মেঘনার আ’লীগ নেতা মিলন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে নিধন হচ্ছে ইলিশ

Spread the love

নাগরিক রিপোর্ট : বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার পাশ দিয়ে মেঘনা নদীর ২২ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়েছে। তার আশপাশের নদী কালাবদর-তেতুলিয়া-মাসকাটা-আড়িয়াল খাঁ-গজারিয়া মুলত মেঘনার শাখা। এগুলো সবই ইলিশের ষষ্ঠ অভয়াশ্রম। মৌসুমে অপর ৫টি অভয়াশ্রমের চেয়ে প্রজনন মৌসুমে ইলিশের বিচরন বেশী থাকায় ষষ্ঠ অভায়াশ্রম অধিক গুরুত্বপূর্ন।

মা ইলিশের প্রজনন নিরাপদ করতে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় বিগত বছরগুলোর মতো এবারও এসব নদনদীতে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ নিধনের মহোৎসব চলছে। বাঁধা দিতে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর জেলেদের সংঘবদ্ধ হামলা এখন মামুলী ঘটনায় পরিনত হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার ৭ম দিন গত বৃহস্পতিবার উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এ.এম পারভেজের নেতৃত্বে অভিযানকারী দল মেঘনার খালিশপুর পয়েন্টে বেপরোয়া হামলার শিকার হন। প্রতিবছর ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলাকালে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির ঘটলেও কার স্বার্থ রক্ষায় ষষ্ঠ অভয়াশ্রমভূক্ত নদনদী অরক্ষিত রাখা হয়- এনিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। তারা জানিয়েছেন, মেঘনা তীরের ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বররা এসব ঘটনার মুল হোতা। হিজলা নাগরিক পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুল হক দুলাল মেঘনার বর্তমান অবস্থায় নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এদের প্রধান হলেন হিজলা উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক ও হিজলা-গৌরবদী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মিলন। তার টাকা ও ক্ষমতার কাছে প্রশাসন হাত গুটিয়ে নিয়েছে।

জানা গেছে, এবার নিষেধাজ্ঞার দ্বিতীয় দিন থেকেই মেঘনা ও তার শাখা নদী জেলেদের দখলে রয়েছে। নিষিদ্ধ ইলিশ বিক্রিতে করতে হয়না লুকোচুরি। নদীতীরে বাজার বসিয়ে ইলিশের পাইকারী বেচাকেনা হয়। পরিবহনও হয় নির্ভিঘেœ। এসব নিয়ন্ত্রনে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মৎস্য অধিদপ্তরের মাঠ কর্মকর্তারা যে দায়িত্ব পালন করছেন তা পুরোটাই প্রশ্নবিদ্ধ।

মৎস্য অধিদপ্তর সুত্রে জানা গেছে, ২২ দিন বিশেষ দায়িত্ব পালনে অন্য বিভাগের ১৮ কর্মকর্তাকে বরিশাল বিভাগের ১৮ উপজেলায় পদায়ন করা হয়েছে। তারমধ্যে সর্বাধিক্য ঝুকিপূর্ন হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় কাউকে রাখা হয়নি।

এবার ষষ্ঠ অভয়াশ্রমের নদনদীতে পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রনের বাইরে যে মৎস্য অধিদপ্তরের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) সমকালের কাছে হতাশা প্রকাশ করে বলেন- “আমরা এখানে চাকুরী করতে এসেছি, একদিন চলে যাবো, আপনারা বরিশালের মানুষ আপনাদের ইলিশসম্পদ বাঁচান’।

কেন এই পরিস্থিতি : একাধিক মৎস্যজীবী সংগঠক ও সচেতনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২২ দিনের জন্য স্থানীয় প্রভাবশালী মৎস্য ব্যবসায়ীরা অসাধু মাঠ কর্মকর্তাদের জন্য বড় অংকের বিনিয়োগ করেন। যে কারনে এবার নিষেধাজ্ঞার শুরুতেই নদী প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের জেলেদের দখলে চলে যায়। অ্যাডভোকেট মাহবুবুল হক দুলাল বলেন, লোকদেখানো অভিযানে জব্দ করা জাল পূনরায় চড়া দামে একই জেলের কাছে বিক্রি ও বড় ইলিশ গায়েব করে ছোট ইলিশ বিতরনসহ নানা বানিজ্যে করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মৎস্য অধিদপ্তরসহ প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের অসাধু কর্মকর্তারা। তিনি বলেন, জেলেদের জালের সঙ্গে নৌকা জব্দ ও নিষেধাজ্ঞা শেষে ফেরত দেয়ার আইন করা হলে এই বানিজ্য বন্ধ হতো।

হিজলা-মেহেন্দিদঞ্জের দায়িত্বশীল একাধিকজন জানিয়েছেন, দুই উপজেলার প্রায় সকল চেয়ারম্যান-মেম্বর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাছ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তবে এদের প্রধান হলেন চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মিলন। বহুবছর যাবত মেঘনার দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রন করছেন তিনি। কমপক্ষে ২২টি মাছঘাটের মালিক। মেঘনায় সব অঘটনের নেপথ্যে এসব জনপ্রতিনিধিরা। তবে তারা ধরাছোয়ার বাইরে থাকেন। এবারের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে তাদের প্রতিনিধি হয়ে মেঘনা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন- তাহের বেপারী, জাহাঙ্গীর সরদার, বাক্কু বেপারী, জাকির মাঝি, ইউনুস সিকদার, কালাম সরদার, জসিম সরদার ও লিটন রাঢ়ীসহ কয়েকজন।

ইলিশ নিধনের যত কৌশল : স্থানীয় বিভিন্ন সুত্র নিশ্চিত করেছে, চলমান নিষেধাজ্ঞায় ইলিশ নিধনে সবকিছু নিয়ন্ত্রন করছেন তাহের ব্যাপারী। তিনি চেয়ারম্যান মিলনের খালিশপুর মাছঘাটের সরকার। প্রশাসন ম্যানেজের জন্য নৌকা প্রতি ২-৩ হাজার করে নেয়া হয়। প্রশাসন অভিযানে গেলে হামলার জন্য নৌকায় মজুদ রাখা হয় লাঠিসোটা ও ইট-পাথর। জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাহের বেপারী ও চেয়ারম্যান মিলনের ছেলে মাহিবের নেতৃত্বে দুটি স্পীডবোট সর্বক্ষনিক মেঘনায় টহল দেয়। নিধন করা ইলিশ দ্রুত পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয় আরও কয়েকটি স্পীডবোট। মেঘনার আরেকটি অংশ নিয়ন্ত্রন করছেন মেহেন্দিগঞ্জে উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক উত্তর উলানিয়া চেয়ারম্যান জামাল হোসেন মোল্লা। জেলেদের কাছ থেকে ক্রয়ের পর রাতে নৌপথে শরীয়তপুর ও বরিশাল সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদে নিয়ে আসা হয় ইলিশ। সেখান থেকে বিক্রির জন্য পাচার হয় সড়কপথে। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় ধাপে ধাপে প্রশাসন ম্যানেজ করে।

অভিযোগের বিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মিলন সাংবাদিকদের বলেন, নিষেধাজ্ঞায় ইলিশ নিধনে তিনি জড়িত নন। তাহের ব্যাপারীকে অনেক আগে তিনি মাছঘাট থেকে বাদ দিয়েছেন। সবক্ষেত্রে তার নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। মেঘনায় ইলিশ নিধন বন্ধে জনপ্রতিনিধি হিসাবে কি দায়িত্ব পালন করেছেন জানতে চাইলে মিলন বলেন, গতকাল মঙ্গলবার সভা করে মেম্বরদের বলে দিয়েছেন তাদের কোন অপকর্মের দায় তিনি নেবেন না।

প্রশ্নবিদ্ধ অভিযান : মাঠ পর্যায়ের একাধিক জেলে সংগঠক জানান নদীতে ভাটার সময় জাল ফেললে বেশী মাছ পাওয়া যায়। তখন শত শত জেলে নৌকা নদীতে নেমে পড়ে। জোয়ার এলে তারা আস্তানায় ফিরে যান। তখনই অভিযানকারী দল নদী গিয়ে সাফল্য দেখাতে ফেসবুকে লাইভ করে প্রচার করেন- নদীতে জেলে নেই, নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে পালিত হচ্ছে। এসব বিষয় জানিয়ে হিজলা প্রেস ক্লাব সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘জেলেরা যখন নদীতে তখন প্রশাসন থাকে বিশ্রামে। আবার জেলেরা বিশ্রামে গেলে প্রশাসন দায়িত্ব পালনে তৎপর হয়।

হিজলার বড়জালিয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও জাতীয় ক্ষুদ্র জেলে সমিতির উপজেলা শাখার সভাপতি এনায়েত হোসেন বলেন, ‘কারা ইলিশ নিধন ও অভিযানকারী দলের ওপর হামলায় জেলেদের কারা ইন্ধন দিচ্ছে সবই প্রশাসন জানে। অজ্ঞাত কারনে ব্যবস্থা নেয়না। বলেন, গতবছরের অভিজ্ঞতায় এবার আমরা প্রস্ততি সভায় প্রশাসনকে আগাম সতর্ক হওয়ার তাগিদও দিয়েছিলাম।

জাতীয় ক্ষুদ্র জেলে সমিতির কেন্দ্রীয় সাধারন সম্পাদক আনোয়ার হোসেন সিকদারের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে প্রশাসন জেলে সংগঠকদের এড়িয়ে চলেন। প্রভাবশালী মাছ ব্যবসায়ীদের নিয়ে মিটিং করেন। নদী পাহাড়ায় জনপ্রতিনিধিদের দেয়া ফিসগার্ড নিয়োগ দেয়া হয়। এখন কেথায় সেই ফিসগার্ড? আনোয়ার সিকদার বলেন, দুই উপজেলার প্রায় সব চেয়ারম্যান-মেম্বর মাছঘাটের মালিক। তারা এসব ঘটনার দায় এড়াতে পারেন না। জেলেরা প্রশাসনের একপক্ষকে টাকা দিয়ে নদীতে নামে। টাকা না পাওয়া আরেকপক্ষ অভিযানে গিয়ে জেলেদের ক্ষুদ্ধ হামলার মুখে পড়েন।
জাতীয়জীবী সমিতির যুগ্ন মহাসচিব ও হিজলা উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি ইকবাল হোসেন মাতুব্বর সমকালকে বলেন, অরাজকতা ঠেকাতে গতবছরই ২২ দিন ষষ্ঠ অভয়াশ্রমের জন্য একজন নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট নিয়োগের দাবী তোলা হয়েছিল। কার স্বার্থ রক্ষায় এখানে অতিরিক্ত জনবলও না দেয়া হয়না তা উর্ধ্বতন মহলের খতিয়ে দেখা উচিত।

বরিশালের জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার বলেন, ষষ্ঠ অভয়াশ্রমে ইলিশ নিধন বন্ধে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। মানুষের মানসিতার পরিবর্তন না হলে আইন প্রয়োগ করে সব করা যাচ্ছেনা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সামনে সহযোগীতার ভাব দেখালেও পেছনে অসহযোগীতা করলে প্রশাসন তখন অসহায় হয়ে পড়ে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে গত ৭দিন যাবত দুজন নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট দুই উপজেলায় কাজ করে যাচ্ছেন।

মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় উপ পরিচালক আনিছুর রহমান তালুকদার বলেন, নিষেধাজ্ঞা চলাকালে নদীতীরের জনগন, জেলে ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা আমাদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি বলেন, মৎস্য বিভাগের নিজস্ব জলযান নেই। আছে জনবলের সংকট। এজন্য তাদেরকে বিভিন্ন দপ্তরের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। সমম্বয়হীনতার কারনে কিছু অনিয়ম হতে পারে।##

২ Comments

  1. Can you be more specific about the content of your article? After reading it, I still have some doubts. Hope you can help me.

  2. Thank you for your sharing. I am worried that I lack creative ideas. It is your article that makes me full of hope. Thank you. But, I have a question, can you help me?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *