করোনা নিয়েও বানিজ্যে নেমেছিল ইউনাইটেড হাসপাতাল?

Spread the love

নাগরিক ডেস্ক : আগুনে পাঁচ রোগীর মৃত্যুর পর ঢাকার বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতাল প্রশ্নের মুখে পড়েছে। মূল হাসপাতালের বাইরে কোভিড আইসোলেশন সেন্টারটি নিয়েও নানা অভিযোগ আসছে। সেখানে সেবার চেয়ে বাণিজ্যিক মনোবৃত্তিই ছিল বেশি। ফায়ার সার্ভিস বলছে, হাসপাতালের কোনো ফায়ার ফাইটার নেই। কোভিড-১৯ ভাইরাসের উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর রোগীদের জন্য এর মূল ভবনের বাইরে ব্যাডমিন্টন খেলার মাঠে অস্থায়ীভাবে গড়ে তোলা হয় আইসোলেশন সেন্টার। ২০ ফুট বাই ১০ ফুটের আইসোলেশন সেন্টারটি করা হয় এক মাস আগে।

সরেজমিন দেখা গেছে, ইউনাইটেড হাসপাতালের বর্ধিত অংশে যেনতেনভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল আইসোলেশন সেন্টারটি। টিনের ছাদের নিচে স্টিলের ফ্রেম দিয়ে পার্টিশন ও কাঠের বোর্ডের সিলিং এবং জিপশাম ব্যবহার করে তৈরি করা হয় এটি। এই সেন্টারে বসানো হয়েছিল শক্ত কার্টেইন দিয়ে আলাদা করা পাঁচটি বেড; ছিল স্যাম্পল কালেকশনের ইউনিট।

এসি, ভেন্টিলেটর ও আইসিইউ সুবিধাসহ ছিল যাবতীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা। ছিল না কেবল চিকিৎসক রোগীদের আগুন থেকে বাঁচার কোনো ব্যবস্থা। গড়ে তোলা হয়নি কোনো ফায়ার ফাইটিং টিম। আগুন নেভানোর যে সরঞ্জাম ছিল তার অধিকাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ। পুরো বিষয়টিই অবগত ছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এর পরও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে দাহ্য পদার্থ দিয়ে তৈরি এই সেন্টারের লাইফ সাপোর্ট ও আইসিইউ কক্ষে রাখা হয়েছিল ৫ রোগীকে।

হাসপাতালটির এমন ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, নিয়ম ভেঙে কেনই বা কোভিড-১৯ আক্রান্ত না হওয়া রোগীদের রেখে দেওয়া হলো। টেস্ট করে কারও কোভিড-১৯ পজিটিভ হলে একটি হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়। ওই নাম্বার থেকে রোগীকে যেখানে পাঠাতে বলা হবে সেখানে পাঠিয়ে দেওয়ার নিয়ম।

কিন্তু সরকারের সেই নির্দেশনা না মেনে করোনা নেগেটিভ হওয়ার পরও রোগীদের আইসোলেশন সেন্টারে রেখে দেয় ইউনাইটেড কর্তৃপক্ষ। পাঁচ লাশ রেখে গভীর রাতে কেন তড়িঘড়ি করে অপমৃত্যুর মামলা করতে হলো কর্তৃপক্ষকে? অবশ্য ঘটনাটি হত্যাকা- অভিযোগ করে নানা তথ্যের লুকোচুরির কারণ তদন্তে দাবি জানিয়েছেন নিহতদের স্বজনরা।

অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৫ জনের একজন ছিলেন ঢাকার একটি বায়িং হাউজের কর্মকর্তা রিয়াজুল আলম লিটন। শ্বাসকষ্ট ও জ্বর থাকায় ‘করোনা সন্দেহে’ তিনি ঘটনার দিন অর্থাৎ গত বুধবার বিকালে অফিসের সহকর্মীদের সঙ্গে ইউনাইটেড হাসপাতালে এসেছিলেন পরীক্ষা করাতে। নমুনা নিয়ে ফলের আগ পর্যন্ত পরিবারের কাউকে না জানিয়ে তাকে আইসোলেশন ওয়ার্ডের লাইফ সাপোর্টে রাখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ভর্তির কয়েক ঘণ্টা পরই আগুনে পুড়ে চিরবিদায় নিতে হয়েছে তাকে। পরে জানা যায়, রিয়াজুলের করোনা পরীক্ষার ফল ছিল নেগেটিভ।

তার স্ত্রী ফৌজিয়া আক্তার জেনি জানান, তার স্বামী সুস্থই ছিলেন, হেঁটে গিয়েছিলেন হাসপাতালে। সামান্য শ্বাসকষ্ট থাকলেও তাকে যে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল তা জানতেন না তিনি বা তার স্বজনরা। শুধু তাই নয়, অগ্নিকা-ের পর রোগীদের বাঁচানোর চেষ্টা না করে তাদের অগ্নিকুন্ডে ফেলে রেখে আসে কর্তৃপক্ষ।

শুধু রিয়াজুল আলম লিটনের স্ত্রী ফৌজিয়া জেনিই নয়, অগ্নিকাণ্ডে নিহত মাহবুব এলাহী চৌধুরী হীরক (৫৭), মনির হোসেন (৭৫), ভারনন অ্যান্থনি পল (৭৪) ও খোদেজা বেগমের (৭০) স্বজনরাও ইউনাইটেড হাসপাতালের ওই আইসোলেশন সেন্টার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা জানায়, দুবার কোভিড নেগেটিভ আসার পরও শুধু মোটা অঙ্কের টাকার জন্য এক রোগীকে আইসোলেশন সেন্টারে রেখে দেওয়া হয়। আগুনে মৃত পাঁচজনের মধ্যে দুজনের ছিল করোনামুক্তির সনদও। উপসর্গ নিয়ে আসা তিনজনের দুই দফা নেগেটিভ রিপোর্ট এলেও তাকে নানা অজুহাতে রাখা হয় আইসোলেশন সেন্টারে। বাকি দুজনেরও কোভিড নেগেটিভ সার্টিফিকেট জমা দেওয়া হয়েছিল।

অগ্নিকাণ্ডের পরদিন বিকালে অবশ্য ইউনাইটেড হাসপাতালের কমিউনিকেশন্স অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান ডা. সাগুফা আনোয়ার জানান, লাইফ সাপোর্টে থাকা ওই ৫ রোগীকে বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন তারা। কিন্তু এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন নিহতদের স্বজনরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, ইউনাইটেড হাসপাতালের বর্ধিত অংশে গড়ে তোলা যেসব কক্ষে রোগীদের চিকিৎসা সেবা হচ্ছিল সেগুলোতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা মানা হয়নি। করোনা ইউনিট বা ওয়ার্ড করার বিষয়ে অধিদপ্তরের কাছ থেকে কোনো অনুমতি নেয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

ফায়ার সার্ভিসের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান উপ-পরিচালক দেবাশীষ বর্ধন জানান, অস্থায়ী আইসোলেশন সেন্টারে রোগীদের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রাখা হয়েছিল। হাসপাতালে আইসোলেশন সেন্টার করলেই হবে না, ফায়ার প্রটেকটিভ মেজারটাও রাখাটা বাঞ্ছনীয়। সার্বক্ষণিক একটি টিম অবশ্যই রাখার কথা থাকলেও এখানে তা মানা হয়নি। বেশিরভাগ ফায়ার এক্সটিংগুইশার ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ। মেয়াদোত্তীর্ণ ফায়ার এক্সটিংগুইশার রাখার দায় হাসপাতালের। এগুলো দেড়মাস আগেই রিফিল করা উচিত ছিল। হাসপাতালে ফায়ার হাইড্রেন্ট থাকলেও ফায়ারম্যানরা আসার আগে কেউ কাজ করেনি। ইউনাইটেড হাসপাতালের বর্ধিত অংশে গড়ে তোলা করোনা ইউনিট বা ওয়ার্ডের বিষয়ে অবগত নন বলেও জানান তিনি।

ইউনাইটেড হাসপাতালের কমিউনিকেশন্স অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান ডা. শাগুফা আনোয়ার জানান, অগ্নিদগ্ধে মৃত পাঁচ রোগীর অবস্থা ক্রিটিক্যাল থাকায় তাদের লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। রোগীদের অবস্থা ক্রিটিক্যাল ছিল বলেই তাদের লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সঠিকভাবে ফায়ার সার্ভিসকে আগুন লাগার খবর দেয়নি উল্লেখ করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের যা-যা করার দরকার ছিল, সেসব কিছুই করা হয়েছে। তবে তাদের বের করার আগেই তারা মৃত্যুবরণ করেন।

ডা. শাগুফা আনোয়ার আরও বলেন, সরকারের নির্দেশনা ছিল কোভিড-১৯ উপসর্গ থাকা রোগীদের আইসোলেশন রাখতে হবে। টেস্ট করে কারও কোভিড-১৯ পজিটিভ হলে একটি হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়। উনারা রোগীকে যেখানে পাঠাতে বলবেন সেখানে পাঠিয়ে দেবেন। সরকারের সেই নির্দেশনা মেনে করোনার উপসর্গ থাকা রোগীদের আইসোলেশন ইউনিটে রাখা হয়। তিনি বলেন, সরকার নিদের্শনা দিয়েছে সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে কোভিড এবং নন-কোভিড রোগীদের আলাদা আলাদা রেখে চিকিৎসা দিতে। ওই নির্দেশনা মেনে সেবা দেওয়া হচ্ছে। সরকারের এই নির্দেশনার পর নতুন করে অনুমতি নেওয়ার দরকার হয় না।

সুত্র- আমাদের সময়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *