১১ দিনে আক্রান্ত ও মৃত্যু জুনের দ্বিগুন : রোগীর চাপে বেসামাল শেবাচিমে

Spread the love

নাগরিক রিপোর্ট : ববার রাতে বরিশাল শেরবাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ভর্তি হন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী মো. অলিউল্লাহ। শয্যা না পাওয়ায় দোতালার মেঝেতে জায়গা হয় তার। প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট ছিল অলিউল্লাহর। বার বার অক্সিজেন লেভেল নেমে যাচ্ছিল। অলিউল্লাহর বাবা সিদ্দিকুর রহমান সোমবার দুপুরে বলেন, রোববার সারারাত চেষ্টা করেও ছেলের জন্য অক্সিজেনের ব্যবস্থা করতে পারিনি। তবে সোমবার দুপুরে দুইতলা থেকে তিনতলায় একটি শয্যা জুটেছে। সেখানে অক্সিজেন সেবা পাওয়ায় অলিউল্লাহর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হচ্ছে।
বরিশাল নগরীর নতুন বাজারের বাসিন্দা রিমা কর্মকার (৩০) প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট নিয়ে সোমবার সকাল ১০টায় ভর্তি হয়েছেন শেবাচিম’র করোনা ইউনিটে। রিমার স্বামী সুমন কর্মকার বিকালে জানান, ৫ তলার মেঝেতে রেখে রিমাকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। দুপুরের পর সেন্ট্রাল অক্সিজেন সাপোর্ট পেয়েছি। খুব অসহায় অবস্থায় আছি। একের পর এক মুমুর্ষ রোগী আসছে হাসপাতালে।
বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্র বরিশাল শেরবাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালে গত বছর মার্চে ৫০ শয্যা দিয়ে শুরু করা হয় করোনা ইউনিট। রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় পর্যায়ক্রমে এটি ৩০০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও এখন সেখানে রোগী সামাল দেয়া যাচ্ছেনা। সোমবার দুপুর পর্যন্ত করোনা ওয়ার্ডে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৩০৭ জন রোগী। আইসিইউ’র ২২টি শয্যার সবকটি রোগীতে পূর্ন।
শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম সোমবার দুপুরে জানান, যতক্ষন পর্যন্ত সামর্থ থাকবে রোগী ভর্তি নেয়া হবে। গত এক সপ্তাহ আগেও ১০০ শয্যা বৃদ্ধি করা হয়। কিন্ত শয্যা বৃদ্ধি করে অতিরিক্ত রোগী ভর্তি নেয়া হলে অক্সিজেন সংকট দেখা দিতে পারে। তাই বরিশাল জেলা সদর হাসপাতালে (জেনারেল হাসপাতাল) করোনা ইউনিট চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সেখানে দ্রুত সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ কার্যক্রম চালুর সুযোগ আছে।
জেলা সদর হাসপাতালের আবসিক চিকিৎসক ডা. মলয় কৃঞ্চ বড়াল জানান, হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ড ভবনটিকে ২২ শয্যার করোনা ইউনিট হিসাবে চালু করা হয়েছে। চালুর পর পরই গতকাল সোমবার সেখানে ১ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। ডায়রিয়া ওয়ার্ডটি হাসপাতালের ৩ নম্বর ভবনে স্থানান্তর করা হয়েছে।
শেবাচিম হাসপাতালে করোনা সংক্রান্ত তথ্য কর্মকর্তা জাকরিয়া খান স্বপন বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রামন শুরুর পর এ হাসপাতালে এত সংখ্যক রোগী আগে কখনও হয়নি। চিকিৎসক ও আইসিইউ সহ নানা সংকটের মুখে প্রতিদিনই নতুন রোগী ভর্তি হয়ে হাসপাতালটির চিকিৎসা ব্যবস্থা দুর্বিসহ করে তুলেছে। হাসপাতালটিতে বেড়েছে মৃত্যুর সংখ্যাও। গতকাল সোমবার করোনা ওয়ার্ডে একদিনে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি।
শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের একাধিক স্বজন জানিয়েছেন, পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে প্রভাবশালী রোগীর স্বজনরা অক্সিজেন সিলিন্ডার মজুদ করে রাখছেন। সাধারন রোগীরা প্রয়োজনের হলে সময়মতো অক্সিজেন পানন না। তবে করোনা ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত শেবাচিম হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মনিরুজ্জামান শাহীন সোমবার দুপুরে বলেন, শেবাচিমে আপাতত অক্সিজেন সংকট নেই। সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা (৯ হাজার লিটারের) আছে ১১৫ শয্যায়। এছাড়া ৩০০টি ১২ লিটার ধারন ক্ষমতার সিলিন্ডার আছে। যা দিয়ে এখনও পর্যাপ্ত সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে রোগী আরও বাড়লে অবস্থা ভয়াবহ হবে। ১০০ শয্যা বাড়ানো হয়েছে তড়িঘড়ি করে। তাই সব ধরনের সাপোর্ট দিতে কিছুটা সময় লাগছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে করোনা ওয়ার্ডের একজন চিকিৎসক জানান, শেবাচিমের করোনা ইউনিট এখন রোগীর চাপে বেসামাল। মেঝেতে রেখে রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ওই চিকিৎসক বলেন, ৮০ ভাগ রোগীরই অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৭০ এর নিচে। এদের অনেকের আইসিইউ প্রয়োজন হলেও ২২টি আইসিইউ’র একটিও খালি নেই।
গত ১১ দিনে ৬ জেলাতে করোনা পজিটিভ শনাক্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যাতেই বলে দেয় করোনা সংক্রামন পরিস্থিতি প্রতিদিনই অবনতি হচ্ছে বরিশাল মহানগর ও বিভাগের ৬ জেলায়।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, গত জুন মাসে ৬ জেলাতে যে সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত ও মারা গেছে, তার দ্বিগুনেরও বেশী আক্রান্ত ও মারা গেছে ১ জুলাই থেকে গত এগার দিনে। তবে শনাক্তের চেয়ে ৩গুন বেশী মৃত্যু ঘটেছে উপসর্গে।
১ জুলাই থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত ৬ জেলায় পাঁচ হাজার ৮৪ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং পজিটিভ শনাক্ত হয়ে মৃত্যুবরন করেছেন ৪৭ জন। অথচ পুরো জুন মাসে বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৯৪ জন এবং ১৯ জন মারা যান। গত ১১ দিনে শুধু বরিশাল শেবাচিম হাসপতালে করোনার উপসর্গে মারা গেছেন ৯৯ জন।
বিভাগে করোনাভাইরাস সংক্রামন বিপদজনক পর্যায়ে গেছে জানিয়ে বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ পরিচালক ডা. শ্যামল কৃঞ্চ মন্ডল বলেন, বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে করোন ওয়ার্ডে রোগীর ভীড় বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে জেলা সদর হাসপাতারে সোমবার থেকে নতুন করে করোনা ওয়ার্ড স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে সর্বোচ্চ ৫০ শয্যার ওয়ার্ড চালূ করা যাবে।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেয়া তথ্যে মতে, গত ১১ দিনে বিভাগে মৃত্যুবরন করা ৪৪ জন পজিটিভ রোগীর মধ্যে ১৭ জনই পিরোজপুরের।
বরিশাল মহানগর সহ জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা অপর ৫ জেলার চেয়ে অনেক বেশী। বিভাগে মোট আক্রান্ত পাঁচ হাজার ৮৪ জনের মধ্যে এক হাজার ৮১৯ জনই বরিশালের।
গত ১১ দিনে ঝালকাঠীতে এক হাজার ১০৫ জন আক্রান্ত ও ১১ জন মারা গেছেন। পটুয়াখালী জেলায় ৪২৭ জন আক্রান্ত হলেও মারা গেছেন মাত্র ২ জন। বরগুনা জেলায় ১১ দিনে ৪৮৬ জন করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছেন। এ সময়ের মধ্যে জেলাতে মারা গেছেন ৬ জন।
চলমান করেনাভাইরাস সংক্রামনে বিভাগের মধ্যে কিছুটা নিরাপদে আছে ভোলা জেলা। এ জেলাতে গত ১১ দিনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। তবে পজিটিভ শনাক্ত হয়েছেন ২৪১ জন।##

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *