নাগরিক রিপোর্ট:
জটিল আকার ধারন করছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাথীদের সাথে পরিবহন শ্রমিকদের বিরোধ। শনিবার দিনভর দুই পক্ষই সড়ক অবরোধ করে অচল করে দেয় দক্ষিনাঞ্চল। শিক্ষার্থীদের ৩ দফা দাবী প্রতিহতে লাঠিসোঠা নিয়ে মহড়া, সড়কে আগুন জ্বালিয়ে গোটা বরিশালে আতংক ছড়িয়ে দেয় শ্রমিকরা। এতে সারাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। হাজার হাজার যাত্রী মহা দুর্ভোগে পরেন। শিক্ষার্থীদের সাথে মুখোমুখী অবস্থান নিয়ে অনেকটা যুদ্ধাবস্থা সৃস্টি করে শ্রমিকরা। শেষ বিকেলে শিক্ষার্থীরা শহীদ দিবসের কারনে ২২ ফেব্রয়ারী সকাল পর্যন্ত মহাসড়ক অবরোধ স্থগিত করেছেন।
বাস মালিক-শ্রমিকরাও একদিনের জন্য ধর্মঘট শিথিলের ঘোষনা দিয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের উপর হামলার নেতৃত্বদানকারী আ’লীগ নেতা কাওসার হোসেন শিপনকে গ্রেফতার না করা পর্যন্ত তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে ঘোষনা দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। এর ফলে ছাত্র ও শ্রমিকদের মধ্যে এ দ্ব›দ্ব আরও ঘনিভূত হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে।
উদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্যে শনিবার বিকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। আলোচনা শেষে বিকাল সাড়ে ৫টায় আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারীদের অন্যতম শিক্ষার্থী সুজয় শুভ জানান, নিরাপত্তার বিষয়টি ভিসি প্রফেসর ড. মো: ছাদেকুল আরেফিন দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তদন্তের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উপর হামলার মুল হোতা কাওসার হোসেন শিপন গ্রেফতার না হওয়া আন্দোলন চলবে। তবে ২১ ফেব্রæয়ারীতে তারা মহাসড়ক অবরোধ করবেন না। ২২ ফেব্রæয়ারী সকালে ফের আন্দোলন চলবে।
অপরদিকে বাস মালিক সমিতির সাধারন সম্পাদক আ’লীগ নেতা কাওছার হোসেন শিপন বলেছেন, গ্রেফতার হওয়া দুই শ্রমিকের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে একুশে ফেব্রæয়ারী উপলক্ষে ধর্মঘট শিথিল করা হয়েছে।
সহপাঠীদের উপর হামলার প্রতিবাদে বরিশাল বিশ^বিদ্যালয় (ববি) শিক্ষার্থীরা শনিবার থেকে ফের আন্দোলনে নামে। তারা ৩ দফা দাবীতে সকাল ৯টা থেকে ক্যাম্পাসের মুল ফটকে জড়ো হয়ে বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে অবস্থান নেয়। এতে বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, কুয়াকাটা, বরগুনাসহ দক্ষিনাঞ্চলের ১০ রুটে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে চরম দুর্ভোগে পরেন এসব রুটের হাজার হাজার যাত্রী। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ ২ শ্রমকিকে আটক করলেও আন্দোলনকারীরা চিহিৃত হামলাকারীদের গ্রেফতারে তাদের অবরোধ কর্মসুচী অব্যাহত রাখে।
এর পরপরই শনিবার সকাল ১০টা থেকে রূপাতলী বাস টার্মিনাল চত্তরে বিক্ষোভ করে মারমুখী হয়ে ওঠে মালিক ও শ্রমিকরা। এসময় তারা সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে ২ শ্রমিকের মুক্তির দাবি করে। শত শত শ্রমিকের হাতে লাঠিসহ ধারালো অস্ত্রও দেখা গেছে। জানা গেছে, শ্রমিকদের শেল্টার দিয়ে রাস্তায় নামায় ক্ষমতাসীন দলের এক শীর্ষ নেতা। তবে বাস মালিক সমিতির সাধারন সম্পাদক ও মহানগর আ’লীগ নেতা কাওয়াসার হোসেন শিপন বলেন, যে ২ শ্রমিককে পুলিশ গ্রেফতার করেছে তাদের কোন অপরাধ নেই। তারা কোনোভাবে শিক্ষার্থীদের হামলার উপর হামলায় জড়িত নয়। এই গ্রেফতার কোনোভাবে মানতে চায় না শ্রমিকরা। যেকারনে দুই শ্রমিককে মুক্তি না দেয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
শনিবার দুপুরে রূপাতলী বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে, শত শত শ্রমিক লাঠিসোটা নিয়ে বিক্ষোভ করছেন। একই অবস্থা দেড় কিলোমিটার দুরে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। মহাসড়কের দুইপাশে অবস্থান নিয়ে মানুষের পায়ে হাটাচলাও বন্ধ করে দিয়েছে আন্দোলনকারীরা। উভয় স্থানে বিপুল সংখ্যক বিপুল সংখ্যক পুলিশ অবস্থান করছেন। নিরাপত্তার জন্য পুলিশ সদস্যরা রূপাতলী টার্মিনালে প্রবেশের এক কিলোমিটার আগ থেকে সব ধরনের যানবহন চলাচল বন্ধ করে দেয়।
নগরীর সোনারগা টেক্সটাইল সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা স্কুল শিক্ষিকা সাদিয়া আফরিন জানান, তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঝালকাঠীর আগে। সকালে যেতে পারলেও দুপুরে রুপাতলী ঢুকতে পারেননি। বাড়ি ফিরেছেন পায়ে হেটে অনেক কষ্টে। তিনি বলেন, বরিশাল-ঝালকাঠী রুটে পথে পথে মানুষের দুর্ভোগ চরমে। কালিজিরা এলাকায় অসংখ্য বাস ফেলে রাখা হয়েছে। রুপাতলীতে কথা হয় ভান্ডারিয়ার বাসিন্দা আ: রহমান। রাজধানীতে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রহমান জানান, তিনি ছুটিতে এসেছিলেন। কিন্তু এসে বাড়িতে পৌছাতে মহা বিপাকে পড়েছেন।
একই অবস্থা দেখা গেছে শনিবার দুপুরে বিশ^বিদ্যালয় সংলগ্ন বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে। দুপুর ২টা পর্যন্ত এ রুটে সব ধরনের বসি চলাচল বন্ধ রয়েছে। আব্দুর রব সেরনিয়াবাত সেতুতে দুপুর সোয়া ২টায় দেখা গেছে একটি বরযাত্রী বাহী মাইক্রোবাসও আটকে দিয়েছে আন্দোলনকারীরা।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সুত্রমতে, শিক্ষার্থীদের ৩ দফা দাবী হচ্ছে- চিহিৃত হামলাকারীদের গ্রেফতার করা, অভিযুক্তদের নামোল্লেখ করে মামলা দায়ের এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
শিক্ষার্থীদের লিখিত দাবী অনুযায়ী হামলায় নেতৃত্বদানকারী ৩জন হচ্ছে- মহানগর আ’লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক এবং বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাওছার হোসেন শিপন, পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি রফিকুল ইসলাম মানিক এবং তেল মামুন নামের এক শ্রমিক নেতা। এরা সকলেই ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিতে জড়িত। চলমান আন্দোলনে এই শ্রমিক নেতাদেরও মাঠে দেখা গেছে।
আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া শিক্ষার্থী অমিত হাসান রক্তিম বলেন, বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন গা ছাড়া ভাব দেখিয়েছে। আমাদের মৌলিক অধিকার আদায়ে ৩ দফা দাবীতে আন্দোলন চলামান রেখেছেন। এছাড়া এই মহুর্তে তাদের কিছুই করার নেই। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, পুলিশ ২ জনকে আটকের নামে চিহিৃত হামলাকারীদের আড়াল করার চেস্টা করছে।
আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে তাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থীরা হামলাকারীদের নামের তালিকা দিলেও বিশ^বিদ্যারয় প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে মামলা না করে অজ্ঞাতদের আসামি করে থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। আবার সেই অভিযোগে ঘটনার সঠিক বিবরণ না দিয়ে শুধুমাত্র জখমের কথা উল্লেখ করা হয়। শিক্ষার্থীরা ববি কর্তৃপক্ষের নতজানু নীতি প্রত্যাখান করে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত মহাসড়ক অবরোধ রেখেছেন।
ববি’র জনসংযোগ কর্মকর্তা ফয়সাল মাহমুদ রুমি বলেন, শুক্রবার দিবাগত রাত আড়াইটার নগরের রুপাতলী বাস্টট্যান্ড এলাকা থেকে শিক্ষার্থীদের মেসে ঢুকে হামলার ঘটনায় দুই পরিবহন শ্রমিককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে রাখতে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন চেস্টা অব্যাহত রেখেছেন।
বরিশাল কোতোয়ালী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নুরুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মামলায় কোন আসামীর নাম উল্লেখ করেননি। পুলিশ সন্দেহজনক আসামী হিসাবে শুক্রবার রাতে রূপাতলী আবাসিক এলাকার বাসিন্দা এমকে পরিবহনের সুপারভাইজার আবুল বাশার রনি (২৫) ও সাউথ বেঙ্গল পরিবহনের হেলপার মো. ফিরোজকে (২৪) গ্রেফতার করেছে। এর প্রতিবাদে শ্রমিকরা বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়ে সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন। তিনি বলেন, সড়কের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সতর্ক অবস্থানে আছে। দুই পক্ষের সাথে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের চেস্টা চলছে।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বিকালে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ কমিশনার মোকতার হোসেন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অজ্ঞাতনামাদের আসামী করে মামলা করেছেন। তদন্তে দুই জনের সম্পৃক্তার প্রমান পাওয়ায় তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। নতুন করে তদন্তে যার নাম আসবে তিনিই গ্রেফতার হবেন।
প্রসঙ্গত, গত ১৬ ফেব্রয়ারী দুপুরে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর সাথে নগরীর রুপাতলীস্থ বিআরটিসি কাউন্টারের স্টাফের সাথে কথা কাটাকাটি হয়। তুচ্ছ ওই ঘটনায় কাউন্টার স্টাফ রফিক দুই শিক্ষার্থীকে লাঞ্চিত করে। এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে রফিককে গ্রেফতারের দাবি জানায়। ওই ঘটনার জেরে মঙ্গলবার গভীররাতে রুপাতলী এলাকায় শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন মেসে গিয়ে নৃশংস হামলা চালায় বাস শ্রমিকরা। বুধবার দিনভর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়ক অবরোধ করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে বৈঠক শেষে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে শিক্ষার্থীরা বিকেলে সড়ক অবরোধ স্থগিত করে। আল্টিমেটাম শেষে দাবী না মানা হলে শুক্রবার সন্ধ্যায় মশাল মিছিল করেছে শিক্ষার্থীরা।
একই দাবীতে শনিবার সকাল থেকে মহাসড়ক অবরোধ করে রেখেছে তারা। দেশের বিভিন্ন স্থানে ববি শিক্ষার্থীদের উপর হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ, মানববন্ধন অব্যাহত রেখেছে সাবেক শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন।
