খান রফিক:
একাকার হয়ে গেল পদ্মার এপাড়-ওপাড়। এর সাথে খুলে যাচ্ছে দক্ষিনাঞ্চলের অর্থনীতির দ্বার। শিল্পকারখানা, কৃষি শিল্প, পর্যটন শিল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ নানা সেক্টরে উদ্যোক্তাদের নিরব প্রতিযোগিতায় সৃস্টি হচ্ছে বিশাল কর্মসংস্থার ক্ষেত্র। উন্নয়নের অপার সম্ভাবনাময় এ বরিশালের দিকে তাই সবার চোখ। এসব কিছু সম্ভাব হয়েছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু আজ বাস্তবে রুপ নেয়ায়। সংশ্লিস্টরা এ অর্থনৈতিক চাকাকে সচল রাখতে এখন থেকেই পরিকল্পিত উন্নয়নের আহবান জানিয়েছেন।
ঢাকা-বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়কের দুই পাশে এখন কেবলই দেখা যায় অবকাঠামো উন্নয়ন। বিশেষ করে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়িয়ে দপদপিয়া এলাকায় এবং বিমানবন্দর, গড়িয়ার পাড়, শিকারপুর ছাড়িয়ে মহাসড়কের দুই পাশে বেসরকারী খাতে অবকাঠামো উন্নয়ন চলছে একের পর এক। আর কলাপাড়া ছাড়িয়ে কুয়াকাটা সংলগ্ন সড়কে সাইনবোর্ডের যেন শেষ নেই। খোজ নিয়ে জানা গেছে, এসবই হচ্ছে পদ্মা সেতুকে টার্গেট করে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সদস্য ও বিএম কলেজের অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক মো: আখতারুজ্জামান খান বলেন, পদ্মা সেতু দক্ষিনাঞ্চলের বিনিয়োগ ব্যবস্থার দ্বার খুলে দিয়েছে। সৃস্টি হচ্ছে কর্মসংস্থান। পদ্মা সেতুকে ঘিরে এ অঞ্চলের মৎস্য শিল্প, কৃষি শিল্প, পর্যটন শিল্প, অকাঠামো, বøু ইকোনোমিসহ না খাতে প্রসার ঘটবে। পায়রা বন্দরের আমদানী রপ্তানির প্রভাব বরিশালের মানুষর উপর। পায়রা তাপবিদ্যুৎ ও ভোলার গ্যাস এ উন্নয়নকে আর এক ধাপ এগিয়ে নিবে।
অর্থনীতিবিদ আক্তারুজ্জামান বলেন, দক্ষিনাঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য ইতোমধ্যে উদ্যোক্তাদের মাঝে নিরব প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। পদ্ম থেকে পায়রা দুই পাশে বিনিয়োগের গোল্ডেন লাইন সৃস্টি হচ্ছে।
তার মতে, বিশ্বব্যাংক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে- পদ্মা সেতুর কারনে দক্ষিনাঞ্চলে ১ ভাগ প্রবৃদ্ধি বেড়ে যাবে। এতে সারাদেশের প্রবৃদ্ধি বাড়বে ০.৬ ভাগ। তার ধারনা বরিশাল এক সময় বাংলাদেশের অর্থনীতির কেন্দ্র হবে। তবে এক্ষেত্রে এখনই বৃহৎ পরিকল্পনা ও পরিবেশ করা সৃস্টি দরকার।
উদাহরন হিসেবে তিনি বলেন, বরিশালে সাউথ এ্যাপোলো নামে একটি বেসরকারী হসপিটাল সম্প্রতি অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এখন দরকার ফাইভ স্টার হোটেল, আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম, কুয়াকাটার মাস্টার প্লান, আধুনিক বিমান বন্দর। এসব বাস্তবায়নে দক্ষিনাঞ্চল জুড়ে মাস্টার প্লান দরকার। পরিবেশ রক্ষায় গড়তে হবে গ্রীন ইকোনোমি। এজন্য চেস্বার অব কর্মাস কে নেতৃত্ব দিতে হবে, গড়তে হবে শক্তিশালী বেসরকারী খাত এমনটাই জানান তিনি।
বরিশাল চেম্বার অব কমার্স এর সভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, পদ্মা সেতু এখন দৃশ্যমান। পদ্মা সেতুকে ঘিরে এ অঞ্চলে নানা ধরনের ইন্ড্রাস্ট্রি, গার্মেন্টস করার জন্য উদ্যোক্তারা আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তাদের প্রাণের দাবী ভোলার গ্যাস বরিশালে আসা। প্রধানমন্ত্রীর বরিশাল সফরের এমন প্রতিশ্রæতিতে গ্যাস আনার জন্য সার্ভে চলছে। এতে দক্ষিনাঞ্চল কর্মসংসংস্থান সৃস্টি হবে। এরইমধ্যে অনেকে জমি কিনে শিল্পকারখানা করার জন্য প্রাথমিক কাজ শুরু করছে। এতে সুবিধা হল এই অঞ্চলের শ্রমিক এখানে কাজ করতে পারবে। ফলে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া যাবে। তিনি দক্ষিনাঞ্চলের উন্নয়নের স্বার্থে সবাইকে এক হওয়ার আহবান জানান।
চিকিৎসা খাতে বরিশালে বিনিয়োগকারী সাউথ অ্যাপোলো মেডিকেল কলেজ এ্যান্ড হসপিটাল এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইকবাল হোসেন তাপস বলেন, পদ্মা সেতুতে সময় এবং অর্থ উভয়ই সাশ্রয় হবে। এতে অবহেলিত দক্ষিনের মানুষের উন্নত চিকিৎসার জন্য দুর্ভোগ কমে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এ অঞ্চলের প্রথম বেসরকারী হাসপাতাল হিসেবে সাউথ অ্যাপোলো মেডিকেল কলেজ এ্যান্ড হসপিটাল কে সরকার চলতি মাসেই অনুমোদন দিয়েছে।
ফলে বরিশাল বিভাগের রোগীরাসহ পদ্মার ওপারের মানুষও চাইলে ঢাকা না গিয়ে হয়তো বরিশালে আসবেন চিকিৎসা নিতে। বিভিন্ন এলাকার শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ায় সুযোগ পাবেন। পদ্মা চিকিৎসা ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তার মতে, তারা চিকিৎসাকে ব্যবসার পাশাপাশি সমাজ সেবাও মনে করি। তাই এ অঞ্চলের মানুষের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে অগ্রাধিকার হিসেবে হার্ট, কিডনি ডায়ালায়সিস কে গুরুত্ব দিতে চান।
এব্যাপারে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) উপাচার্য প্রফেসর ড. মো: ছাদেকুল রহমান বলেন, পদ্মা সেতুর দুই পাড়ের সংযোগে দক্ষিনের ২১ জেলার আর্থ সামাজিক এবং শিক্ষাখাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। এতে দেশের অন্যসব অঞ্চলের সাথে প্রতিযোগিতায় সমভাবে এগিয়ে যাবে বরিশালের শিক্ষাখাত। ববি চিন্তা করছে শিঘ্রই ‘পদ্মা সেতুর আর্থ সামাজিক প্রভাব’ শীর্ষক বড় ধরনের একটি সেমিনার করে বরিশালবাসীর মতামত সরকারের কাছে তুলে ধরা হবে। তিনি আশা করেন, সমভাবে উন্নয়ন হলে পিছিয়ে পড়া বরিশাল এগিয়ে যাবে।
