ক্লাবপাড়ার বেশীরভাগ অঘটন থেকে যায় আড়ালে

Spread the love

নাগরিক ডেস্ক : দেশে ক্লাবপাড়ায় প্রায়ই ছোট-বড় অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। কালেভদ্রে দু-একটি ছাড়া ক্লাবের ভেতরে ঘটা সব অপ্রীতিকর ঘটনা পর্দার আড়ালেই থেকে যায়। আইনের ভাষায় আমলযোগ্য অপরাধ হলেও প্রথমে তা ক্লাব কর্তৃপক্ষ চেপে রাখার চেষ্টা করে। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বেশ কিছু কারণে বড় বড় ক্লাব ঘিরে বাড়তি নজর রাখে না। কারণ এসব ক্লাবের সদস্যরা সমাজের সম্ভ্রান্ত ও প্রভাবশালী শ্রেণির। আগ বাড়িয়ে ক্লাবে বাড়তি নজর না রাখার নীতি নিয়ে চলছে প্রশাসন। ক্লাবে নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে এমন একাধিক ব্যক্তি ও প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

ঢাকা বোট ক্লাবে চিত্রনায়িকা পরীমণিকে ধর্ষণ-হত্যাচেষ্টার বিষয়টি ঘটনার চার দিন পর সামনে আসে। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার পরই তা জানাজানি হয়। পরীমণি নিজ থেকে তা প্রকাশ্যে না আনলে এ ঘটনাও হয়তো আড়ালেই থেকে যেত। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বুধবার সামনে এসেছে পরীমণিকে ঘিরে আরেকটি নতুন কাহিনী। ৮ জুন বোট ক্লাবের ঘটনার আগের দিন মধ্যরাতে রাজধানীর গুলশানের অল কমিউনিটি ক্লাবে তিনি ভাঙচুর করেন বলে অভিযোগ মিলেছে। ৯৯৯-এর ফোন পেয়ে পুলিশ ওই রাতে ঘটনাস্থলে গেলেও তা বের হল ৯ দিন পর। ক্লাবপাড়ার এমন অনেক ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়। যদিও পরীমণি এটাকে ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করেছেন।

এ বিষয়ে অল কমিউনিটি ক্লাবের সভাপতি কে এম আলমগীর ইকবাল সমকালকে বলেন, নিজস্ব নিয়ম-নীতিতে ক্লাব পরিচালিত হয়। এখানে স্পষ্ট বলা আছে, ক্লাবের ভেতরের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর বাইরে প্রকাশ করা যাবে না। কেউ অঘটন ঘটালে ক্লাব কর্তৃপক্ষ তাকে শোকজ করে। বড় ধরনের ঘটনায় জড়ালে স্থায়ী বহিষ্কারও করা হয়। তবে থানা-পুলিশ পর্যন্ত এসব গড়ায় না। কারণ ক্লাব সদস্যদের সামাজিক মর্যাদা এর সঙ্গে জড়িত।

এ পর্যন্ত কতজনকে ক্লাব থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, দু’জনকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। কয়েকজনকে তিন মাসের জন্য ক্লাব ব্যবহার করতে না দেওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। কোনো সদস্যের অতিথি হিসেবে কেউ ক্লাবে এসে অঘটন করলে তার দায়-দায়িত্ব ওই সদস্যকে নিতে হয়।
জানা যায়, ঢাকার অভিজাত ক্লাবে এখন নতুন সদস্যপদ পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। কোনো ক্লাবে দু-একটি পদ খালি হলেও একেকটির জন্য ৭০ লাখ থেকে কোটি টাকার বেশি খরচ করতে হয়। এ ছাড়া এলাকাভিত্তিক বেশ কিছু ক্লাব রয়েছে। অনেক ক্লাবে প্রায়ই জুয়ার আসরও বসে বলে অভিযোগ আছে। ক্যাসিনোকাণ্ডের পর নিয়মিত জুয়ার আসর বসত- এমন বেশ কিছু ক্লাব বন্ধ করে দেওয়া হয়। আবার ছোট-মাঝারি মানের কিছু ক্লাব স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে চলে। ঢাকা ও আশপাশের এমন বেশ কিছু ক্লাবে নিয়মিত ডিজে পার্টির আয়োজন করা হয়।

