সৈয়দ জুয়েল, আয়ারল্যান্ড থেকে ॥ দুখের পরে সুখ আসে, কান্নার পরে হাসি, হারানোর পরে সুখের মিলন- মনীষীদের পুরানো বানী। শ্রদ্ধাচিত্তে স্মরন করি ঐ সব গুনী লোকদের, যাদের এ বানীগুলি জীবন চলার পথের অবলম্বন করে আজ অনেকেই সফল। নব্বই দশকের শেষের দিকের কথা। আয়ারল্যান্ডে ওয়ার্ক পারমিট নামক সোনার হরিন ভিসায় অনেকেই এসেছিলেন।
পরিবারের স্বচ্ছলতা আনতে অনেকের জায়গা জমি বিক্রি করে, আবার অনেকে আত্বীয়র সূত্রে বিনে পয়সায়ও এসেছেন এখানে। যে সব কোম্পানীগুলো বাংলাদেশ থেকে ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে লোক নিয়ে আসছিলো, তারা নাম মুল্যে তাদের বেতন দিত, যেটা আদৌ আয়ারল্যান্ড আইনে নেই।
কোন শ্রমিকের প্রতিবাদের ভাষা জানা থাকলেও, প্রতিবাদ করার সাহস পেতনা ওয়ার্ক পারমিট হারানোর ভয়ে। আইরিশ আইনে ওয়ার্ক পারমিটের বয়স পাঁচ বছর হয়ে গেলে তারপরে তিনি স্টাম্প ৪ পাবেন। তখন তিনি আইরিশ পাসপোর্টের আবেদন করতে পারেন।
ওই সময় থেকে তিনি আয়ারল্যান্ডে ব্যাবসা থেকে শুরু করে সব ধরনের সুযোগ পাবেন। তাই পাঁচটি বছর নীরবে সহ্য করেন কোম্পানীগুলোর এহেন কার্যকলাপের। যেখানে নূন্যতম বেতন ছিল ৪০০ ইউরো, সেখানে কর্মচারীরা পেত ৫০ থেকে ১০০ ইউরো। এটা দুবছরে বেড়ে ১২০ বা ১৪০ ইউরো। এর উপরে খুবই কম উঠতো। কর্মচারীদের নামমাত্র বেতন দিয়ে মালিকরা হাতিয়ে নিত বছরে কোটি কোটি টাকা।
মজার বিষয় হলো পে স্লিপে ৪০০ ইউরো দেখানো হত, যাতে করে আইরিশ সরকার বুঝতে না পারেন তারা আইন ভেঙ্গে নিজের পকেট ভারী করছেন। আয়ারল্যান্ড বিশ্বের সেরা একটি গনতান্ত্রিক রাস্ট্র, এখানে শ্রম আইন অনেক শক্তিশালী। কখনো মালিক পক্ষ শ্রমিক পক্ষের মামলায় জিতেছে, তার নজির তেমন নেই বললেই চলে। বেশ কয়টি মামলাও হয়েছিল বাংলাদেশ, ভারতের ওই সব তথাকথিত মালিকের বিরুদ্ধে। কোর্টে ক্ষতিপূরণও দিতে বাধ্য হয়েছিল, আবার কিছু কোম্পানীর মালিক কাগজে মালিকানাও ছেড়ে দিয়েছিল। এমনকি বিক্রি করতেও বাধ্য হয়েছিল। ইট মারলে যে পাটকেল খেতে হয়, তা তারা হারে হারে টের পেয়েছিলেন।
যে সব কর্মীরা তখন শোষিত হয়েছিলেন, তাদের সে দিন আর নেই। আজ তারা আইরিশ নাগরিক। তাদের প্রায় প্রত্যেকেই সফল। আর্থিক, মানসিক সুখ এখন ওই সব শোষন করা মালিকদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। এ বিষয়ে বেশ কয়েকজন ওয়ার্ক পারমিটে আসা লোকদের সাথে কথা বললে, তারা বলেন-যারা আমাদের বেতন কম দিয়ে নিজেরা ধনী হয়েছে তারা কেউই ভাল নেই। সন্তান নিয়ে অশান্তি, যারা দেশে পাঁচ ছয়টি বাড়ি কিনছিলো, তার একটিও নেই। আমাদের হক মেরে, ওই চুরি করা টাকা দিয়ে যারা ব্যাবসা করছে, তাদের ব্যাবসাও ভালনা। ওদের চেয়ে আমরা অনেক ভাল আছি। এটাই আল্লাহর বিচার।

