নাগরিক রিপোর্ট
বরিশাল শের-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় হাসপাতালে (শেবাচিম) আন্দোলনকারীদের গন অনশন দমাতে বৃহস্পতিবার হঠাৎ মাঠে নামে হাসপাতালের কয়েকশ কর্মচারী। তারা সকালে চিকিৎসক ও নার্সদের নিয়ে নিরাপদ কর্ম পরিবেশের দাবীতে মানববন্ধন করেন। এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে কর্মচারীরা। বেলা ১২টার দিকে স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার দাবীতে হাসপাতালে অনশনরতদের উপর হঠাৎ চড়াও হয় তারা। এসময় কয়েকজন আন্দোলনকারীকে বেধরক মারধর করা হয়। এতে হাসপাতালে রোগীর সেবা চরমভাবে ব্যাহত হয়। এদিকে কর্মচারীদের তোপের মুখে অনশনকারীসহ আন্দোলনকারীরা সটকে পড়েন। বিকেলে আন্দোলনকারীরা সংবাদ সম্মেলন করে এর প্রতিবাদ জানান, তবে কোন কর্মসুচী দেননি। অপরদিকে আন্দোলনকারী ছাত্রজনতাও বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।
স্বাস্থ্যখাত সংস্কারের দাবীতে ৩ দফার আন্দোলন ছাত্র-জনতার ব্যানারে শুরু হয় গত ২৮ জুলাই। প্রতিদিন ৬ থেকে ৭ ঘন্টা নগরের নথূল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়ক অবরোধ করা হয়। এতে বিভাগের ছয় জেলার সঙ্গে রাজাধনীর সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। বুধবার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে শ্রমিকরা হামলা করলে বৃহস্পতিবার থেকে শেবাচিম হাসপাতালে গন অনশনের ঘোষনা দেন। এর আগে বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডাঃ মোঃ আবু জাফর বরিশালে গিয়ে অনশন ভাঙ্গা ও আন্দোলন বন্ধের আহ্বান জানালে তা প্রত্যাখান করা হয়।
এদিকে বৃহস্পতিবার সকালেই পরিস্থিতি বদলে যায়। চিকিৎসক-নার্সসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেলা ১১টায় হাসপাতাল চত্বরে মানববন্ধন কর্মসূচীর ঘোষণা দেন। হাসপাতালের কর্মচারীরা বিক্ষুব্দ হয়ে উঠে।
প্রত্যক্ষদশীরা জানান, বৃহস্পতিবার কর্মচারীদের উত্তপ্ত পরিস্থিতি দেখে ৩জন অনশনকারী ও আন্দোলনকারী সঙ্গীরা দ্রুত হাসপাতাল এলাকা ছেড়ে চলে যান। এরমধ্যে ছড়িয়ে পড়ে যে নতুন মেডিসিন ভবনে কয়েকজন আউট সোর্সিং কর্মচারীকে আন্দোলনকারীরা মারধর করেছে। এখবরে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। কর্মচারীরা হাসপাতাল ভবনের বাইরে এসে বিক্ষোভ করতে থাকেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা কর্মস্থলে ফিরবেন না বলে জানান। একপর্যায়ে তারা লাঠিসোটা নিয়ে মিছিল করেন।
বিক্ষোভকারী কর্মচারীরা ছাত্রজনতার সংগঠকদের নাম ধরে খুঁজতে থাকেন ও তাদের বিরুদ্ধে শ্লোগান দেন। আন্দোলনকারী সন্দেহে কয়েকজনকে বেদম মারধর করা হয়। আন্দোলনের মুখ্য সমন্বয়ক মহিউদ্দিন রনিকে উদ্দেশ্য করে ‘হইহই রইরই, রনি তুই গেলি কই। রনির দুই গালে জুতা মারো তালে তালে’ এমন শ্লোগান দেয়া হয়।
হাসপাতালের আউট সোর্সিং কর্মচারী সেলিনা আক্তার তার ওড়না ছেড়া দেখিয়ে জানান, ছাত্ররা মেডিসিন ভবনে ঢুকে কর্মচারীদের মারধর করছিলো। তিনি উদ্ধারে গেলে তাকেও মারধর করা হয়। হাসপাতালের টেকনোলজিষ্ট অ্যাসোশিয়েশনের জেলা সভাপতি হাসান মাহমুদ বলেন, ‘আমরাও হাসপাতালের সংস্কার চাই। তাতে সময় লাগবে। যারা আন্দোলন করছে তারা ছাত্র নয়, চাঁদাবাজ। তাদের উস্কানীতে রোগীর স্বজনরাও এখন হাসপাতালের কর্মচারীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছে।
শিক্ষানবীশ চিকিৎসক সৌমিক আহমেদ জানান, তারাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সন্ধার পর তারাও ধর্মঘটের মতো কঠিন কর্মসূচীতে যেতে পারেন। এদিকে কর্মচারীদের বিক্ষোভের কারনে শেবাচিম হাসপাতালের চিকিৎসা মারাত্নক ব্যাহত হয়েছে।

আঃ রহমান নামক এক স্বজন জানান, তার ৩ দিন বয়সী শিশু সন্তানকে গত সোমবার স্কানু ওয়ার্ডে ভর্তি করেছেন। এতদিন ভালো সেবা পাচ্ছিলেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে আন্দোলন শুরুর পর ওয়ার্ডে সেবিকা-কর্মচারী কাউকে পাচ্ছেন না। আরেক স্বজন রুবিনা খানম জানান, তার ছেলে সার্জারী- বিভাগে ভর্তি। বৃহস্পতিবার তার ছেলের পায়ে অস্ত্রপচার করার নির্ধারিত তারিখ ছিলো। আন্দোলনের কারনে পরিবর্তন করে আগামী রোববার পরবর্তি দিন ধার্য করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কর্মচারীদের আন্দোলনে হাসপাতালের আন্তঃবিভাগেও চিকিৎসা ব্যাহত হয়।
জানতে চাইলে শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মশিউল মুনীম বলেন, ‘কর্মচারীদের আন্দোলনে স্বাস্থ্যসেবা কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে। তারপরও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। চিকিৎসক-নার্সরা সকলে দায়িত্বে আছেন’।
দিনভর শেবাচিম হাসপাতালে অরাজক পরিস্থতিতে আইনশৃংখলা বাহিনীর তেমন কোন ভুমিকা দেখা যায়নি। ঘটনাস্থলে মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর টহল টিম দেখা গেছে।
