ইলিশ নিধনে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা আজ শেষ : প্রশ্নবিদ্ধ করেছে পুলিশ-জনপ্রতিনিধিরা

Spread the love

নাগরিক রিপোর্ট ॥ ইলিশ নিধনে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা আজ বুধবার মধ্যরাতে শেষ হবে। মা ইলিশের প্রজনন নিরাপদ করতে গত ৮ অক্টোবর মধ্যরাতে এ নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছিল। শুরু থেকেই এবার নিষেধাজ্ঞার কার্যকরিতা নানা অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এ সময়ে ইলিশ নিধনের মহাৎসোবের খবর পাওয়া গেছে নদী তীরবর্তী গ্রামগুলোতে। পুলিশ-জনপ্রতিনিধিরাও এ অভিযোগে অভিযুক্ত। তবে মৎস্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলরা বরাবরের মতো এবারও নিষেধাজ্ঞার সফলতা দাবী করেছেন। ব্যর্থতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলতেই তারা জনবল সংকটকে অজুহাত দেখিয়েছেন।
মৎস্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নিষেধাজ্ঞা অমান্যের প্রবানতার ব্যপকতা স্বীকার না করলেও তাদের দেয়া তথ্যেই এর সত্যতা মিলেছে। বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিপদÍরের দেয়া তথ্যানুযায়ী গত ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত বরিশাল বিভাগে নিষেধাজ্ঞা অমান্যের অভিযোগে ১১৬৫ জনকে কারাদন্ড দেয়া হয়। গতবছর ২২ দিনে কারাদন্ড দেয়া হয়েছিল ৮৬৫ জনকে। অর্থ্যৎ গতবছরের চেয়ে এবার আটকের পর ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে কারাদন্ড দেয়া হয়েছে অনেক বেশী। গত সোমবার রাতে বাকেরগঞ্জ উপজেলা বিষখালী নদীতে ইলিশ ধরতে গিয়ে পুলিশের ধাওয়ায় নদীতে পড়ে যুবলীগ নেতা মজিবর রহমানের সলিল সমাধি হয়েছে। এবার ইলিশ নিধনের অভিযোগে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ২জন উপপরিদর্শক, মেহেন্দিগঞ্জের থানার এক উপপরিদর্শক ও এক কনষ্টবল সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন। একই অভিযোগে বরিশাল জেলাসহ বিভিন্ন জেলায় এবার পুিলশ সদস্য ক্লোজড হয়েছে। মধ্যরাতে জেলের বেশে নদীতে ইলিশ নিধনের সময় পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলা চেয়ারম্যান আবু সাইদ মনুকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন পিরোজপুর জেলা পুলিশ সুপার। নদীতে ধরা পরার পর তারা সকলেই দাবী করেছেন, ইলিশ নিধনকারী জেলেদের ধরতে তারা নদীতে গিয়েছিলেন। মৎস্য কর্মকর্তা (ইলিশ) বিমল চন্দ্র দাস এ প্রসঙ্গে বলেন, নিষেধাজ্ঞাকালীন যেকোন প্রশাসন নদীতে যেতে হলে সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা কিম্বা তার প্রতিনিধি থাকা বাধ্যতামুলক। এর ব্যত্যয় যারা করেছেন তারা অসৎ উদ্দেশ্যেই নদীতে গিয়েছিলেন।
এবার নিষেধাজ্ঞা অমান্যে পুলিশ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যানের মতো দায়িত্বশীল ব্যাক্তিদের জড়িয়ে পড়ার পড়ার বিষয়টি ‘দুঃখ্যজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন চাঁদপুর ইলিশ গবেষনা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিসুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এবার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ নিধনের জন্য একশ্রেনীর মানুষের মধ্যে যুদ্ধে নামার মতো প্রবানতা দেখে গেছে। অভিযানকারী দলের নৌযান নদীর সামনের দিকে এগুচ্ছে, পেছনে গ্রামের লোকজন উৎসবমুখর হয়ে ইলিশ নিধনে নদীতে নেমেছে। নিষেধাজ্ঞার সময়ে পুলিশের বিরুদ্ধে অনিয়মের নানা অভিযোগ আগেও ছিল। এবারে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বিগত বছরের চেয়ে অনেক বেশী’। এবার সাগর ছেড়ে নদীতে মা ইলিশ অনেক বেশী এসেছে বলে এ গবেষক জানান।
ওয়াল্ড ফিশের আওতাধীন ‘ইকোফিস’ প্রকল্পের বরিশালের সহকারী গবেষক বলরাম মহলদার এ প্রসঙ্গে বলেন, আগের বছরগুলোতে কোষ্টগার্ড ও পুলিশ বাহিনী দুটির বিরুদ্ধেই অনিয়মের অভিযোগ ছিল। এবার একচেটিয়া অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞাকে পুরোপুরি ব্যর্থ না বলে এ গবেষক বলেন, ‘সফলতা ও ব্যর্থতা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে’।
গত বৃহস্পতিবার বরিশাল নগরীতে অনুষ্ঠিত এক কর্মশালায় অংশ নিয়ে প্রান্তিক জেলেরা অভিযোগ করেন, নদীতে টহল দেয়ার জন্য পুলিশের ট্রলার ভাড়া করতে হয়না, উল্টো পুলিশের টহলে অংশ নিতে স্থানীয় থানায় একদিনের জন্য ৩ হাজার টাকা দেন ট্রলার মালিক। অভিযান শেষে ইলিশ জব্দ করা ইলিশ নেয় পুলিশ, জব্দ জালের অর্ধেক ট্রলার মালিক নিয়ে অভিযান শেষে একই জেলেদের কাছে বিক্রি করেন।
যে কারনে ব্যর্থ হয় মৎস্য অধিদপ্তর ঃ নদী-সাগরের মাছসহ সকল প্রাণীজ সম্পদ রক্ষা ও প্রজনন বৃদ্ধির দায়িত্ব মৎস্য অধিদপ্তরের। সরকারী এ প্রতিষ্ঠানটি জন্মলগ্ন থেকেই জনবল সংকট ভূগছে। উপজেলায় প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ জনবল কাঠামো ৫ জনের। নিজস্ব জলযান কখনই ছিলনা। ফলে ইলিশ নিধনে ২২ দিনসহ বিভিন্ন সময়ের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে এ প্রতিষ্ঠানটিকে সবসময় জেলা প্রশাসন, পুলিশ, কোষ্টগার্ড ও নৌবাহিনীর ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। মৎস্য অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের এ দূর্বলতার কারনেই প্রতিবছর প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে ২২ দিনসহ অন্যান্য মেয়াদকালীন নিষেধাজ্ঞা। বিশেষ করে এ সময়ে নদী তীরবর্তী থানা ও নৌ পুলিশের সদস্যরা ঘুষ বানিজ্যে নেমে বেপরোয়া হয়ে উঠেন।
তাছাড়া ট্রলার ও ষ্পীডভোট ভাড়া দিয়ে স্থানীয় নদী টহল দেয়া হয়। কিন্ত গভীর সমুদ্রে টহলে যাওয়ার সক্ষম জাহাজ আছে একমাত্র নৌবাহিনীর। প্রতিবারই নিষেধাজ্ঞার সময় গভীর সমুদ্রে ভারতীয় জেলেদের ইলিশ নিধনের অভিযোগ পাওয়া যায়। জলযান না থাকায় মৎস্য অধিদপ্তর সেখানে যেতে পারেনা। এ প্রসঙ্গে চাঁদপুর ইলিশ গবেষনা কেন্দ্রের প্রধান গবেষক ড. আনিছুর রহমান বলেন, জনবল, জলযান এবং অপ্রতুল অর্থ বরাদ্দ, এ তিন সংকটের কারনে মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।##

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *