পেনশনের টাকায় শিক্ষক দম্পতির অনন্য উদ্যেগ

Spread the love

নাগরিক প্রতিবেদন : বইয়ের সঙ্গেই কেটেছে জীবনের বেশীরভাগ সময় অধ্যাপক নজরুল হক নীলুর। নিজে পড়েছেন, অন্যকে পড়িয়েছেন। মৃত্যুর পরও বইয়ের মাঝেই বেঁচে থাকার স্বপ্ন তার। নি:সন্তান জীবনে বইকে ভালবেসেছেন সন্তানের মতো। তাই শিক্ষাকতা পেশার পেনশনের টাকায় স্ত্রীকে নিয়ে নিজ বাড়িতে গড়েছেন বইয়ের লাইব্রেরী। পড়ার জন্য গত ৫০ বছরে তিনি ্যাগাজিন, সংকলনসহ বিভিন্ন ধরনের ৩ সহ¯্রাধিক বই কিনেছিলেন। সেই বই দিয়েই লাইব্রেরীটির যাত্রা শুরু হয়েছে।
বরিশাল নগরীর কাউনিয়া এলাকায় মনসাবাড়ি সড়কে পৈত্রিক বাড়িতে নবনির্মিত তিনতলা ভবনের নিচলতলায় ২৪০০ বর্গফুটের ফ্লোরে লাইব্রেরীটি স্থাপন করা হয়েছে। করোনা সংকটের কারনে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করতে না পারায় পাঠকদের জন্য উম্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে সেটি। পরিস্থিতির উন্নতি হলে দেশবরন্যে লেখক-কবিদের নিয়ে লাইব্রেরীটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করার আশা রয়েছে তার।
অধ্যাপক নজরুল হক নীলু বরিশাল জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি। রাজনৈতিক মোড়কের পরিচয়ের বাইরে তিনি বরিশালে একজন নিরীহ শান্তশিষ্ঠ একজন মানুষ, তবে যেকোন গণতান্ত্রিক ও সামাজিক আন্দোলনের অগ্রভাগের অগ্রভাগে থাকেন তেজোদিপ্ত মন নিয়ে। ষাটের দশকে রাশেদ খান মেননের নেত্বাধাীন বিল্পবী ছাত্র ইউনিয়ন দিয়ে রাজনীতি শুরু করে এখনও মেননের সঙ্গেই আছেন।
অন্যদের মতো ভবিষ্যতের আর্থিক নিশ্চয়তায় নিজ বাড়িটি ফ্লাট ভাড়ার বানিজ্যিক ব্যবহার করেননি তিনি। লাইব্রেরী করার কারন জানতে চাইলে অধ্যাাপক নীলু বলেন, ‘মনের অন্ধকার দুর এবং সত্যকে জানার জন্য জ্ঞানের বিকল্প নেই। যান্ত্রিক ও প্রযুক্তির যুগে আমাদের তরুন সমাজের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ হ্রাস পেয়েছে। নতুন প্রজন্ম মোবাইলের মাধ্যমে প্রযুক্তি ব্যবহারে মাত্রাতিরিক্ত আশক্ত হয়ে পড়েছে। এসব যান্ত্রিক, এগুলো যত কম ব্যবহার হবে ততই মঙ্গল। তাই নতুন প্রজন্মকে বই পড়ার অভ্যাসে ফিরিয়ে আনা এখন অতি জরুরী। কারন বই একমাত্র প্রকৃতিক’।


সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ৭টি আলমিরায় থাকে থাকে বই সাজানো রয়েছে। ৪টি টেবিলে পাঠকদের বসার জন্য রাখা হয়েছে ৬০টি চেয়ার। শুধু বই নয়, অনেক পুরানো তৎকালীন সময়ের সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন, দৈনিক সংবাদপত্রের বিশেষ সংখ্যাও সংরক্ষিত রয়েছে এ লাইব্রেরীতে।
ইতিহাস, রাজনীতি, দর্শন, জীববিচিত্র নিয়ে লেখার বইয়ের আধিক্য বেশী এখানে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলাম, তারা শংকর, সমরেশ বসু, সমরেশ মজুমদার দেবব্রত পাল ও আবুল বাশার সহ দুই বাংলার জনপ্রিয় লেখকদের বই রাখা হয়েছে। রয়েছে ধর্ম নিয়ে গবেষনাধর্মী বই। এক সময়ে জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ‘দেশ’ ‘বিচিত্রা’ সহ বিভিন্ন ম্যাগাজিনের ৩০ বছর আগের সংখ্যাও আছে সেখানে।
অধ্যাপক নজরুল হক নীলু বলেন, গবেষনাধর্মী পাঠের প্রায় সব ধরনের বই আছে তার লাইব্রেরীতে। আরও সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। শিক্ষামুলক সভা-সেমিনার করার জন্য লাইব্রেরীটি বিনামূল্যে ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হবে।
এত সংখ্যক বই তার সংগ্রহে থাকার ব্যাখা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ৭ম শ্রেণীর ছাত্রবস্থা থেকে তার বই পড়ার নেশা। যেকোনভাবে হাতে কিছু টাকা এলেই সেটা দিয়ে বই কিনেছেন। সন্ধ্যায় বই পড়া শুরু করে ভোর হয়ে গেছে এমন ঘটনা ঘটেছে তার জীবনে অনেকবার।
তিনি বলেন, প্রতিটি বই পড়া শেষে তিনি যতœসহকারে সংরক্ষন করেছেন। দুই বছর আগেও থাকতেন পিতার রেখে যাওয়া আধাপাকা ঘরে। তখন বৃষ্টির পানি থেকে বইগুলো রক্ষা করতে তাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। একটা সময়ে তার মাথায় আসে তার মৃত্যুর পর বইগুলো কি হবে? এমন ভাবনা থেকেই তার মাথায় লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা আসে।
অধ্যাপক নীলু বলেন, তার স্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত প্রভাষিকা মাহমুদা বেগম মুনমুন পিতার বাড়িতে পাওয়া সম্পদ বিক্রি করে ৫০ লাখ টাকা এনেছেন। ওই টাকা দিয়েই পৈত্রিক জমিতে ৫ শতাংস জমির ওপর ৩ বছর আগে ভবন নির্মান কাজ শুরু করেন। নিচতলার পুরোটা রেখেছেন লাইব্রেীরর জন্য। দোতালায় নিজেরা থাকেন।


তার মৃত্যুর পর লাইব্রেরীটি কিভাবে পরিচালিত হবে তারও পরিকল্পনা করেছেন অধ্যাপক নীলু। তিনি বলেন, লাইব্রেরীর জন্য একটি ট্রাষ্টি গঠন করবেন। সেখানে তিনি নগদ ১০ লাখ টাকা দিবেন। এছাড়া তিনতলার মোট ৩টি ফ্লোরের ১টি ভাড়া পাবে লাইব্রেরীর ট্রাস্ট্রি।
বানারীপাড়া ডিগ্রী কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক পদ নজরুল হক নীলু ২০১৮ সালের জুনে অবসরগ্রহন করেন। তার স্ত্রী শহীদ জিয়াউর রহমান ডিগ্রী কলেজের প্রভাষিকা মাহমুদা বেগম মুনমুন অবসরে যান একবছর আগে। দুজনের পেনশনের টাকা লাইব্রেরীতে ব্যায়ের পরিকল্পনা কথা জানিয়েছেন এ দম্পত্তি।
স্বামীর এমন মহতি উদ্যেগ্যের প্রশংসা করে মাহমুদা বেগম মুনমুন বলেন, ‘২১ বছর আগে ১৯৯৯ সালে তার (নীলু) সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। তখন থেকেই দেখে আসছি বইয়ের প্রতি তার ভালবাসা ও টান। বিভিন্ন সময়ে একটি লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠার কথাও ব্যক্ত করেছিলেন তিনি। শেষ বয়সে এসে তার সে স্বপ্ন পুরন হওয়ায় হওয়ায় এবং স্ত্রী হিসাবে সহযোগী হিসাবে পাশে থাকতে পেরে নিজেকে গর্ব মনে করছি’
অধ্যাপক নীলু জানান, শীত মৌসুমের পর করোনা সংকটের উন্নতি হলে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, কবি বেল্লাল হোসেনসহ বরেন্য লেখক-কবিদের নিয়ে লাইব্রেরীটি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে।##

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *