করোনার থাবা আটঘর-কুড়িয়ানার পেয়ারা বানিজ্যে

Spread the love

নাগরিক রিপোর্ট : লোকসানের মুখে ১২ বিঘা জমির বাগানের পেয়ারা গাছ কেটে সুপারি গাছের চাড়া লাগিয়েছেন কুড়িয়ানার বাগান মালিক বলাই চাঁদ সিকদার (৬৫)। তিনি বলেন, দুই বছর ধরে ফলন কম হচ্ছে। করোনার কারনে ক্রেতা-পাইকার নেই। লাভতো হয়ই না, উৎপাদন খরচও ওঠেনা।
পার্শ্ববর্তী জিন্দাকাঠী গ্রামের পেয়ারা চাষী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সরোয়ার হোসেন বলেন, কুড়িয়ানার অধিকাংশ চাষীরা এখন পেয়ারা বাদ দিয়ে আমড়া, কাগুজি লেবুসহ বিকল্প নানারকম লাভজনক কৃষি আবাদে ঝুকেছেন।
সরোয়ার হোসেন বলেন, এখন পেয়ারার ভরা মৌসুম। এসময়ে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে দুপুর পর্যন্ত স্বরূপকাঠীর ২০-২৫টি স্পটে শত শত মন পেয়ারা বিক্রি হতো। করোনার থাবায় সব স্থবির হয়ে আছে। লকডাউনের কারনে দুরদুরান্তের পাইকাররা আসেন না। ফলে আদমকাঠী, কুড়িয়ানা বাজার, জিন্দাকাঠীসহ মাত্র ৫-৬টি স্পটে কিছু পেয়ারা বিক্রি হচ্ছে। কিন্ত দাম পাচ্ছেন না চাষীরা।
পিরোজপুরের স্বরূপকাঠী উপজেলার আটঘর-কুড়িয়ানার বিখ্যাত পেয়ারা সরবরাহ হয় সারাদেশে। কিন্ত গত দুইবছর যাবত করোনা, কম ফলন এবং ছিটপড়া রোগের কারনে পেয়ারার ভরা মৌসুমেও বড় লোকসানের মুখে আছেন চাষী ও ব্যবসায়ীরা। চাষীরা জানান, আষাঢ়ের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয় পেয়ারার মৌসুম। প্রতিবছর মৌসুম জুরে প্রতিদিন নৌকা, ট্রলার আর ট্রাকে করে স্বরূপকাঠীর পেয়ারা যেত দেশের বিভিন্ন স্থানে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চাষী, বাগান মালিক, খুচরা ও পাইকারী ব্যবসায়ীদের কোলাহলে মুখর থাকত প্রতিটি পেয়ারা বাগান। কিন্ত গতবছর থেকে চিত্র ভিন্ন। করোনার কারনে এবং ফলন কমের জন্য পাইকারদের আনাগোনা অর্ধেকেরও কম। অপরদিকে পেয়ারা বাগানকে ঘিরে গড়ে ওঠা পর্যটন কার্যক্রমও নিস্প্রান। ফলে স্বরূপকাঠীর পেয়ারা কেন্দ্রিক অর্থনীতি বিপর্যস্থ হয়ে পড়েছে।

ছিটপড়া রোগে আক্রান্ত পেয়ারা্


পেয়ারার রাজ্যখ্যাত পিরোজপুরের স্বরূপকাঠী উপজেলার আটঘর-কুড়িয়ানা এবং পাশ্ববর্তী জিন্দাকাঠী, আদমকাঠী, ধলহার, রাজাপুর প্রভৃতি গ্রামের পেয়ারা চাষীরা বলেছেন, বাগানগুলোতে তেমন ফলন হয়নি। যেসব গাছে ফলন হয়েছে তারও অর্ধেক ছিটপড়া রোগে আক্রান্ত। জিন্দাকাঠী গ্রামের প্রবীন পেয়ারা চাষী সুলতান হাওলাদার জানান, আটঘর-কুড়িয়ানাকে পেয়ারার রাজ্য বলা হলেও পাশ্ববর্তী বরিশালের বানারীপাড়া এবং ঝালকাঠী সদর উপজেলায় পেয়ারা চাষের বিস্তৃতি ঘটেছে। এ তিন উপজেলার ৩৫ গ্রামে গত একযুগ ধরে চাষ হচ্ছে বাংলার আপেলখ্যাত পেয়ারা।
স্বরূপকাঠী কৃষি বিভাগ সুত্র জানায়, ফলন কম এবং করোনার কারনে পেয়ারা চাষীদের মনে আনন্দ নেই। কারন এসব এলাকার মানুষের আয়ের অন্যতম উৎস্য হচ্ছে পেয়ারা। ছিটপড়া রোগের কারনে চাষীরা এবার দামও পাচ্ছেন না।
কুড়িয়ানার পেয়ারা চাষী বঙ্কিম মন্ডল বলেন, এবছর বাগানে তেমন ফলন হয়নি। তার ওপর করোনার ভয়ে চাষীরা বাগানের যথাযথ পরিচর্যা করতে না পারায় ছিটপড়া রোগে আক্রান্ত হয়েছে প্রতিটি বাগান। যে কারনে এবছর প্রতিমন পেয়ারা বিক্রি হচ্চে ৩০০-৪০০ টাকায়। অথচ করোনার আগে প্রতিমন পেয়ারা পাইকারী বিক্রি হয়েছে ৮০০-১০০০ টাকায়।
কুড়িয়ানা পেয়ারা চাষী সমিতির সভাপতি জহর মন্ডল জানান, গতবছরের তুলনায় এবছর পেয়ারার ফলন ৫০ ভাগ কম হয়েছে। রোগবালাইও বেশী। করোনার প্রভাব পড়েছে বাজারমূল্যে। ফলন কম হওয়ায় সংশ্লিষ্ট শত শত শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন।
এদিকে করোনার কারনে উপজেলা প্রশাসন পেয়ারা বাগান ঘিরে গড়ে ওঠা পর্যটন স্পটগুলোতে দর্শনার্থীদের আগমন নিষিদ্ধ করায় নিম্প্রান হয়ে আছে আটঘর-কুড়িয়ানার চারটি পেয়ারা পার্ক। প্রতিবছর হাজার হাজার দর্শনার্থীদের আগমনের কারনে স্থানীয় ট্রলার চালক ও ভাড়ার মোটরসাইকেল চালকরা প্রতিদিন ভাল আয় করতেন। বিশেষ কিছু দর্শনীয় স্থানের হোটেল রেস্তোরাগুলোতে প্রচুর অতিথি আসত। কিন্ত এ বছর তাদের কোন আয় নেই।
স্বরূপকাঠী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারন কর্মকর্তা চপল কৃঞ্চ নাথ জানান, করোনার প্রভাবে চাষীরা যথাযথভাবে পরিচর্যা করতে না পারায় ছিটপড়া রোগের বিস্তার ঘটেছে। এ কারনে ফলন এবছর কম হয়েছে। গতবছরও একই অবস্থা ছিল। চপল কৃঞ্চ নাথ বলেন, এবছর পেয়ারা চাষীরা যাতে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেন এজন্য তাদের বিনামূল্যে উপকরন (বীজ, সার, কীটনাশক) সহযোগীতা ও সহজ শর্তে ঋন দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে।##

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *