গণপূর্তের জমিতে আ’লীগের সুরুজ চেয়ারম্যানের মার্কেট

Spread the love

নাগরিক রিপোর্ট ॥ বরিশাল নগরীর উপকন্ঠ চরবাড়িয়া ইউনিয়নের তালতলী বাজারে গণপূর্ত বিভাগের সাড়ে ৯ একর জমি ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে দখল করা হয়েছে। গত কয়েক বছরের সেখানে পর্যায়ক্রমে শতাধিক আধাপাকা স্থাপনা করে নির্মান করা হয়েছে বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। ব্যবসায়ীর কাছে ষ্টল ভাড়া দিয়ে মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করা হচ্ছে। বছরে পর বছর চলা এ দখল প্রক্রিয়াও দেখেও না দেখার ভান করেছেন গণপূর্ত বিভাগের দায়িত্বশীলরা।
অভিযোগ রয়েছে, গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীর যোগাসাজসেই এভাবে বেহাত হয়েছে কোটি কোটি টাকার জমি। এ দখলদারিত্বে শীর্ষে রয়েছেন জেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও চরবাড়িয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মাহতব হোসেন সুরুজ ও ভাই ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সভাপতি গোলাম কবির।
বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মুখে গণপূর্ত বিভাগ বৃহস্পতিবার ৫২ জন দখলদারের একটি তালিকা জেলা প্রশাসককে দিয়েছেন- এমন দাবী করেছেন বরিশাল গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী অলিবার গুদা। তবে গণপূর্ত থেকে এ ধরনের কোন তালিকা না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান। অভিযোগ রয়েছে, দখল উচ্ছেদের মুল কার্যক্রম এড়িয়ে নানা ছলচাতুরী ও লুকোচুরি করছেন নির্বাহী প্রকৌশলী।
আড়িয়াল ও কীর্তণখোলার সংযোগ চ্যানেলটি ‘তালতলী নদী’ নামে পরিচিত। এ নদীর তীরে তালতলী বাজারের অবস্থান। বরিশাল নগরীর প্রাণকেন্দ্র সদর রোড থেকে সড়কপথে তালতলী বাজারের দুরত্ব প্রায় ৬ কিলোমিটার। নদীর তীরেই গণপূর্তের সাড়ে একর জমি।
নির্বাহী প্রকৌশলী অলিবার গুদা বলেন, তালতলী বাজারে আমাদের জমি দখলের বিষয়টি অনেক আগে থেকেই গণপূর্তের উর্ধ্বতন দপ্তরে অবহিত করেছি। দখলদার উচ্ছেদে কোন নির্দেশনা না আসায় উচ্ছেদ করা যায়নি। এখন ৫২ জন দখলদারের তালিকা পাঠানো হয়েছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, সদর উপজেলার চরবাড়িয়া মৌজার ৪১ নং জে এল এর ৩ নং খতিয়ানের(দাগ নং ১৭৭, ১৭৮, ১৮১, ২৪৪, ২৪৫ ও ২৪৬) সাড়ে ৯ একর জমির মালিক গনপূর্ত বিভাগ। তারমধ্যে ১ একরের মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। বাকি ৮ একর অবৈধ দখলদারের আয়ত্বে।


স্থানীয় সুত্রগুলো জানায়, সাড়ে ৯ একেের মধ্যে ৫ একর দখল করেছেন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহাতাব হোসেন সুরুজ। তিনি সেখানে তিনি বালু ভরাট করে মাছ বাজার ও আধাপাকা স্থাপনা করে ভাড়া দিয়েছেন। সেখানে সুরুজের মালিকানায় আছে অর্ধশত দোকান ঘর ও বালুর খলা। লাগোয়া পুকুর ও নিচু জমি ভরাট করে চেয়ারম্যানের ভাই ৭ নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগ সভাপতি গোলাম কবিরের দখলে প্রায় দুই একর জমি। যেখানে তিনি স্টল নির্মান করে ভাড়া দিয়েছেন, তিনটি বালুর খলা করে একটি পরিচালনা করছেন ও অপর দুটি ভাড়া দেয়া। এছাড়া গনপুর্তের জমিতে থাকা ৩টি পুকুরের আড়াই একর জমি দখলে রেখেছেন ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড সদস্য ফিরোজ গাজী। যদিও তার দাবী এটা লিজ নেয়া। স্থানীয়রা জানান, ফিরোজ গাজীকে সামনে রেখে দখল করা হলেও সেখানকার ষ্টল ভাড়ার টাকা চেয়ারম্যান সুরুজের সঙ্গে ভাগবন্টন হয়।
শুক্রবার তালতলী বাজারে সরেজমিনে গেলে ওই জমিতে থাকা স্থাপনাগুলো চেয়ারম্যান সুরুজ ও তার লোকজনের বলে সকলে স্বীকার করেন। তবে চেয়ারম্যানের ভয়ে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি। নাম না প্রকাশের শর্তে তালতলি দখল করা ষ্টলের কয়েকজন ব্যাবসায়ী বলেন, সব জমি চেয়ারম্যান ও তার স্বজনদের দখলে। তিনিই গনপূর্তের স্থানীয় কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেন।
ব্যবসায়ীরা জানান, ওয়ান ইলেভেনের সরকারের সময় (২০০৭) সর্বশেষ এ জমি থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল। মাহতব হোসেন সুরুজ ৪ বছর আগে চেয়ারম্যান হবার পর তিনি ও ভাই গোলাম কবির দখল করে আধাপাকা স্টল নির্মান করেন। দখলের একটি মাছের বাজার ও গরুর হাটও করেছেন চেয়ারম্যান। সেখানকার খাজনাও তিনি ভোগ করেন। চেয়ারম্যানের দেখাদেখি তার ঘনিষ্টজন আরও কয়েকজন সরকারি জমিতে আধাপাকা স্টল করেছেন।
গণপূর্তের ৫২ জন দখলদারের তালিকা প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীরা বলেন, ভাড়াটিয়া ব্যবসায়ীদের দখলদার হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। চেয়ারম্যানের দেয়া তালিকা অনুযায়ী গণপূর্ত এসব তালিকা করেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে গনপূর্ত বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, তাদের জমিতে বালু ভরাট করে প্রথমে গরুর হাট ও অস্থায়ী বাজার বসানো, তিনটি পুকুর দখল করে মাছ চাষ, অস্থায়ী দুই শতাধিক দোকান তুলে ব্যবসা পরিচালনা এর সবকিছুই নির্বাহী প্রকৌশলী জানতেন। তিনি এ বিষয়ে কোন গুরুত্ব দেননি। এরপরে পর্যায়ক্রমে স্থায়ী স্থাপনা ও মাছ বাজার করার সময়েও নির্বাহী প্রকৌশলীকে অবহিত করা হয়েছিলো। তিনি নীরব থেকে রহস্যজনক ভূমিকায় ছিলেন।
এ বিষয়ে জেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ইউপি চেয়ারম্যান মাহাতাব হোসেন সুরুজের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি কোন কথা বলতে রাজী হননি।
বরিশাল জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান বলেন, সরকারি জমি দখল হলে উচ্ছেদের ব্যাপারে সংশ্লিস্ট দপ্তরকে উদ্যেগী হতে হবে। এরপর জেলা প্রশাসন উচ্ছেদের ব্যাবস্থা নিবে। গনপূর্ত বিভাগ দুই বছর আগে দায়সারা গোছের একটি আবেদন করে আর খোঁজ নেয়নি। সম্প্রতি জেলা প্রশাসককে দখলদারদের তালিকা দেয়া হয়েছে- গনপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীর এমন দাবী প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, তিনি কোন তালিকা পাননি। তাছাড়া তালিকা দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়না। দখলদার উচ্ছেদে তাদেরই অগ্রনী ভূমিকায় থাকতে হবে। ##

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *