সৈয়দ জুয়েল:
অবশেষে কারাগারেই যেতে হলো সিনিয়র সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে। স্বাস্থ্য বিভাগের অনিয়ম, দুর্নীতি, আর লুটপাটের খবর ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন করায় এই খেসারত! গত ১৭ মে পেশাগত দায়িত্ব পালনে রোজিনা ইসলাম সচিবালয় গেলে স্বাস্থ্য সচিবের পাশের একটি কক্ষে তাকে নির্যাতন করা হয়, সেখানে উপসচিব এই নারী সাংবাদিকের গলাও চেপে ধরেন। যার ছবি ইতিমধ্যে ভাইরাল হয়েছে সামাজিক জোগাজোগ মাধ্যমে।
কথা হলো কেন এই আক্রোশ! সরকার সবসময়ই দুর্নীতি নিয়ে জিরো টলারেন্সের কথা বলে আসছে। যদি তাই হয়, তাহলে রোজিনা ইসলাম তো সরকারকেই সহায়তা করতেই গিয়েছে। দেশের ছোট শিশুটিও যানে দেশের স্বাস্থ্য বিভাগের ভগ্নদশার করুন হালের কথা। এখানে দুর্নীতিতে অন্যান্য মন্ত্রনালয়ের চেয়ে সবসময়ই এগিয়ে থাকে এ বিভাগটি।
রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে নথি চুরির অভিযোগ করে অফিসিয়াল সিক্রেসি আ্যাক্টে মামলা হয়েছে। মামলার বিবরনে রয়েছে গত বাঁধা কিছু মুখস্থ বানী,আর সামঞ্জস্যহীন অসংলগ্ন অভিযোগ। দেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্রান্তিকালে এরকম সাহসী এক নারী সাংবাদিকের কলমকে যদি আমলারা এতটাই ভয় পেয়ে হামলা, মামলা করে- তাহলে বুঝতে হবে এসব আমলারা কতটা বেপরোয়া।
এসব দুর্নীতিপরায়ন আমলাদের জন্য সরকারের সাথে গনমাধ্যমের একটি নীরব দুরত্ব সৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের সাধারন নাগরিকের টাকায় এসব মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন হয়। তাই নাগরিকের সম্পদ চুরি হলে,সেই সম্পদের হিসেব একজন সাংবাদিক হিসেবে রোজিনা ইসলাম চাইতেই পারেন। এটি তার অধিকার। রাষ্ট্রের আমলা কোন আলাদা গোষ্ঠী নয়। আজ তথ্য চুরির যে অভিযোগ, অপবাদ দেয়া হচ্ছে রোজিনা ইসলামের উপর, জনগনের সামনে আমলাদের চুরির ঘটনা প্রকাশে যে খরগ নেমে এসেছে তার উপর, এরকম অভিযোগ যত বেশি আসবে, বুঝা যাবে সাংবাদিকতা তার সঠিক জায়গায়ই হাঁটছে।
চোখ রাঙানোকে অবজ্ঞা করে এগিয়ে যাওয়ার অপর নামই সাংবাদিকতা। একজন রোজিনা ইসলামের সাহসী কলমকে ভয় পাইয়ে দেয়ার নামই পেশাদারিত্ব। যদিও পেশাদারিত্বরও এখন আকাল চলছে।
সরকার দলীয় আর বিরোধী দলীয় সাংবাদিকের ভীরে পেশাদার সাংবাদিকরা কোনভাবে একটু কাপড় পরে লজ্জা বাঁচিয়ে রাখছে। কেননা এক শ্রেনীর সাংবাদিক নেতা নামধারীরা মাথা বিক্রি করে সাংবাদিকতা পেশাকেও বিকিয়ে দিয়েছে। টেন্ডারবাজ, চাঁদাবাজ, দলকানাবাজ কথিত সাংবাদিক নেতাদের কুটকৌশলে যাতে রোজিনারা ন্যায়বিচার, অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন সেজন্য পেশাদার সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
আমরা এখনো স্বপ্ন দেখি রোজিনা ইসলামের মত কিছু আলোকিত সাংবাদিক জাতিকে আলোর পথ দেখাবে। কোন রক্ত চক্ষুকে ভয় করে থেমে থাকলে পিছিয়ে পরবে গনমাধ্যম। তাই গনমাধ্যমকে টিকিয়ে রাখতে হলে সকল গনমাধ্যম কর্মীদের এক হয়ে কাজ করার বিকল্প নেই।
যেখানে রাজনৈতিক টাউট, বাটপার, চাঁদাবাজির কোন কর্মীকে ধরলে থানা ঘেরাও করে পুলিশের অসহায়ত্ব দেখি, সেখানে রোজিনা ইসলামের মত একজন সাংবাদিককে নিয়ে যেতে পুলিশের যে বহর দেখা গেল, তাতে মনে হয় সত্যিই কি বিচিত্র এ দেশ!
রাষ্ট্রের ক্ষত সারাতে যেখানে মলম দেয়ার দরকার,সেখানে মলম না লাগিয়ে সুস্থ জায়গায় মলম লাগাতে মরিয়া প্রশাসন। একজন প্রথিতযশা নারী সাংবাদিকের এ কান্না একটি অসহায় প্রতিবাদ। এ কান্নায় লুকিয়ে আছে কলমের অসহায়ত্বের না বলা অনেক কথা। আমরা যত বেশি সে না বলা কথাগুলো বুঝতে পারবো, তত বেশি এগিয়ে যাব।
রোজিনা ইসলামকে তথ্য চুরির অভিযোগে আমলারা যদি চোর বলেন, আমরা এরকম আরো অনেক চোর চাই বাংলাদেশে। যত দ্রুত বেশি এরকম চোর সৃস্টি হবে, তত দ্রুতই সোনার বাংলা হিসেবে মাথা উঁচু করে জানান দিবে- সোনার বাংলাদেশ।
