সৈয়দ জুয়েল ॥ কথাগুলি আবরার ফাহাদের, মৃত্যুর কিছুদিন আগেও তার বন্ধুদেরকে তার সরল উক্তিতে জানান দেয় তার সরলতার আকাশ কতটা প্রসস্থ ছিল। বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের ২য় বর্ষের ১৭ তম ব্যাচের এই মেধাবী তরুনকে শিবির সন্দেহে দুই দফায় স্টাম্প দিয়ে পিটিয়ে নির্মম ভাবে হত্যা করে বুয়েট শাখার ছাত্রলীগ ক্যাডাররা। ৩২ জিবি’র ভিডিও ফুটেজে ৬ ছাত্রকে সনাক্ত করা হয়েছে। স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টির জন্য আমরা যখন রাজপথে মানববন্ধন করি, তখন এসব অনাকাঙ্খিত মৃত্যু পুরো জাতিকে ভাবিয়ে তুলে।
রাজনীতির যাঁতাকলে পরে এরকম কত আবরারের জীবন চলে গেলে! রক্তের এ হলিখেলা বন্ধ হবে কবে, জাতির সামনে এ এক কঠিন প্রশ্ন। স্বাভাবিক মৃত্যু সাধারন মানুষের অধিকার, করুনা নয়। বুয়েটের এ মেধাবী ছাত্র হত্যায় জাতির যে ক্ষতি হল, তা ভাববার বিষয়। কিন্তু যদের সন্তান সেই বাবা, মা এই শোক কাটিয়ে আদৌ তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবে?
এই বাবা, মায়ের নিশ্চুপ চোখের জলের প্রতিটি ফোঁটায় যে কস্টের তীব্রতার দীর্ঘশ্বাস, তার দায়ভার পুরো জাতির, গুটি কয়েক নস্ট রাজনীতিকের পাপের ফসলের দায় সাধারন মানুষ কেন নিবে, এমন প্রশ্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে। দশ মাস একটি সন্তান যখন মায়ের পেটে থাকেন, তখন মা নিজে না ঘুমিয়ে সন্তানের নিরাপত্তার জন্য জেগে থাকেন। পেটের ঐ ছোট্ট জায়গায় সন্তান হাত, পা ছুঁড়ে, মা ব্যাথায় ছটফট করে। ভূমিষ্ঠের সময় জীবন মরনের মাঝে দাঁড়িয়ে সন্তান যখন পৃথিবীতে আসলো তৃপ্তির হাসিতে দশমাসের কস্ট ভূলে যায়।
যখন সন্তানটি পড়ালেখা করে উন্নতির চরম শিখরে উঠে, তখন সে বাবা-মায়ের থাকেনা, তখন তা পুরো রাস্ট্রের। মা যেমন তার সন্তানকে নিরাপত্তা দিতে পেরেছেন, নিজের জীবন বাজি রেখে, ঠিক তেমনি রাস্ট্রেরও কাঁধে বর্তায় ওই ছেলেটির নিরাপত্তা দিতে। রাস্ট্র যখন সাধারনের নিরাপত্তা ও জবাবদীহিতার জায়গাগুলো নিশ্চিত করতে পারবে, তখন সাধারন মানুষেরও দেশের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতার জায়গাগুলো শক্তিশালী করতে পারবে। না হলে মেধা পাচার হয়ে মেধাশূন্য জাতি হয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে হবে।
আবরারের ভাই বলেছিলেন- ভাইয়ার ফোনে একাধিকবার কল দিলেও সে ধরেনি। পরে মেসেঞ্জারে নেট আছে দেখে সেখানে ম্যাসেজ দিলেও ভাইয়া ধরেনি। ভাইয়াকে যে ঘাতকদল দুনিয়ার নেটওয়ার্ক থেকে সরিয়ে দিয়েছে, অবুঝ ভাইটি হয়তো বুঝেনি তখন, আমরা আর কারো ভাইয়ের কস্টের আকূতির কান্না শুনতে চাইনা। নীরব চোখের নিস্পলক অবাক চাহনি যেন আমাদের ব্যার্থতার বিদ্রুপ হাসি না হাসে। সুন্দর একটি নাম ছিল তার ‘আবরার’। যার অর্থ-পবিত্র, ভাল। তোমাকে আমরা নিরাপত্তা দিতে ব্যার্থ হয়েছি, ক্ষমা করো আমাদের। হয়তো ভাল মানুষদেরকে ধরে রাখার যোগ্যতা আমাদের এখনো হয়ে ওঠেনি। তোমার নামের অর্থের মতই ওপারে ভাল থেক আবরার ফাহাদ।

