নাগরিক রিপোর্ট : বরিশালে বুধবার রাতে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বাসায় হামলা, আনসারদের গুলিবর্ষন এবং পড়ে আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পর মেয়রকে প্রধান আসামী করে দুই মামলা দায়েরের ঘটনায় বরিশালের রাজনীতিকদের মধ্যে অস্বস্তি বিরাজ করছে। তারা পুরো বিষয়গুলোকে অনাকাংক্ষিত এবং রাজনীতির জন্য দুভার্গ্যজনক বলে আখ্যায়িত করে বলেছেন, নগরে লাগাতার রাজনৈতিক দৃর্বৃত্তায়নের ফলে যে প্রতিকারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল তার বিরুদ্ধে বিস্ফোরন ঘটেছে। যে রাজনীতির মধ্যে গণতান্ত্রিক সহনশীলতা নেই, সেই রাজনীতির পরিনাম কখনও সুখকর হয়না।
ইউএনওর বাসায় হামলার ঘটনাকে স্থানীয় রাজনৈতিক আচরনের খন্ডিত অংশ মন্তব্য করে বরিশালের রাজনৈতিক নেতারা আরও বলেছেন, পুরো ঘটনায় স্থানীয় আওয়ামীলীগের দুইপক্ষের চাপা দ্বন্দ্বের বহি:প্রকাশ ঘটেছে। ক্ষোভ ঝাড়তে একপক্ষ প্রশাসনের ওপর চড়াও হয়েছে।
বরিশালে বুধবার রাতের এবং পরবর্তী ঘটনা নিয়ে জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি নজরুল হক নীলু বলেন, আমরা শুনেছি মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের অপ্রকাশিত দ্বন্দ্ব চলছে। তার চুড়ান্ত রূপ দেখলাম বুধবার রাতে।
নজরুল হক নীলু বলেন, আমরা এটাকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বলতে চাইনা, কারন সরকার অতিমাত্রায় আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। সেই নির্ভরশীলতার কারনে তারা রাজনৈতিক নেতৃত্ব মানতে চায়না। অপরদিকে মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়। তার বাবা মন্ত্রী- প্রভাবশালী রাজনীতিক। এসব কারনে মেয়রের মধ্যেও ‘ড্যামকেয়ার’ ভাব আছে। সবকিছুতেই মেয়রকে প্রধান অতিথি বা তাকে দিয়ে উদ্বোধন করাতে হবে এরকম রেওয়াজ চালু করা হয়েছে। এই একনায়কতন্ত্র না মানলে নানান অঘটন ঘটে। এটা একধরনের রাজনৈতিক দৃর্বৃত্তায়ন। রাজনীতিকদের মধ্যে গণতন্ত্র চর্চা এবং সহনশীলতা না থাকলে তার ফলাফল শুভ হয়না। নীলু বলেন, ঘটনার পর নগরীর পরিচ্ছন্ন কাজ বন্ধ রাখা হয়। এতে জনদূর্ভোগ হয়েছে। মানুষ এসব কাজ ভালভাবে নিচ্ছেনা।
অ্যাডমিনিষ্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাশোসিয়েশনের বিবৃতি প্রসঙ্গে নজরুল হক নীলু বলেন, তাদের বিবৃতির ভাষা গ্রহনযোগ্য নয়। তবে তারা একটি কঠোর বিবৃতি দিতে সাহস পেয়েছেন। কেন সাহস পেয়েছে তা দেশবাসী জানে।
বরিশালে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক দৃর্বৃত্তায়ন চলছে মন্তব্য করে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) জেলা শাখার সদস্য সচিব ডা. মনিষা চক্রবর্তী অভিযোগ করেন, বাসদের একাধিক দলীয় কর্মসূচীতে নগর আওয়ামীলীগ হামলা করেছে। বিসিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও তারা হানা দিয়েছে। কোন ঘটনার বিচার বা প্রতিকার হয়নি। এ কারনে বুধবার রাতের মতো একটি বড় ধরনের ঘটনা ঘটার ক্ষেত্র তৈরী হয়েছে। ওই রাতে অনেক অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিস্ফোরন ঘটেছে।
ডা. মণীষা বলেন, গোটা নগরীতে শত শত ব্যানার ফেষ্টুন দৃশ্যমান। কিন্ত হঠাৎ কেন রাতে সদর উপজেলা চত্বরের ব্যানার অপসারনের প্রয়োজন হলো তা নিয়ে নগরবাসীর মনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের উপযুক্ত বিচার দাবী করে ডা. মণীষা বলেন, এসব ঘটনার জের ধরে নগরজীবনে যেন কোন দূর্ভোগ নেমে না আসে সেদিকে সবাইকে নজর দিতে হবে।
অ্যাডমিনিষ্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাশোসিয়েশনের বিবৃতি নিয়ে কোন মন্তব্য করতে অপরাগতা জানিয়ে ডা. মণীষা বলেন, ওই রাতে যা ঘটেছে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তার বিচার হওয়া উচিত।
কমিউনিষ্টি পার্টির বরিশাল জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান সেলিম ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, এখন যারা মুখোমুখি তারা একত্রে জনগণের অধিকার হরন করেছেন। সরকার যাদের নিযে দেশ পরিচালনা করছেন তাদের সঙ্গেই দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন। অধ্যক্ষ সেলিম বলেন, আওয়ামীলীগ জনগণের দল, তারা যদি প্রশাসনের কাছে পরাজিত তাতে একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে আমারও আপসোস হয়।
ইউএনওর বাসায় হামলা গ্রহনযোগ্য নয় জানিয়ে অধ্যক্ষ সেলিম প্রশ্ন রেখে বলেন, ওই রাতে বাধ্য হয়ে গুলিবর্ষন করতে হয়েছিল না-কি অস্থিরতার ফলাফল। যারা হামলা করেছে সেটা তাদের সার্বিক আচরনের খন্ডিত অংশ মন্তব্য করে তিনি বলেন, শোনা যায় উদ্দেশ্যে প্রনোদিত হয়ে সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে ব্যানার খুলতে পাঠানো হয়েছিল। অধ্যক্ষ সেলিম বলেন, বরিশালে যে লড়াইটা শুরু হয়েছে তারমধ্যে জনগণের কোন স্বার্থ নেই।
বরিশালের ঘটনায় আমরা উদ্বিগ্ন-অস্বস্তিতে আছি মন্তব্য করে গণফোরামের বরিশাল জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট হিরণ কুমার দাস মিঠু বলেন, যা ঘটেছে তা রাজনীতিকদের জন্য শুভকর নয়। স্থানীয় রাজনীতিক সংকটের কারনেই এমনটা ঘটেছে। তিনি বলেন, ইউএনও সরকারি কর্মকর্তা। আর সিটি মেয়রও সরকারের অংশ। উভয়পক্ষকেই সহিঞ্চুতার পরিচয় দিতে হবে। অ্যাডভোকেট হিরণ কুমার দাস ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করার দাবী জানিয়ে বলেন, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিবৃতি দেয়ার বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত ছিলো।
বিএনপির বরিশাল দক্ষিণ জেলা শাখার সভাপতি এবায়েদুল হক চাঁন মনে করেন, বুধবার রাতের ঘটনা আওয়ামীলীগের স্থানীয় দুইপক্ষের চাপা দ্বন্দ্বের বর্হিপ্রকাশ। মেয়র পক্ষ তাদের ক্ষোভ ঝাড়তে প্রশাসনের ওপর চড়াও হয়েছে। চাঁন বলেন, যতদুর জেনেছি সদর উপজেলা চত্বরে প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুকের ব্যানার বেশী। প্রতিহিংসার কারনেই ওই ব্যানার খুলতে লোক পাঠানো হয়েছিল। ইউএনওর সঙ্গে পরমর্শ না করে রাতে কেন ব্যানার খুলতে কেন পাঠানো হলে সে বিষয়টি তদন্ত হলে স্থানীয় রাজনীতির আসল মুখোশ উম্মোচিত হবে বলে দাবী করেন চাঁন। তিনি বলেন, এই নগরের মানুষ মুখ খুলতে পারেনা। এখন আল্লাহর বিচার চলছে।
জাসদ বরিশাল জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল হাই মাহবুব বলেন, শোকের মাসে যা ঘটেছে তা অনাকাংক্ষিত ও দু:খ্যজনক। শান্ত নগরীতে এমন ঘটনা অনভিতপ্রেত। একদিকে জনগণের প্রতিনিধি মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ অন্যদিকে সরকারের প্রতিনিধি ইউএনও। উভয়পক্ষকেই নমনীয় হওয়া উচিত ছিল। মেয়রকে প্রধান আসামী করে দুটি মামলা দায়েরর পেছনে বিশেষ কোন মহলের প্রভাব কাজ করেছে বলে মনে করেন আব্দুল হাই মাহবুব। সরকারের উচ্চ মহল থেকেই উদ্যোগ নিয়ে উভয়পক্ষের জন্য সম্মানজনক একটা সমাধান উচিত বলে মনে করেন তিনি।
জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ন মহাসচিব এবং বরিশাল জেলা শাখার সদস্য সচিব ইকবাল হোসেন তাপস মনে করেন, মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমম্বয়ের অভাবের কারনে বুধবার রাতের ঘটনা ঘটেছে। এর পেছনে রাজনৈতিক কোন ইস্যু আছে বলে তিনি মনে করেন না। ইকবাল হোসেন তাপস আরো বলেন, বিষয়টির দ্রুত উপযুক্ত সমাধান হওয়া প্রয়োজন। এ অবস্থা চলতে থাকলে জনগণ ভোগান্তিতে পড়বে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বরিশাল জেলা শাখার সাধারন সম্পাদক উপাধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলাম বলেন, প্রশাসনের কাধে ভর করে সাদিক আবদুল্লাহ মেয়র হয়েছেন। তাই প্রশাসন তাকে মূল্যায়ন করেনা। এখানে সুষ্ঠু রাজনীতি নেই। সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে মনে করছি, অভ্যন্তরীন কোন্দলের জেরে ঘটনাটি ঘটেছে। প্রশাসন উপযুক্ত আইনী পদক্ষেপ নিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা প্রকৃত দোষীদের বিচার দাবী করছি।##
