সুমন চৌধুরী, অতিথি প্রতিবেদক : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল বিভাগে ধানের শীষ প্রতীকে অংশ্রগ্রহনকারী ৯ জন প্রার্থী গত একবছর যাবত নির্বাচনী এলাকায় আসছেন না। তাদের মধ্য্যে কেউ কেউ গতবছর ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের ২-১ দিন আগে, অন্যরা ভোটের পর নির্বাচনী এলাকা ত্যাগ করার পর গত একবছরে এক মুহুর্তের জন্যও এলাকায় যাননি। সরকার দলীয় কর্মী-সমর্থকদের হামলার ভয়ে তারা নির্বাচনী এলাকায় যাচ্ছেন না বলে অভিযোগ তুলেছেন।
তবে স্থানীয় পর্যায়ে নিজ দলের মধ্যে প্রতিপক্ষ গ্রুপের অভিযোগ, এসব নেতারা শুধুমাত্র নির্বাচনকেন্দ্রীক রাজনীতি করায় তূনমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন না। মনোনয়ন নিশ্চিত করতে তারা সারাবছর রাজধানীতে রাজনীতি করেন।

গত একবছর নির্বাচনী এলাকায় অনুপস্থিত ৯ জনের মধ্যে বিএনপির প্রার্থীরা হলেন- বরিশাল- ১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসনের জহির উদ্দিন স্বপন, বরিশাল- ২ (বানারীপাড়া-উজিরপুর) আসনে সরদার শরফুদ্দিন সান্টু, পটুয়াখালী- ৩ (দশমিনা-গলাচিপা) আসনে গোলাম মাওলা রণি, ভোলা- ২ (তজুমউদ্দিন দৌলতখান) আসনে হাফিজ ইব্রাহিম, ভোলা- ৪ (চরফ্যাশন-মনপুরা) আসনে নাজিম উদ্দিন আলম, বরগুনা- ২ (পাথরঘাটা-বামনা-বেতাগী) আসনের অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব রহমান। এছাড়া পিরোজপুর- ২ (ভান্ডারিয়া-কাউখালী-ইন্দুরকানি) আসনে ২০ দলের শরীক লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, পিরোজপুর-১ (সদর-স্বরূপকাঠী-নাজিরপুর) আসনে জামায়াতে ইসলামীর শামীম সাঈদী এবং বরিশাল- ৪ (মেহেন্দিগঞ্জ-হিজলা) আসনে নাগরিক ঐক্যের নুরুর রহমান জাহাঙ্গীর ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী হয়েছিলেন। ভোটের পর থেকে নির্বাচনী এলাকা থেকে লাপাত্তা তারা।

২০০৮ সালের নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন গোলাম মাওলা রণি। স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে এবং টিভি টকশোতে লাগাতার বিতর্কিত বক্তবো দেয়ায় দল থেকে বহিস্কৃত হন তিনি। গতবছর নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হয়ে এলাকায় আসলে আওয়ামীলীগ এবং বিএনপির একপক্ষের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়েন। গুঞ্জন রয়েছে, নির্বাচনের একদিন আগে তিনি অম্বুলেন্সে চড়ে এলাকা ছেড়েছেন। দশমিনা উপজেলা বিএনপির সাধারন সম্পাদক প্রভাষক আমিনুল হক এ গুঞ্জনের কথা জনিয়ে বলেন, নির্বাচনের পর রণি আর এলাকায় আসেননি, কারো সঙ্গে যোগাযোগও রাখেননা। এ প্রসঙ্গে গোলাম রণি মুঠোফোনে প্রথমে বলেন, গলাচিপা-দশমিনায় ভিন্নমতের লোকজন রাস্তায়ও হাঁটতে পারেননা। তিনি গেলেই হামলার শিকার হবেন। তাই একবছরে তিনি নিবাচনী এলাকায় যাননি। একঘন্টা পর তিনি নিজে ফোন করে বলেন, আগামী তিনি ঢাকার উত্তরা এলাকা থেকে নির্বাচন করবেন। তাই পটুয়াখালীর গলাচিপা-দশমিনায় যান না।
হামলার আশংকাকে মিথ্যা ও হাস্যকর আখ্যায়িত করে পটুয়াখালী- ৩ আসনের সংসদ সদস্য এস.এম শাহজাদা সমকালকে বলেন, “রণি একজন ‘স্মাট লায়ার’। তিনি এ এলাকার সন্তানও নন। অতিথি পাখি হয়ে এসে যতটুকু শেকর করেছিলেন, নিজের দোষে সেটুকুও উপড়ে গেছে”। এ সাংসদ সদস্য রণিকে গলাচিপা-দশমিনায় আসার আমন্ত্রন জানিয়ে বলেন, কবে আসবেন তাকে জানালে তিনি নিজে রণিকে মেহমান হিসাবে গ্রহন করবেন।

স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, বরিশাল-১ আসনের জহিরউদ্দিন স্বপন নির্বাচনের আগে গৌরনদীর শরিকল গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করলেও একদিনের জন্যও বাড়ির বাইরে যেতে পারেননি। ভোটের পরে গোপনে কয়েকবার বাড়িতে এলেও আস্থভাজন গুটিকয়েক নেতা ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে দেখা করেন না। এ প্রসঙ্গে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, তার নির্বাচনী এলাকার আওয়ামীলীগ কর্মীরা এতটাই বেপরোয়া যে বাবার কবর জেয়ারত করতে গিয়ে বাঁধার মুখে পড়েছেন। মাঝে মাঝে বাড়িতে গেলেও নিরাপত্তার জন্যই গোপন রাখেন।
জহির উদ্দিন স্বপনের এ অভিযোগের সঙ্গে ভিন্নমত দেন গৌরনদী উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি জয়নাল হাওলাদার। তিনি পাল্টা অভিযোগে বলেন, ২০০১ সালের নির্বাচনের পর স্বপনের কর্মী বাহিনী সংখ্যালঘু নির্যাতনসহ আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীদের ব্যবসা-বাসবাড়ি লুটপাট করেছে। এ অপরাধবোধের কারনেই তিনি এলাকায় প্রকাশ্যে হননা। প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে চাইলে স্থানীয় আওয়ামীলীগ তাকে বাঁধা দেবেনা।
গতবছর ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নির্বাচনী প্রচার চালাতে বরিশাল- ২ আসনের প্রার্থী সরদার সরফুদ্দিন সান্টু বানারীপাড়া পৌর শহরে প্রবেশের সময় আওয়ামীলীগের সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় মামলা দায়ের হলে ওইরাতেই নির্বাচনী এলাকা থেকে লাপাত্তা হন সান্টু। বরিশাল- ৪ আসনের প্রার্থী নাগরিক ঐক্যের নুরুর রহমান জাহাঙ্গীর গত ডিসেম্বরে নির্বাচনের আগে মাঝে মাঝে এলাকায় গেলেও তার সঙ্গে ছিলনা বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা। ভোটের পর এলাকার সঙ্গে পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন তিনি।

একই সংকটে পিরোজপুর- ১ আসনে জামায়াতের ইসলামীর শামীম সাঈদী ও পিরোজপুর- ২ আসনে লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান। ধানের শীষ প্রতীক পেলেও অন্য দলের নেতা হওয়ায় তাদের সঙ্গে ছিলেন না স্থানীয় বিএনপি। শামীম সাঈদী যুদ্ধাপরাধ মামলায় আমৃত্যু কারাদন্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ছেলে। মনোনয়পত্র দাখিলের পর একদিনের জন্যও এলাকায় আসেননি তিনি।
লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান সম্পর্কে ভান্ডারিয়া উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল মান্নান হাওলাদার বলেন, জেপি প্রার্থী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর কাছ থেকে বিপুল পরিমান টাকা নিয়ে ইরান নির্বাচনী এলাকা ছেড়ে পিরোজপুর শহরে অবস্থান করেছিলেন। কবে তিনি পিরোজপুর ছেড়েছেন তা তারা জানেন না। এখন এলাকায় আসেন কি-না সে সম্পর্কেও তাদের কাছে কোন খোঁজ খবর নেই। মোস্তাফিজুর রহমান ইরান এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি ভোটের দিনও ১৪টি কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। পরে নির্বাচন বর্জন করে মাঠ থেকে উঠে আসেন। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে।

হামলা-মামলার ভয়ে ভোলা- ২ আসনের হাফিজ ইব্রাহিম, ভোলা- ৪ আসনের নাজিম উদ্দিন আলমও গত একবছরে নির্বাচনী এলাকায় যাননি। ভোলা- ৩ আসনের মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন বিভিন্নজনের মৃত্যুর জানাজা কিম্বা মিলাদের অংশগ্রহনের জন্য এলাকায় আসলেও দলীয় কর্মসূচীতে অংশগ্রহন করেন না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা। তবে ভোলা জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আব্দুল মোমিন টুলু বলেন, বিএনপি স্থানীয় নেতারা বিনা বাঁধায় এলাকায় দলৗয় কর্মসূচী পালন করছেন। নাজিম উদ্দিন আলম ও হাফিজ ইব্রাহিম এলাকায় না আসা তাদের নিজেদের দূর্বলতা।
বরগুনার পাথরঘাটা পৌর বিএনপির সভাপতি খলিলুর রহমান চাপরাশী বলেন, গতবছর সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী খন্দকার মাহবুব হোসেন ভোটগ্রহনের দুইদিন পর নির্বাচনী এলাকা ত্যাগ করে আর আসেননি। তবে মুঠোফোনে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

দলের শীর্ষ নেতাদের এলাকায় না আসাকে ভিন্নভাবে দেখেন বিএনপির যুগ্ন মহাসচিব মজিবর রহমান সরোয়ার। তিনি বলেন, “একজন রাজনৈতিক কর্মীর কাজ শুধুমাত্র ভোটকেন্দ্রীক হওয়া উচিত নয়। এলাকার অনেক সামাজিক কাজেও তাকে অংশগ্রহন করতে হয়। শুধুমাত্র ভোটের সময় উপস্থিত হলে ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব দেখা দেয়”। সরোয়ার বলেন, দেশে গণতন্ত্র ও বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন চলছে। শীর্ষ নেতারা মাঠে থাকলে তৃনমূলের কর্মীরা চাঙ্গা হন, মনোবল ফিরে পান। হামলা-মামলা উপেক্ষা করে এখন যারা মাঠে থাকবেন না, আগামীতে তাদের মনোয়ন দেয়া-না দেয়ার বিষয়টি দলকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।##
