গৌরবের ৬৮ বছরে পদার্পণ করেছে প্রাচ্যের ক্যামব্রিজখ্যাত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। রাজশাহী শহর থেকে ৫ কিলোমিটার পূর্বে মতিহারের সবুজ চত্বরে অবস্থিত ছায়া সুনিবির একটি ক্যাম্পাস। ভেতরের প্যারিস রোডের গাছগুলোর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকার মতই এটি দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের বুকে। ঠিক যেমনিভাবে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের বুকে। নাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৪৭ সালের স্যাডলার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবীতে প্রথম আন্দোলন শুরু হয়।
পরিক্রমায় ১৯৫০ সালে রাজশাহীর বিশিস্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠিত হয় এবং ১৯৫২ সালে প্রথমবারের মত শহরের ভুবনমোহন পার্কে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবীতে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা আর আন্দোলনের পর পূর্ববঙ্গীয় আইনসভার সদস্য আইনজীবী মাদার বখশের ঐকান্তিক প্রচেস্টায় ১৯৫৩ সালের ৩১ মার্চ প্রাদেশিক আইনসভায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাশ হয়। ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয় গৌরব ও অহংকারের প্রতীক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের স্বাধীনতার সংগ্রামসহ অসংখ্য আন্দোলনে গৌরবোজ্জল ইতিহাস রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির। ১৯৬৯’র গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মুহাম্মদ শামসুজ্জোহা। যিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী।
তাঁর এই নির্মম হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়েই সারা দেশে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম বেগবান হয়ে ওঠে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর নেতৃত্বে। এভাবে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের রয়েছে গুরুত্বপূর্ন অবদান।

শিক্ষা, গবেষণার পাশাপাশি মুক্তবুদ্ধি চর্চা এবং সংস্কৃতির বিকাশে এ বিশ্ববিদ্যালয়টি তাঁর সূঁচনালগ্ন থেকে অদ্যবধি দায়িত্ব পালন করে আসছে। আর্ন্তজাতিক পরিমন্ডলেও এর সুখ্যাতি রয়েছে বিভিন্ন ভাবে। দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আলোকে বিশ্বের উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-গবেষণার মানোন্নয়ন যেমন চলছে, ঠিক তেমনই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অনেক শিক্ষার্থী এ বিশ্বদ্যিালয়ে অধ্যয়ন করছেন। অনেক আর্ন্তজাতিক মানের গবেষক রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। গবেষণার ক্ষেত্রে আর্ন্তজাতিক স্বীকৃতিও মিলেছে বহুবার।
২০১৯ সালে বিজ্ঞান গবেষণার ভিত্তিতে ‘সিমাগো স্কপাসের’ জরিপে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম স্থান দখল করেছিল। এভাবে বহু ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়টি তার সক্ষমতা প্রকাশ করে চলছে। বাংলাদেশ তথা উত্তরাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠির পশ্চাৎপদতা কাটিয়ে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত করার পিছনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অনস্বীকার্য।
অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম ও গৌরবোজ্জল ইতিহাসের স্বাক্ষী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানের চ্যালেঞ্জগুলো উত্তরণ করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জিবিত হয়ে আলোকিত করবে দেশ ও জাতিকে। জন্মদিনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে রইল সেই প্রত্যাশা ও শুভ কামনা।
লেখক: উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. ছাদেকুল আরেফিন মাতিন, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।
