নাগরিক রিপোর্ট : জেলে সোহাগ গত রোববার ৪ ঘণ্টা মেঘনা নদীতে জাল পেতে মাত্র একটি ইলিশ পেয়েছেন। সেটির আকৃতি এতই ছোট যে বাজারে তোলার পর ২০ টাকা দাম ওঠে। তার আগের দুইদিন শুক্র ও শনিবার সোহাগকে ইলিশ না ছাড়াই নদী থেকে ফিরতে হয়। সঙ্গী জেলে ইউসুফ মোল্লা, জয়নাল দেওয়ান, জয়নাল মাঝিসহ আরও কয়েকজন সোহাগের মতোই টানা তিনদিন মেঘনায় ৩-৪ ঘন্টা জাল ফেলে শুন্যহাতে বাড়িতে ফিরেছেন। তারা জাল ফেলেছিল ইলিশের ষষ্ঠ অভয়াশ্রম বরিশালের হিজলা উপজেলার ধুলখোলা ইউনিয়নের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মেঘনায়। অর্থাৎ ইলিশের খনিতে জাল ফেলেও শুন্যহাতে ফিরতে হয় তাদের।
এসব কথা জানিয়ে জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির ধুলখোলা ইউনিয়ন সাধারন সম্পাদক মনির মাতুব্বর বলেন, ‘দশ বছর ইলিশের ব্যবসা হরি, আমার অ্যলাকার ম্যাঘনায় ইলিশের এমন আহাল (আকাল) আর কোনদিন দেহিনি’।
মেঘনার মতোই ইলিশের আকাল চলছে ইলিশের খনি হিসাবে খ্যাত আড়িয়াল খাঁ, তেতুলিয়া, বিষখালী, বলেশ্বরসহ দক্ষিণাঞ্চলের সব নদ-নদীতে। অথচ ক্যালেন্ডারের হিসাবে ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ইলিশের ভরা মৌসুমের এরই মধ্যে দেড় মাস পেরিয়ে গেছে। সাগরের ইলিশ নদীতে ধাবিত হওয়ার জন্য পরিপূর্ণ পানি, পর্যাপ্ত বৃষ্টি সবই আছে এবারের মৌসুমে। তারপরও নদীতে ইলিশ নেই। ফলে ভরা মৌসুমে দক্ষিণাঞ্চলে ইলিশের দাম সাধারন মানুষের নাগালের বাইরে।
চলতি আগষ্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে সাগরে সীমিত পরিমান ইলিশ পাওয়া শুরু হলেও নদীতে কেন নেই, এ নিয়ে জেলে ও ইলিশ বিশেষজ্ঞরা দিয়েছেন নানা মত। তাদের তথ্যমতে, সাগরের ৩টি মোহনায় (নদী ও সাগরের মিলনস্থল) নাব্য সংকটে ইলিশের চলার পথ বাঁধাগ্রস্থ হওয়ায় এবং প্রতিটি মোহনায় হাজার হাজার জেলে নিরবিচ্ছিন্নভাবে জাল পেতে রাখায় ইলিশ নদী পর্যন্ত পৌছাতে পারছে না। তবে ইলিশ বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, ‘মৌসুমের শেষ পর্যায়ে হলেও নদীতে ইলিশ আসবেই, জেলেদের ধৈর্য্য ধরতে হবে’।
জানা গেছে, বরগুনার পাথরঘাটার অদুরে পায়রা-বলেশ্বর, পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার তেতুলিয়া এবং ভোলার তজুমউদ্দিনের ঢালচরে মেঘনার মোহনা দিয়ে ইলিশের ঝাক সাগর থেকে নদীতে প্রবেশ করে নদীর শাখা-প্রশাখাগুলোতে ছড়িয়ে যায়। এবারের মৌসুমে এসব নদীতে ইলিশ আছে নামমাত্র।
কেন এই সংকট : নদীতে ইলিশের আকাল প্রসঙ্গে জাতীয় ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সমিতির কেন্দ্রীয় সাধারন সম্পাদক আনোয়ার হোসেন সিকদার বলেন, ‘এমন পরিস্থিতি হবে এ কথা আমি আরও দশ বছর আগে থেকে বলে আসছি’। তিনি বলেন, ৩ মোহনায় নাব্য সংকট দেখা দিয়েছে আরও ৫ বছর আগে। ফলে চলার পথে ধারাবাহিকভাবে বাঁধাগ্রস্থ হওয়ায় ইলিশ গতিপথ পরিবর্তন করে ফেলেছে। এ সংকট থেকে বের হতে হলে বড় প্রকল্পের আওতায় খনন করে মোহনার নাব্য ফিরিয়ে আনতে হবে।
সম্প্রতি সাগরে ইলিশ পাওয়া প্রসঙ্গে প্রবীন এ মৎস্যজীবী নেতা ভিন্নমত জানিয়ে বলেন, সেখানেও তুলনামুলক অনেক কম ইলিশ পাচ্ছেন জেলেরা। তিনি বলেন, সাগরে আমাদের জলসীমায় যখন ৬৫ দিন মাছধরা বন্ধ থাকে তখন ভারতের নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়। এ সুযোগে ভারতের জেলেরা বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকে মাছধরায় সাগরে ইলিশ অনেক কমে গেছে। দুই দেশ আলোচনা সাপেক্ষে একই সময়ে সাগরে মাছ নিধনে নিষেধাজ্ঞা দিলে এ সংকটের সমাধান হবে।
মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশালের মৎস্য কর্মকর্তা (ইলিশ) ড. বিমল চন্দ্র দাস বলেন, সাগরে পর্যাপ্ত ইলিশ আছে। প্রতিবছরই জেলের সংখ্যা বাড়ছে। নদীতে মাছ না পেয়ে সব জেলেরা মোহনাতে গিয়ে নিরবিচ্ছিন্নভাবে জাল পাতায় নদীতে প্রবেশ পথ আটকে গেছে।
এর স্বপক্ষে যুক্তি দেখিয়ে তিনি বলেন, কিছুদিন যাবত দক্ষিণাঞ্চলের নদীতে ছোট সাইজের ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। নিরবিচ্ছিন্ন জাল এড়িয়ে ছোট ইলিশ নদীতে ঢুকতে পারলেও বড় ইলিশ ধরা পড়ে যাচ্ছে। মোহনায় নব্য সংকট ও অস্বাভাবিক গরমে পানির উঞ্চতা বৃদ্ধিও নদীতে ইলিশ না আসার অন্যতম কারন বলে জানান তিনি।
জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির হিজলার ধুলখোলা ইউনিয়নের সাধারন সম্পাদক মনির মাতুব্বর বলেন, মেঘনায় ভাদ্র ও মাঘ মাসে দুই দফায় ইলিশের প্রজনন হয়। তখন তার এলাকার জেলেরা ইলিশের বাচ্চা নিধন করে চাপিলা নামে ৩০ টাকা কেজি দরে এবং জাটকা এক হালি বিক্রি করে ৩০ টাকায়। ওই জেলেরাই এখন নদীতে ইলিশ না পেয়ে হা-হুতাশ করছেন।
জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির যুগ্ন মহাসচিব ইকবাল হোসেন মাতুব্বর বলেন, মৎস্য ভবনে উচ্চ পর্যায়ের সভায় অংশ নিয়ে নদীতে জাটকা ও ইলিশের রেনু নিধনের কথা বললেই আমলারা উত্তেজিত হয়ে এর বিরোধীতা করেন। তারা শুধু ইতিবাচক বক্তব্য পছন্দ করেন।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইলিশ মোকাম পায়রা-বলেশ্বর মোহনার সংলগ্ন পাথরঘাটা উপজেলার ইলিশ অবতরন কেন্দ্রের বিপনন কর্মকর্তা বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, মোহনায় অপরিকল্পিত জালপেতে ইলিশ চলাচলের পথ আটকে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া গভীর সমুদ্রের মাছ ধরায় ব্যবহৃত ট্রলিং ট্রলারগুলো এখন মোহানায় এসে ইলিশ নিধন করছে। যে কারনে নদীতে ইলিশ আসার সব পথ রূদ্ধ হয়ে গেছে।
নদীতে ইলিশ সংকট নিয়ে উল্লেখিত কারনগুলোর বেশীরভাগই সত্য বলে জানিয়েছেন চাঁদপুর ইলিশ গবেষনা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিছুর রহমান। তারপরও তিনি আশার বানী দিয়ে বললেন, আমাবশ্যা ও পূর্ণিমায় সাগরে পানি বৃদ্ধি পেলে ইলিশ আন্দোলিত তথা ইলিশের শরীরে নাচন শুরু হয়। তখন ইলিশের ঝাক একদিকে ছুটতে থাকে। গত ৮ আগষ্ট আমবশ্যায় ইলিশের ঝাক ছুটেছে কক্সবাজারের মোহনার দিকে। এরপরই ওই এলাকাতে বেশী ইলিশ ধরা পড়ছে। বরগুনার বিষখালী-বলেশ্বর মোহনাতেও ইলিশের বিচরন বেড়েছে। ড. আনিছুর বলেন, আগামী ২২ আগষ্ট পূর্ণিমা। এরপরেই আরও বেশী পরিমান ইলিশ পাওয়া যাবে বলে দৃঢ় আশাবাদী তিনি।
ড. আনিছুর গত কয়েক বছর থেকে বলে আসছেন, ইলিশের অভয়শ্রম মেঘনার চাঁদপুরের হরিণঘাটা, আনন্দবাজার, ভোলার ইলিশা, মেহেন্দিগঞ্জের কালীগঞ্জ, প™§ার মাওয়া ঘাটসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ন নদ-নদীর নাব্য আশংকাজনভাবে হ্রাস পেয়ে অবস্থার ক্রমশ অবনতি হচ্ছে। অভয়াশ্রম এলাকায় প™§া সেতু, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ন স্থাপনা এবং নদী দুষনের কারনে সেখানে ইলিশ বিচরন বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে। এসব প্রতিকুল পরিবেশ ইলিশের গতিপথ পরিবর্তন আশংকা থাকে।
মৎস্য অধিদপ্তরে বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ে দেয়া তথ্য অনুযায়ী এ বছরের জুলাইতে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় ১১ হাজার ২২২ মেট্রিক টন ইলিশ আরোহিত হয়েছে। গত বছর জুলাইতে এর পরিমান ছিল ১৮ হাজার ৬৫ মেট্রিক টন। অর্থাৎ এবছরের জুলাইতে গত বছরের চেয়ে ৬ হাজার ৮৪৩ মেট্রিক টন কম ইলিশ পাওয়া গেছে দক্ষিণাঞ্চলে।
এবছর নদ-নদীতে ইলিশ কমে যাওয়ায় এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে বরিশালের প্রধান ইলিশ মোকাম পোর্ট রোডে। আড়তদার মো. মিজানুর রহমান জানান, মঙ্গলবার এ মোকামে ২০০ মন ইলিশ আমদানী হয়। যার ১০০ মন স্থানীয় নদ-নদী থেকে আহোরিত এবং অবশিষ্ঠ ১০০ ভোলার মোহনা থেকে আমদানী হয়েছে। গত বছর এই সময়ে প্রতিদিন সহ¯্রাধিক মন ইলিশ আসতো পোর্টরোড মোকামে। আমদানী কম হওয়ায় ৭০০-৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের পাইকারী দাম পড়েছে কেজি ১ হাজার টাকা। খুচরা বাজারে ওই মাছ কমপক্ষে ১১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়।##
২০২১-০৮-১৮
