তিন দশক পর বরিশাল বিএনপিতে সরোয়ারের আধিপত্যে ধ্বস

Spread the love

নাগরিক রিপোর্ট : ৯৯০ সালের প্রথম দিকে নগরীর কাউনিয়ায় টেক্সটাইল মিলে শ্রমিক নেতা সালামকে গুলি করে হত্যা মামলার প্রধান আসামী হয়ে আত্মগোপনে যান তৎকালীন বরিশাল জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি মজিবর রহমান সরোায়ার। গণআন্দোলনে একই বছরের ৬ ডিসেম্বরে এরশাদ সরকারের পতন হলে অনুসারী শত শত নেতাকর্মীর বর্ণাঢ্য মোটরশোভাযাত্রায় সংবর্ধিত হয়ে বরিশালে ফেরেন তিনি। এরপরেই বরিশালে বিএনপিতে সরোয়ার যুগের সুচনা হয়।
গত ৩১ বছরে দল তাকে পরিচালনা করতে পারেনি, তিনিই একক আধিপত্যে দল পরিচালনা করেছেন। সংসদ সদস্য, জাতীয় সংসদের হুইপ, সিটি করপোরেশনের মেয়র, দলের বিএনপির সভাপতি-সম্পাদক যখন যা চেয়েছেন সেটাই আদায় করেছেন। নিজে পদ নিয়েছেন এবং অন্যকে পদ দিয়েছেন। তার মতের বিরুদ্ধে গেলেই জুটতো বহিস্কারের খড়গ। এককথায় দলে মজিবর রহমান সরোয়ার ছিলেন অপ্রতিরোধ্য নেতা। গতকাল সোমবার বরিশাল মহানগর এবং উত্তর ও দক্ষিন জেলা আহ্বায়ক কমিটি গঠনের মধ্যদিয়ে অপ্রতিরোধ্য সরোয়ারের ছন্দপতন ঘটলো। তিনি নিজে এবং তার অনুসারীরা পদ পাননি। বরঞ্চ যারা সরোয়ারে আধিপত্য খর্ব করতে গত একবছরের বেশী সময়ে মাঠে সক্রিয় বিএনপি নেতাদের আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব পদে পদায়ন করা হয়েছে নবগঠিত কমিটিতে। মজিবর রহমান সরোয়ার এখন শুধুমাত্র দলে কেন্দ্রীয় যুগ্ন মহাসচিব।

সরোয়ারে রাজনৈতিক উত্থান
মজিবর রহমান সরোয়ার জিয়াউর রহমানের শাসমনালে শ্রমিক রাজনীতি দিয়ে বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। হত্যাসহ বিভিন্ন মামলায় এরশাদ শাসনমালের বেশীরভাগ সময়ে তিনি ছিলেন কারাগারে। তখন ছিলেন বিএনপির শ্রমিক সংগঠন শ্রমিক দলের সভাপতি। ‘৯০র গণঅভুত্থান পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথম নির্বাচনে (১৯৯১) তখনকার বরিশাল- ৩ (হিজলা-মুলাদী) আসনে দলের মনোনয়ন দেয়ার পর আবার তাকে সরিয়ে মোশারফ হোসেন মঙ্গুকে দেয়া হয়। কয়েকমাস পরেই ভাগ্য খুলে যায় সরোয়ারের। বরিশাল সদর আসনের সাংসদ আব্দুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি হলে শুন্য আসনের উপনির্বাচনে সাংসদ হন সরোয়ার। রাষ্ট্রপতির ছেলে ডা. এহতাশেমুল হক নাসিম বিশ্বাস বিএনপির একটি অংশের নেতৃত্ব দিলেও সরোয়ার ছিলেন তার শক্ত প্রতিপক্ষ। ‘৯৬ নির্বাচনে সরোয়ার মনোনয়নবঞ্চিত হলে সদরে সাংসদ হন রাষ্ট্রপতি পুত্র নাসিম বিশ্বাস। ‘৯৮ সালের নভেম্বরে ডা. নাসিম বিশ্বাসের অকাল মৃত্যুতে বরিশাল বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনে সরোয়ার বাঁধাহীন আধিপত্য গড়ে তোলেন। যা অটুট ছিল গতকাল বুধবার পর্যন্ত। ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তী চারদলীয় জোট শাসমনালে মজিবর রহমান সরোয়ার একসঙ্গে সংসদ সদস্য, জাতীয় সংসদের হুইপ, জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এবং সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে ছিলেন। অর্ধশতাধিক সংগঠনের সভাপতি ছিলেন তিনি। যা দেশের রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষেত্রে অনেকটা বিরল ঘটনা। দলে এক নেতা একপদ নীতি অনেক বছর আগে চালু হলেও সরোয়ার যুগ্ন মহাসচিবের পাশাপাশি এতদিন বরিশাল মহানগর সভাপতির পদও আগলে রেখেছিলেন।

সরোয়ারের রোষানলে পড়েছেন যারা
২০০৩ সালে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে সরোয়ার জাতীয় সংসদের হুইপ ও জেলার দয়িত্বাপ্রাপ্ত মন্ত্রীর পাশাপাশি মেয়র পদেও দলের মনোনয়ন বাগিয়ে নেন। এতে ক্ষুদ্ধ হয়ে তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়র আহসান হাবিব কামাল ও জেলা বিএনপির সাধারন সম্পাদক এবায়দেুল হক চাঁন বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন। এ কারনে বহিস্কৃত হয়ে প্রায় ৮ বছর দলের বাইরে ছিলেন তারা। ২০১০ সালের দিকে তারা দলে ফিরলেও নিজ শক্তিতে দ্বারাতে পারেননি। চাঁন দক্ষিণ জেলা পদ পেলেও দক্ষিণ ও উত্তর দুটি জেলা কমিটিরই নিয়ন্ত্রন করতেন সরোয়ার। নগর রাজনীতি নিয়ন্ত্রনে রাখতে সরোয়ার জেলার সভাপতি পদ ছেড়ে মহানগরের সভাপতি পদে আসীন হন। আহসান হাবিব কামাল দলে ফিরলেও হারানো মহানগর সভাপতি পদ আর ফিরে পাননি। তিনি ২০১৩ সালে সিটি মেয়র নির্বাচিত হলেও দলে সুসংহত অবস্থান করতে পারেননি সরোয়ারের দাপটে। ৯০ দশকের ছাত্রদল নেত্রী বর্তমানে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস আক্তার শিরিন সরোয়ারের দাপটে কোনঠাসা হয়ে ঢাকায় গিয়ে কেন্দ্রের রাজনীতিতে জড়ান। একসময়ে সরোয়ারের আস্থাভাজন জেলা বিএনপির সাবেক সাধানর সম্পাদক অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম রাজন সরোয়ার অনুসারীদের ধারালো অস্ত্রাঘাতে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এখন আমেরিকা প্রবাসী। রাজনীতিতে নিস্ক্রীয় হয়ে গেছেন শহর বিএনপির সাবেক সাধারন সম্পাদক আসাদুজ্জামান খসরু। বরিশাল নগরীর সন্তান হয়েও বিএনপির যুগ্ন মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বরিশাল বিএনপিতে স্থায়ী অবস্থান নিতে পারেননি বলে দলে গুঞ্জন রয়েছে।

আধিপত্যের খর্ব হয় যেভাবে
বরিশাল বিএনপিতে প্রকাশ্যে সরোয়ার বিরোধীতা শুরু হয় প্রায় দেড় বছর আগে। ৯০ দশকের একদল ছাত্রদল নেতা একজোট হয়ে প্রথমে ঘরোয়া সভা শুরু করে। এবছরের শুরুতে তাদের সঙ্গে যোগদেন মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহ সভাপতি মনিরুজ্জামান ফারুক সহ কমিটির বড় একটি অংশ। পরবর্তীতে ছাত্রদল-যুবদল-স্বেচ্ছাসেবক দলেরও একটি বড় অংশ তাদের সঙ্গে যোগ দেন। সরোয়ার বিরোধীরা সকলেই একসময়ে তার আস্থাভাজন ছিলেন। তাদের সকলের অভিযোগ ছিল, মজিবর রহমান সরোয়ার দল কুক্ষিগত করে রাখতে কাঠের ফ্রেমের চশমার মতো অযোগ্যদের পদায়ন করেন। যোগ্যদের দল থেকে দুরে রাখেন। তবে তাদের প্রধান অভিযোগ ছিল, সাধারন সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান শাহীনের মৃত্যুর পর সাবেক ছাত্রনেতাদের বাদ দিয়ে জিয়াউদ্দিন সিকদারকে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক করে দলকে পকেটস্থ করেছেন সরোয়ার। এসব অভিযোগ নিয়ে প্রায় একবছর কেন্দ্রের শীর্ষ নেতাদের কাছে দেনদরবার করেছেন সরোয়ার বিরোধীরা। তবে শেষ আস্থাভাজন জিয়াউদ্দিন সিকদারের সঙ্গেও শেষ পর্যায়ে সুসম্পর্ক ছিলনা সরোয়ারের। ৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে গত মঙ্গলবার রাতে মহানগর বিএনপির (সদ্য সাবেক) সভা হলেও সাধারন সম্পাদক জিয়াউদ্দিন সিকদার অভিযোগ করেন, সভার বিষয়টি তাকে জানাননি সভাপতি সরোয়ার। অথচ সাধারন সম্পদাক হিসাবে তিনি সভাপতির নির্দেশে সভা আহ্বান করবেন। নিজের দল ভারি করতে চারদলীয় জোট শাসনমালে তৎকালীন মহানগর জাতীয় পার্টির সভাপতি মনিরুজ্জামান ফারুককে বিএনপিতে ভেড়ান সরোয়ার। সেই ফারুকই সরোয়ার বিরোধী আন্দোলন করে মহানগরের আহ্বায়ক পদটি বাগিয়ে নেন।

বুধবার নতুন কমিটি গঠনের পর মজিবর রহমান সরোয়ারের প্রতিক্রিয়া জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেয়া হলেও তিনি সারা দেননি।##

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *