নাগরিক রিপোর্ট:
বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (শেবাচিম) আসা রিনা বেগম ক’দিন ধরে বারান্দার মেঝেতে পড়ে আছেন। এরপরও বেডের ব্যবস্থা হয়নি তার। হাসপাতালের এই মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডের বাইরের বারান্দায় মেঝেতে গত ৩ তিন ধরে অর্ধশত রোগীর ঠাঁই হতে দেখা গেছে। এমন একাধিক ওয়ার্ডে রোগীর স্থান হচ্ছে মেঝেতে। সুগন্ধ্যা নদীতে লঞ্চে আগুনে পোড়া রোগী শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি হলে এমন দুর্ভোগের চিত্র নজরে পড়ে সবার।
কিন্তু হাসপাতালের ফ্লোরে ফ্লোরে থাকা এমন শতশত নানা ধরনের রোগীর চিকিৎসাসেবার ভাগ্যে পরিবর্তন আসেনি। শেবাচিম হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ তথ্য স্বীকার করে বলেছেন, হাসপাতালটির এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা অবকাঠামো সংকট। ধারন ক্ষমতার তিন গুন রোগী দৈনিক শেবাচিম হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছে।
শেবাচিম হাসপাতালের প্রশাসনিক শাখা সুত্রে জানা গেছে, ৫০০ শয্যার হাসপাতালকে মুখে মুখে ১০০০ শয্যা করা হয়েছে। সেখানে রোগী থাকে দৈনিক ১৫০০ থেকে ২০০০ পর্যন্ত। এদের একটি বড় অংশ বেড না পেয়ে হাসপাতালের বারান্দায় মেঝেতে চিকিৎসা সেবা নেয়।
হাসপাতালের তৃতীয় তলার প্রসূতি ওয়ার্ডের রোগীদের একটি বড় অংশের শুরুর ঠিকানা হয় বারান্দায় মেঝেতে। এরপর ওই বরান্দায়ই বেছানো কিছু বেডে স্থান পান তারা। প্রসূতি ওয়ার্ডে বেড পেতে তদবির কিংবা ভাগ্য থাকতে হয় এমনটাই জানান সেখানকার একাধীক রোগী ও স্বজন। শনিবার প্রসুতি ওয়ার্ডে ঘুরে বারান্দায় থাকা নারীদের নিদারুন কস্টের চিত্র দেখা গেছে। বেড না পেয়ে মেঝেতেই অনেকে ঘরবাড়ি গড়ে তুলেছে।
বাকেরগঞ্জ থেকে আসা এক রোগীর স্বামী আ: রহমান বলেন, প্রথম বাবা হয়েছেন তিনি। কিন্তু সন্তান ও মায়ের বেডে স্থান হয়নি। সদর উপজেলার চরবাড়িয়া থেকে আসা অপর এক রোগীর স্বজন কামাল হোসেন জানান, ওয়ার্ডের মধ্যের মধ্য বাহিরে সেবা হয় না। তাছাড়া রাতে শীতে কুকরে থাকতে হয়।
প্রসুতি ওয়ার্ডের একাধিক নার্স নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রোগীর চাপের অপেক্ষা বেডের সংখ্যা কম। এ ওয়ার্ডে দৈনিক ১৭০-১৮০ রোগী সেবা নেয়। এর মধ্যে ৪০ থেকে ৫০জনের স্থান হয় বারান্দায়। করোনাকালীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বারান্দায় অস্থাযী বেড স্থাপন করে।
হাসপাতালের ৪র্থ তলার মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডে ৪টি ইউনিট রয়েছে। যেখানে সর্বোচ্চ ৪০০ রোগী দৈনিক চিকিৎসা সেবা নেয়। এর মধ্যে বেড রয়েছে ৬০টি। বারান্দায় মেঝেতে থাকছে ১০০ থেকে ১৫০জন।
একই অবস্থা ৩ তলার ৯ নং ওয়ার্ডের মহিলা সার্জারী, দ্বিতয় তলার শিশু ওয়ার্ড এবং ৫ তলার পুরুষ সার্জারী ওয়ার্ডে। এসব ওয়ার্ডে কখনও রোগী বারান্দায় আবার কখনও বারান্দা থেকে ওয়ার্ডে ঢুকলেও ঠাই হয় মেঝেতে।
৫০০ শয্যার নতুন করোনা ভবনে কোন কোন ওয়ার্ডকে স্থান দিলে দুর্ভোগ কমবে বলে নার্সরা মনে করেন। এছাড়া ৩টি পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডের একটি ছেড়ে দিলে নারী মেডিসিন ওয়ার্ড দুটি হবে। তাতে রোগীর ভোগান্তি কমতে পারে বলে ওইসব ওয়ার্ডের স্টাফরা জানান।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) এর বরিশাল জেলা সভাপতি অধ্যাপক শাহ সাজেদা বলেন, অগ্নিদগ্ধ রোগীর মত বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলেই শেবাচিম হাসপাতালের বেহাল স্বাস্থ্য সেবার কথা সবার নে পড়ে। কিন্তু দিনে পর দিন রোগীদের যে বেড দেয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে না তা দেখা কেউ নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেই এ দুরবস্থা আর সংকট কাটিয়ে রোগীর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
এব্যপারে শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার আগে এ হাসপাতাল নির্মিত হয়। তখনকার জনসংখ্যার বিবেচনায় হাসপাতালের ভবন ও জনবল কাঠামো করা হয়েছিল। সেটা দিয়ে এখনও চলছে। ফলে সংকট এখানে নিয়মিত ঘটনা। সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে হাসপাতালের ভবন সংকট। নতুন ভবন নির্মান করা গেলে রোগী ও দর্শনার্থীদের স্থানের সংকট দুর হবে বলে মনে করেন পরিচালক ডা: সাইফুল।
