সৈয়দ জুয়েল:
বুধবার রাতে ফেসবুক লাইভে এসে আবু মহসিন খান(৫৮) নামের এক লোক নিজের লাইসেন্সকৃত পিস্তল দিয়ে-নিজ মাথায় গুলি করে নির্মম ভাবে আত্মহত্যা করলেন। ঘটনার ক’মিনিটেই দ্রুত সামাজিক জোগাজোগের মাধ্যমে লাইভটি ছড়িয়ে পরে দেশ বিদেশে। পরিবার ও সমাজের নানা ব্যাক্তির কাছ থেকে প্রতারিত হয়ে বিষাদ,হতাশায় ডুবে থাকা এ মানুষটির মৃত্যু নাড়া দিয়েছে জাতির বিবেকবান মানুষদের।
মাত্র আটান্ন বছরে নিজ পরিশ্রমে গাড়ী, বাড়ী, অর্থ, পরিবার সব কিছুই তো ছিলো তার। তাহলে কেন আত্মহননের পথকেই বেছে নিলেন তিনি! একটি স্বর্নালী সময় ছিলো, যখন একান্নবর্তী পরিবার ছিলো। একে অপরের মাঝে সুখ, দুঃখ, কষ্ট ভাগাভাগি করার মাধ্যমে জীবন নিয়ে নানা পরিকল্পনা সাজাতে পারতেন তারা। একাকীত্বের অসুখটা তখনো অপরিচিত ছিলো পরিবারের সদস্যদের মাঝে। কিন্তু এখন চিত্র ভিন্ন।
পান থেকে চুন খসলেই আলাদা হয়ে যাচ্ছে সবাই। একে অপরের মাঝে ত্যাগ, ভালবাসা এখন গৌন। মূখ্য হয়ে উঠেছে একাকী বাসের। আর এতে করে দূরত্ব বাড়তে বাড়তে পরিবারের বন্ধনগুলো এখন দূরবীন দিয়ে দেখলেও, তা বড়ই ঝাপস।
জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে অনেক সন্তানরা প্রবাসে থাকলেও বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির আধুনিকায়নে ভিডিও কলে সার্বক্ষণিক জোগাজোগ রাখা অনেক সহজ। কিন্তু ব্যাস্ততার খোড়া যুক্তি দিয়ে অনেক সন্তানরা তাদের বাবা মার সাথে সে জোগাজোগটাও রাখতে ব্যার্থ হচ্ছে। আবার দেশে যে সকল সন্তানরা থাকেন,তাদের মাঝেও এ প্রবনতা বেশ। নিজেকে নিয়ে ব্যাস্ত থাকা সন্তানগুলো এক সময় শারীরিক শক্তি হারিয়ে বাবাদের বয়সে এসে অসহায়ত্ব ভর করবে তাদের মাঝেও। ছুটে চলা ব্যাস্ত পা যখন খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলবে, তখন কারো সহায্য নিতে মরিয়া থাকলেও কেউ কি হাত বাড়াবে তার জন্য?
আগামী দশ, বিশ বছর পরে আমাদের সমাজ ব্যাবস্থা কোনদিকে যাবে! যেখানে একজন মহসিন খান যে ফ্লাটে ১৫ মিনিট ধরে লাইভে এসে আত্মহত্যার ঘোষনা দিলো, সে আধুনিক ফ্লাটের আধুনিক মানুষরা এগিয়ে আসলোনা, সেখানে আমাদের মূল্যবোধ,দায়িত্ববোধ কোথায় এসে ঠেকছে অনুমেয়। পরিবারের সদস্যরাও একটু চেষ্টা করলোনা এ মানুষটিকে বাঁচাতে! সুস্থ জীবন গঠনে পরিবারের সাথে সু-সম্পর্ক জরুরী।
এক জীবনে একজন মানুষের কতইবা অর্থের প্রয়োজন! অর্থের পিছনে অতি মাত্রায় ছুটে চলা পাগলা ঘোরা-সমাজের সবুজ বন্ধনগুলোয় এখন কীটনাশক পরে গেছে। জীবনের রং,স্বাদ,গন্ধ সবই এখন হুমকির মুখে। জন্মের পরে শিশুটি যার হাত ধরে হাঁটতে শিখেছে,সেই বাবাদের পড়ন্ত বয়সের কাঁপা হাতটি কেন ধরবেনা সন্তানেরা!
সমাজের প্রায় প্রতিটি জায়গায় অচেনা এক মরীচিকার বাস। ছুটে চলার ব্যাস্ততা সবার মাঝে। সম্পর্ক গুলোও এখন কৃতিমত্তায় মাখামাখি। এ থেকে উত্তরন কঠিন নয়,দরকার শুধু আলোর কিছু মনের। একা সুখী থাকার মাঝে পূর্নতা নেই,এ সহজ উপলব্ধিই মিলতে পারে সুস্থ সমাজের। আর যদি সেই আলোর মানুষের দেখা না পাই আমরা,তাহলে সমাজের মাঝে আবু মহসিনের মত আত্মহত্যার সংখ্যা শুধু বেড়েই চলবে।
ভালবাসার দরজা খুলে রেখে আমাদের মাঝে সামজিক সুস্থতায় বেড়ে উঠুক আমাদের ও পরবর্তী প্রজন্ম। আত্মহত্যার খবর নয় আত্মশুদ্ধির খবর হোক প্রতিদিন।
