খান রফিক:
নগর ঘেষা কীর্তনখোলা নদীর দুই তীরই জনবসতিপূর্ন। বিশেষ করে চরমোনাই থেকে বরিশাল নৌবন্দর পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার কীর্তনখোলার চ্যানেল সরু। কিন্তু এ রুটে যেন দুর্ঘটনা লেগেই আছে। কীর্তনখোলা তীরের মানুষের মতে, গ্রীন লাইনের তীব্র গতিতে ঢেউ আছড়ে পড়ছে নদী তীরে। এতে ভাঙছে তীর, ঢেউয়ে উল্টে যাচ্ছে যাত্রীবাহী ট্রলার কিংবা জেলে নৌকা। কয়েকটি বিলাসবহুল লঞ্চও বেপরোয়া গতিতে ছোটায় এ রুটে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশংকা করছেন সংশ্লিস্টরা। সাধারনত সরু চ্যানেল ও জনবসতীপূর্ন নদী তীরে ৬ নটিক্যালে জাহাজ চলাচলের নিয়ম থাকলেও গ্রীন লাইনসহ বড় জাহাজ কীর্তনখোলায় চলছে প্রায় ১০ নটিক্যাল গতিতে। যদিও বিআইডব্লিটিএ কীর্তনখোলা নদীর জনবসতিপূর্ন এ চ্যানেলে নৌযানের গতি নিয়ন্ত্রনে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
রোববার দুপুরে কীর্তনখোলা নদীতে এমভি গ্রীনলাইন-৩ এর ঢেউয়ের তোরে একটি ট্রলার ডুবে গেলে প্রায় ৩০জন যাত্রীকে দেখা গেছে নদীতে হাবুডুবু খেতে। নগরীর পলাশপুরের মোহাম্মদপুর এলাকা সংলগ্ন কীর্তনখোলা নদীর মাঝে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ট্রলারের একাধিক যাত্রী জানান, গ্রীন লাইনের গতি এতো বেশি ছেল যে ট্রলারটি ঢেউয়ের চাপে ডুবে যায়।
জানতে চাইলে এমভি গ্রীন লাইন-৩ এর মাস্টার নুরুল ইসলাম বলেন, চরমোনাই থেকে বরিশাল বন্দর পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটারে তারা অনেকটা ভাসতে ভাসতে বরিশাল পৌছান। কীর্তনখোলায় পড়লে জাহাজ ৪-৫ নটিক্যাল গতি নামিয়ে আনেন। তবে মেঘনায় তারা চালান ১৫-১৬ নটিক্যাল গতিতে। তিনি দাবী করেন, রোবার যে ট্রলটি ডুবে গেছে তাতে যাত্রী ছিল অতিরিক্ত। যাত্রীবাহি ট্রলার, জেলে নৌকা নিরাপদে না চললে কি করার আছে। মাস্টার নুরু বলেন, গ্রীন লাইনে ডেউ বেশি এটা লোকে বলবেই। তাদের জাহাজে একটু তো বেশি ডেউ আছেই। গ্রীন লাইনের ডেউয়ে নদী ভাঙন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা পদ্মা মেঘনায় চললে কি নদী তীর ভাঙে? জেলে নৌকা দুর্ঘটনায় পড়া প্রসঙ্গে বলেন, জাহাজ থেকে দুরে থাকলে এমনটা হয় না।
তবে এমভি সুন্দরবন লঞ্চের মাস্টার মজিবর রহমান বলেন, বিআইডব্লিউটিএ’র নির্দেশনা অনুযায়ী কীর্তনখোলা নদীর মত জনবসতিপূর্ন ও সরু চ্যানেল যেখানে জেলে নৌকা, ট্রলার বেশি সেখানে ৬ নটিক্যালের মধ্যে জাহাজের গতি থাকতে হবে। চরমোনাই থেকে বরিশাল বন্দর পর্যন্ত কীর্তনখোলার ১২ কিলোমিটার পৌছাতে লঞ্চের সময় লাগে ৪৫ মিনিট। জনবসতি নদী তীরবর্তী হওয়ায় তারা এ পথে ৬ থেকে ৭ নটিক্যাল গতিতে জাহাজ চালান। আর মেঘনায় চালান ১০ থেকে ১৪ নটিক্যাল পর্যন্ত। তবে এ চ্যানেলে মানামী, এডভেঞ্চার লঞ্চ অনেক সময় ৯ নটিক্যাল গতিতেও চলে। কিন্তু তাদের পর্যবেক্ষন অনুযায়ী গ্রীন লাইন কীর্তনখোলায় ৯ থেকে সাড়ে ১০ নটিক্যাল গতিতে জাহাজ চালায়। যেকারনে তারা চরোমানাই থেকে বরিশাল বন্দরে মাত্র ২০-২৫ মিনিটে পৌছায়।
এতে তীব্র ঢেউয়ে কীর্তনখোলা নদীর চরকাউয়া থেকে সাহেবের হাট খাল, বেলতলা, ইটাখোলা, চরবাড়িয়া টাওয়ার, মৃধাবাড়ি, লামছড়ি, চরমোনাই মাদ্রাসা এলাকা ভাঙছে। আবার ট্রলার, নৌকা ডুবির ঘটনাও ঘটছে বলে জানান মাস্টার মজিবর।

জানা গেছে, ২০১৭ সালের ২৩ এপ্রিল বরিশাল থেকে গ্রীন লাইন-২ কীর্তনখোলার চরবাড়িয়া পয়েন্ট অতিক্রমকালে কার্গোর সঙ্গে সংঘর্ষে গ্রীন লাইনও ডুবতে ডুবতে তীরে পৌছায়। ২০১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর গ্রীন লাইন-৩ তীব্র গতিতে চলায় জাহাজটির ঢেউয়ের ঝাপটায় নীচতলার সামনের গ্লাস ভেঙ্গে যাত্রীদের ওপর আছরে পড়ে। ওই ঘটনায় গ্রীন লাইন-৩ এর যাত্রা বাতিল হয়েছিল।
কীর্তনখোলা সংলগ্ন চরমোনাই ইউপি চেয়ারম্যান সৈয়দ জিয়াউল করিম আজকের পত্রিকাকে বলেন, গ্রীন লাইনের ডেউয়ে চরমোনাইর বড় অংশ কঠিন ভাঙনের সম্মুখীন হয়েছে। ডেউয়ে প্রায়সই কীতনখোলায় মাছ ধরা নৌকা উল্টে যায়। রোববার মোহাম্মদপুর ট্রলার ডুবির পাশাপাশি চরমোনাই মাদ্রাসা সংলগ্নও নৌকা ডুবির ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, গ্রীন লাইন বন্ধ নয় বরং এসব বড় জাহাজকে জনবসতিপুর্ন এলাকায় গতি নিয়ন্ত্রন করে চলা দরকার।
বরিশাল বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যাবস্থাপনা বিভাগের উপ পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গ্রীন লাইন-৩ এর ঢেউয়ে রোববার ট্রলার ডুবেছিল। জাহাজটির যাত্রাও একবল বাতিল করেছেন। তারা নৌযানের গতি বরিশালে নিয়ন্ত্রন করেননি। তবে কীর্তনখোলায় চলাচলের জন্য গ্রীন লাইনসহ সব বড় জাহাজকে গতি নিয়ন্ত্রনে শিঘ্রই চিঠি দিবেন।
এব্যপারে বরিশাল নৌ যাত্রী ঐক্য পরিষদের আহবায়ক দেওয়ান নীলু বলেন, নৌযান কি গতিতে চলবে তা বিআইডব্লিউটিএ নির্ধারন করে দিবে। গ্রীন লাইনসহ বড় জাহাজের বেপরোয়া গতির কারনে আরও অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে।