এ বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম গনমাধ্যমকে বলেন, গুরুতর অভিযোগ না পেলে সাধারণত পুলিশ ক্লাবে অভিযান চালায় না। কেউ যদি ছোটখাটো ঘটনায় অভিযোগ করে, আমরা তাদের নিজেদের মধ্যে মিটমাট করার জন্য পরামর্শ দেই। ক্লাব মানুষের সুস্থ বিনোদনের জায়গা। সেখানে সবার দেখা-সাক্ষাৎ হয়। ছোটখাটো ঘটনায় ক্লাবে পুলিশের যাওয়া সমীচীন নয়।

ফুটেজ বিশ্নেষণ: পরীমণিকে নির্যাতনের অভিযোগের ঘটনাস্থল ঢাকা বোট ক্লাবের ভিডিও ফুটেজ দেখে পুলিশ বলছে, সেখানে ঢোকার প্রায় পৌনে দু’ঘণ্টা পর এই চিত্রনায়িকাকে পাজাকোলা করে বের করতে হয়েছে। সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজ থেকে এটা নিশ্চিত, ওই রাতে বোট ক্লাবের ভেতরে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে।

কালো রঙের একটি গাড়িতে রাত ১২টা ২২ মিনিটে পরীমণি ক্লাবে ঢোকেন। ফুটেজে দেখা যায়, ক্লাবের মূল গেটে কালো রঙের গাড়িটি থামে। গাড়িটি ছিল অমির। এর সামনের দরজা থেকে নামেন পরীমণি। পেছনের ডান পাশের দরজা দিয়ে বের হন অমি, কস্টিউম ডিজাইনার জিমি ও একজন নারী। পেছন পেছন যাওয়া ওই নারীর নাম বনি। স্বাভাবিকভাবে হেঁটেই বোট ক্লাবে ঢুকতে দেখা যায় পরীমণিসহ অন্যদের। আর পরীমণি বের হন ১টা ৫৯ মিনিটে। বের হওয়ার সময় পরীমণিকে পাজাকোলা করে দু’জনে মিলে বের করতে দেখা যায়। বের হওয়ার সময় অভিনেত্রীর হাত ও পা দু’জন ধরাধরি করে সাদা রঙের একটি গাড়িতে তোলেন।

তবে যে বারের ভেতরে মূল ঘটনা ঘটেছে, সেখানে কোনো সিসিটিভি নেই। সাধারণত কোনো ক্লাবের বারে সিসিটিভি থাকে না।

এখন পর্যন্ত পাওয়া ফুটেজে বোট ক্লাবের সদস্য নাসির উদ্দিন মাহমুদকে ক্লাবে প্রবেশ করতে দেখা যায়নি। তিনি আগে থেকেই ভেতরে ছিলেন।

এছাড়া ওই বারে পরীমণির সঙ্গে থাকা তার কস্টিউম ডিজাইনার জিমি মোবাইল ফোনে ১৫ সেকেন্ডের ধস্তাধস্তির একটি ভিডিও করেছিলেন। এতে ভরাট পুরুষ কণ্ঠে গালমন্দ ও চিৎকার করতে শোনা যায়। বোট ক্লাবের ভেতরে ওই রাতে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। প্রকৃত ঘটনা জানার পর ক্লাবের স্টাফদের জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিশ।

সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী মাইনুল হক বলেন, বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করছে পুলিশ। ভেতরের বারে কোনো সিসি ক্যামেরা নেই। তাই ভেতরের চিত্র পাওয়া যায়নি।

অমির অফিসে অভিযান: পরীমণির মামলার আসামি তুহিন সিদ্দিকী অমির আশকোনার রিক্রুটিং এজেন্সির অফিসে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। এতে ১০২টি পাসপোর্ট, কিছু ব্যাংক স্ট্যাম্প ও ১৯ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। সেখান থেকে দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন, অফিস কর্মচারী বাছির ও মশিউর।

পুলিশের উত্তরা বিভাগের ডিসি সাইফুল ইসলাম বলেন, অমির সিঙ্গাপুর ট্র্রেনিং সেন্টার নামে একটি প্রতিষ্ঠান ছিল। সেটাসহ দুটি জায়গায় অভিযান চালানো হয়। এ ঘটনায় দক্ষিণখান থানায় অমিসহ তিনজনের বিরুদ্ধে বুধবার পাসপোর্ট আইনে মামলা করেছে সাভার থানা পুলিশ।

সংগৃহীত- সমকাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *