞ্চে এভাবে হত্যাকান্ডের দায় কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না। সোমবারের ঘটনায় যে পুরুষ যাত্রী অজ্ঞাত নারীর সাথে উঠেছে সে ভুয়া মোবাইল নাম্বার দিয়েছে। এটি যাচাই করা হয়নি, ওই লঞ্চের সংশ্লিস্টদের দায়িত্ব অবহেলায়ই এমনটা ঘটেছে। তিনি বলেন, তারা বিভিন্ন সময় যাত্রী ওঠানোর আগে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার তাগিদ দেন লঞ্চের স্টাফদের। কিন্তু তা না মানায় এমনটা ঘটছে।
