ভোলানাথ গুচ্ছগ্রামে পুকুর পুনর্খননে ‘পুকুরচুরি’

Spread the love


সুমন চৌধুরী, অতিথি রিপোর্টার : বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের ভোলানাথ গ্রামে দুটি আদর্শ গ্রামের (গুচ্ছগ্রাম) ৪টি জলাশয় পুন:খননের নামে ‘পুকুর চুরি’র অভিযোগ উঠেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের ‘জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’র (২য় সংশোধিত) অধীনে চারটি পুকুরে পুন:খনন ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ৭০ লাখ টাকা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নামমাত্র খনন করে লাখ লাখ টাকা আত্মসাত করেছেন ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় একদল নেতাকর্মী। কোনরকম মাটি কেটে তীরে রাখায় চলতি বর্ষায় তীর ভেঙ্গে ওই মাটি পুকুরেরই নেমে যাচ্ছে। অনিয়মের বিষয়টি মৎস্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলা জেনেও রহস্যজনক কারনে প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিল প্রদান করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ভোলানাথ পুুরাতন আদর্শ গ্রামে ৩টি পুকুর এবং ভোলানাথ নতুন আদর্শ গ্রামে ১টি জলাশয় পুন:খনন করা হয়। নতুন আদর্শ গ্রামের জলাশয়টি দুটি প্রকল্প দেখিয়ে প্রতি প্রকল্পে ব্যয় করা হয় ২০ লাখ ৯৯ হাজার ৬০ টাকা করে। পুরাতন আদর্শ গ্রামে ৩ পুকুরের প্রতিটি ব্যয় করা হয় সাড়ে ১০ লাখ ১ হাজার ৩০ টাকা করে। একমাস আগে কাজ শেষ করে বিলের ৭০ ভাগ টাকা সংশ্লিষ্টরা তুলে নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয়রা জানান, একাধিকজনের নামে প্রকল্প দেখানো হলেও পুরো কাজটি করেছেন স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা কামাল হোসেন ও ইউপি সদস্য হারুন ও তাদের কয়েক সহযোগী। পুরাতন আদর্শ গ্রামে দুটি পুকুরে দুজন ব্যক্তিকে দলনেতা দেখানো হলেও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর একই উল্লেখ নিয়েও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।

ভোলানাথ গুচ্ছগ্রামের পুকুর


নতুন আদর্শ গ্রামের জলশয়ায়ের দক্ষিণ তীরের বাসিন্দা গৃহবধু কুলসুম বেগমের কাছে কতটুকু খনন করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা খাল কাইট্টা কুমির আনছি। আগের যা আচেলে ভালাই আচেলে, পুহইরের (পুকুর) মাটি কাডনের পর আগের পাড়ও (তীর) ভাইঙ্গা পড়তেছে। এসময় পাশে দাড়ানো আরেক বৃদ্ধ বলেন, ‘রোশনের ছোলার মতো পাতলা কইরা মাটি কাডছে’।
দুটি গুচ্ছগ্রামে দুই শতাধিক হতদরিদ্র পরিবার বাস করেন। যাদের প্রায় বেশীরভাগ পেশায় জেলে। তাদের দেয়া তথ্যমতে, ভেকু মেশিণ দিয়ে তীর ঘেষে অল্প পরিমান খনন করে মাটি রাখা হয়েছে পাশেই। কয়েকদিনের বৃষ্টিতে ওই মাটি ধুয়েমুছে আগের জায়গাতেই পড়ছে। সরেজমিনে ঘূরে দেখা গেছে, প্রতিটি পুকুরের পাড়ে রাখা পুন:খনন করামাটি বৃষ্টির পানির ¯্রােতের সঙ্গে পুকুরে নেমে যাচ্ছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, শুধু দুটি পুকুর ভেকু মেশিণ দিয়ে এবং অপর ৩টিতে শ্রমিকদের দিয়ে ১০-১২ দিন মাটি কাটা হয়েছে। পুকুরের মাঝ বরাবর উচু রেখে চারপাশের মাটি কেটে তীর রাখায় বৃষ্টিতে মাটি আবারও পুকুরে নেমে যাচ্ছে।
ভোলানাথ এলাকার ইউপি সদস্য (মেম্বর) মো. হারুনের কাছে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, উলানিয়ার ইউসুফ তালুকদার মৎস্য অফিস থেকে গুচ্ছগ্রামের পুকুর পুন:খনন প্রকল্পগুলো বাগিয়ে এনেছেন। স্থানীয় সেল্টার পেতে তাদেরকে এ কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করেছে ইউসুফ। হারুন মেম্বর বলেন, গত ১৫ মার্চ খনন কাজ শেষ করেছেন। তার আগে মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা একাধিকবার সরেজমিনে এসে ত্রুটি ধরায় একই পুকুর কয়েকবার খনন করতে হয়। এখন তাদেরকে বিল দেয়া হচ্ছেনা। এজন্য ইউসুফ তালুকদারকে দায়ী করেন হারুন মেম্বর। ইউসুফের তদারকিতে খননের কাজ হয়েছে জানান হারুন।
এ প্রসঙ্গে ইউসুফ তালুকদার প্রথমে অস্বীকার করে বলেন, ‘ভোলানাথ গুচ্ছগ্রামে ৪ পুকুরের কাজ আমার না। আমি কিছু জানিও না। আওয়ামীলীগের কামাল হাওলাদার, শাহআলম চৌকিদার, হারুন মেম্বর, যুবলীগের পারভেজ এই কাজের মালিক। আমি তাগো সহযোগীতা করছি’। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, তিনিই মৎস্য অফিস থেকে চারটি প্রকল্প গুছিয়ে ছিলেন। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য উল্লেখিত আওয়ামীলীগ নেতাদের নিয়ে কাজগুলো করতে বলেন।
সঠিকভাবে মাটি কাটানো হয়েছে দাবী করে ইউসুফ বলেন, মাটি নরম থাকায় ৩টি পুকুরে ভেকু মেশিন নামাতে না পেরে শ্রমিক দিয়ে মাটি কাটা হয়। তীরের মাটি কিছুটা ধুয়ে যাবার পর ঠিক হয়ে যাবে বলে দাবী ইউসুফের।
জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের ফরাজী বলেন, প্রকল্পগুলোর ব্যাপারে মৎস্য কর্মকর্তারা ও মেম্বর হারুন তাকে অন্ধকারে রেখেছেন। তাকে কিছুই জানানো হয়নি। পরে স্থানীয়দের কাছে শুনেছেন কাজটিতে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে।
মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন বলেন, পুরতন আদর্শ গ্রামের ৩টি পুকুরে নানান সমস্যা থাকায় প্রকল্প অনুযায়ী কাজ করা যায়নি। যতটুকু কাজ করা হয়েছে ততটুকু বিল প্রদান করা হবে। অবশিষ্ঠ টাকা প্রকল্প তহবিলে ফেরত যাবে। ভিক্টর বাইন বলেন, নতুন আদর্শ গ্রামে ১৫৭০ ফুট লম্বা জলায়শটি প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী দুটি প্রকল্প করে পুন:খনন কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে এখনও সংশ্লিষ্টদের পুরো বিল দেয়া হয়নি। দুই ব্যক্তির একই জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা ভুল হতে পারে।
মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশালের উপ পরিচালক আনিছুর রহমান তালুকদার বলেন, স্থানীয় কয়েক ব্যক্তি ভোলানাথ গুচ্ছগ্রামে পুকুর পুন:খননে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে তার কাছে এসে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তিনি জেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে বলেছেন।##

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *