নাগরিক রিপোর্ট : ‘হাসপাতালে করোনা রোগী এসেছে, আপনারা সকলে সতর্ক হোন’- বরিশাল শেরেবাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালে বর্হিবিভাগের বারান্দায় সোমবার সকাল ৯টার দিকে হ্যান্ডমাইকে আকস্মিক এমন ঘোষণা দিচ্ছিলেন এক কর্মচারী। ফলে বহির্বিভাগে আগত রোগী ও অন্যান্য দর্শনার্থীদের মধ্যে আতংক দেখা দেয়। এসময় সেখানে উপস্থিত এক গণমাধ্যম কর্মী বিষয়টি জানতে হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেনকে মোবাইল করেন। পরিচালক দ্রত ওয়ার্ড মাস্টার আবুল কালামকে ফোন দিয়ে এ ঘোষণা বন্ধ রেখে রোগী ও দর্শনার্থীদের করোনাভাইরাস নিয়ে সতর্কবার্তা প্রচারের নির্দেশ দেন।
পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রোগী এবং দর্শনার্থী তাড়াতে কর্মচারীরা এমন মিথ্যা প্রচারের কৌশল নিয়েছেন। যদিও করোণাভাইরাস আতংকে দক্ষিণাঞ্চলের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল শেবাচিম হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা অর্ধেক নেমেছে। যারা নিরূপায় হয়ে আসছেন তাদেরও মিথ্যা প্রচার চালিয়ে কৌশলে হাসপাতাল থেকে তাড়ানো হচ্ছে। শুধু শেবাচিম হাসপাতাল নয়, চিকিৎসাসেবায় স্থবিরতা নেমে এসেছে গোটা নগরীতে। হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকরা রোগী দেখছেন দায়াসারাভাবে। প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখা বন্ধ করে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ প্রায় সকল শ্রেণীর চিকিৎসকরা। চলমান করোনাভাইরাস আতংকের মধ্যে চিকিৎসকদের এমন সিদ্ধান্তে স্বাস্থ্যসেবা ঝুকিতে পড়েছেন সাধারন মানুষ।

শেবাচিম হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা কি পরিমান কমেছে তা জানা গেছে সোমবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর পরিসংখ্যান থেকে। গতকাল হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৮৫৭ জন। বেলা ১২টা পর্যন্ত জরুরী বিভাগে এসেছেন মাত্র ৪৩ জন রোগী। জরুরী বিভাগের দায়িত্বরত কয়েকজন জানান, অন্যান্য দিনে এসময়ে দেড় শতাধিক রোগী আসতেন জরুরী বিভাগে।
হাসপাতালের নার্স তত্ত্বাবধায়ক সেলিনা বেগম বলেন, ১০০০ শর্য্যার এ হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১৭০০ রোগী ভর্তি থাকতেন। করোনাভাইরাস আতংকের পর নতুন রোগী আসা কমে গেছে, কিছুটা সুস্থ রোগী যারা ছিলেন তারাও আতংকে দ্রুত হাসপাতাল ছেড়েছেন।
হাসপাতালের চীরচেনা দৃশ্যপট বদলে যাওয়া দেখে নার্স তত্বাবধায়ক সেলিনার বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায়। ওয়ার্ডের মেঝে কিম্বা বারান্দায় শয্যাশয়ী রোগী নেই। নিচতলায় বর্হিবিভাগে হাতেগোনা কয়েকজন রোগী অপেক্ষা করছেন চিকিৎসকদের কক্ষের সামনে। বেশীরভাগের কক্ষে চিকিৎসক অনুপস্থিত। যারা আছেন তারাও রোগী দেখছেন ঢিলেঢালাভাবে। একাধিক রোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চিকিৎসকরা রোগীদের দুরে দাড় করিয়ে ২/১টি কথা শুনে ব্যবস্থাপত্র লিখে দিচ্ছেন অথবা মোবাইল ফোন নম্বর দিচ্ছেন পরে যোগাযোগ করে ব্যবস্থাপত্র নেয়ার জন্য।
এ প্রসঙ্গে হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন বলেন, আতংকে রোগী আসা অর্ধেক কমে গেছে। একই কারনে চিকিৎসকরাও রোগী দেখতে কিছুটা অনীহা দেখাচ্ছেন। এজন্য ফোনে চিকিৎসাসেবা নেয়ার জন্য একটি হটলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে। সোমবার সকালে করোনা রোগী আসার খবর ছড়ানো ভূলবোঝাবুঝি বলে পরিচালক বলেন।

প্রাইভেট চিকিৎসা বন্ধ :
বরিশাল নগরীতে ল্যাব এইড, মেডিনোভা, অ্যাপোলো, বেলভিউ নামক ডায়গণষ্টিক প্রতিষ্ঠান এবং ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে বসেন বেশীরভাগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর আশপাশে আরও অনেক চিকিৎসকের চেম্বার রয়েছে। সকাল ১০টার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চিকিৎসদের চেম্বার অধ্যুষিত এলাকাগুলো থাকে লোকারন্য। গত শনিবার থেকে পর্যায়ক্রমে চিকিৎসকরা চেম্বারে আসা বন্ধ করে দেয়ায় সেখানে স্থবিতরা নেমে এসেছে।
ডায়গণষ্টিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল সুত্র জানিয়েছে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বেশীরভাগের বয়স ষাটোর্ধ্ব। তাদের মধ্যে কয়েকজন নিজেরাই হৃদরোগী। বাইপাস অপারেশনও হয়েছে ২/১ জনের। জীবনের ঝুকি এড়াতে তারা আপাতত চেম্বারে রোগী দেখা বন্ধ রেখেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শনিবার থেকে নগরীর ল্যাব এইড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী দেখা বন্ধ করেছেন গাইনী বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডাঃ শিখা সাহা ও মেডিসিন লিভার ও পরিপাকতন্ত্র রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ স্বপন কুমার সরকার ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. সাইদুর রহমানসহ আরও কয়েকজন চিকিৎক।
নগরীর আলেকান্দা কাজীপাড়া এলাকার বাসিন্দা আরিফুর রহমান জানান, ৬ বছর বয়সী তার এক ভাগ্নে অসুস্থ হলে শনিবার রাতে ডা. হামিদ শেখের ব্যক্তিগত চেম্বারে দেখানো হয়। ডায়গণষ্টিক পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে প্রেসক্রিপশন করার জন্য রোববার সকালে চিকিৎসকের চেম্বারে গিয়ে জানতে পারেন তিনি আজ থেকে আর চেম্বারে আসবেন না। আরিফুর রহমান জানান, ডা. হামিদ শেখের চিকিৎসকের ব্যক্তিগত কর্মচারীরা চিকিৎসকের সঠিক অবস্থান জানাতে অস্বীকার করায় তার ভাগ্নে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
নগরীর ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল, অ্যাপোলো ডায়গণষ্টিক সেন্টার, বেলভিউ ডায়গণষ্টিক সেন্টারসহ বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়গণষ্টিক সেন্টারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. গোলাম মাহমুদ সেলিম ও ডা. মজিবুর রহমান, গ্যাষ্ট্রোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. আবুল কালাম আজাদ, গাইনী বিভাগের ডা. তানিয়া আফরোজ ও প্রফেসর শিখা সাহা, ডা. নাহিদা আক্তার সুপা, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. রনজিৎ খাঁ ও রথীন্দ্র নাথ বোস, নিউলোজী বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা: আনোয়ার হোসেন বাবলুু, লিভার ও পরিপাকতন্ত্র রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ স্বপন কুমার সরকার, নিউরোলজিষ্ট ডাঃ মোঃ জাকির হোসেন চেম্বারে রোগী দেখা বন্ধ করে দিয়েছেন।
অ্য্যাপোলো ডায়গষ্টিক সেন্টারের এক কর্মকর্তা বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন চিকিৎসক মৌখিকভাবে বলে গেছেন তারা কয়েকদিন চেম্বারে আসবেন না। তবে এর সঠিক কোন কারন ওই চিকিৎসকরা জানাননি। এ প্রতিষ্ঠানগুলো চিকিৎসক নির্ভর হওয়ায় তারা চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারছেন না। একই কথা জানিয়ে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের এক কর্মকর্তা। মেডিনোভার মার্কেটিং অফিসার মোস্তফা কামাল বলেন, চেম্বারে চিকিৎসক না আসায় ডায়গণষ্টিক প্রতিষ্ঠানগুলো এক প্রকার অলস হয়ে পড়েছে।
বরিশাল ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়গণষ্টিক ওনার্স অ্যাসোশিয়েসনের সভাপতি কাজী মফিজুল ইসলাম কামাল বলেন, চিকিৎসকরা নিরাপত্তার জন্য চেম্বারে রোগী দেখা বন্ধ করেছেন। এতে জনদূর্ভোগ বেড়েছে। নিরাপত্তা সরঞ্জাম ঢাকা থেকে সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। পাওয়া গেলে চিকিৎসকদের আবার চেম্বারে ফিরিয়ে আনা হবে।
বরিশালের সিভিল সার্জন ডা. মনোয়ার হোসেন বিষয়টি নিয়ে উগে¦গ প্রকাশ করে বলেন, ‘একজন চিকিৎসক ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখা, না দেখা এটা সম্পুর্ন তার নিজের ব্যক্তিগত বিষয়। তাছাড়া চিকিৎসকের নিরাপত্তার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত তেমন পদক্ষেপও নেয়া যায়নি’। জরুরী রোগীদের সরকারি হাসপাতাল এবং প্রয়োজনে হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করার পরমর্শ দেন জেলা সিভিল সার্জন।
