নাগরিক রিপোর্ট : বরিশাল সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে গত বুধবার রাতে জাতীয় শোক দিবসের ব্যানার-ফেষ্টুন অপসারনকে কেন্দ্র করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবনে যুবলীগ-ছাত্রলীগের হামলা ও পুলিশের সঙ্গে রক্তক্ষায়ী সংঘর্ষের ঘটনায় প্রশাসন ও আওয়ামীলীগের সমঝোতার পর এখানকার দৃশ্যমান পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত। ঘটনার পর আত্মগোপনে থাকা আওয়ামীলীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা নগরীতে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে চোখে গুলিবিদ্ধ ৩ তিন আওয়ামীলীগ নেতাকর্মী চিরতরে একচোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তাদের স্বজনরা।
এদিকে বুধবার রাতের ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মুনিবুর রহমান ও বরিশাল কোতোয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলামের বদলী নিয়ে নগরীতে নানামুখী গুঞ্জন রয়েছে। খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, সদর উপজেলার ইউএনও এবং কোতোয়ালী মডেল থানার ওসিকে বদী কর হয়েছে। তবে দুজনেরই বদলীর আদেশ হয়েছে গত বুধবার রাতে অনাকাংক্ষিত ঘটনার আগে।
বুধবার রাতের ঘটনার রোববার রাতে বিভাগীয় কমিশনার মো. সাইফুল হাসান বাদলের বাসভবনে বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং সিটি মেয়র ও সেরনিয়াবাত আবদুল্লাহ সহ আওয়ামীলীগ নেতাদের মধ্যে সমঝোতা বৈঠকের পর নগরীতে টানা চারদিনের থমথমে পরিস্থিতির অবসান ঘটে। সোমবার থেকে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হচ্ছে।
মেয়র বরিশালে সচল নগর ভবন
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিটি মেয়র ও নগর আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত নগরীর কালিবাড়ি সড়কের বাসভবনেই অবস্থান করছিলেন। তবে ঘটনার পর থেকে তিনি নগর ভবনে অফিস করছেন না। এদিকে সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্বপন কুমার দাস মঙ্গলবার বিকালে জানান, বুধবার রাতে মেয়রের ওপর গুলিবর্ষনের প্রতিবাদে কর্মবিরতীতে থাকা করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রোববার থেকে স্বাভাবিক কার্যক্রমে যোগদান করেছেন। নগর ভবনে এখন স্বাভাবিক কাজকর্ম চলছে।
আগেই বদলী ইউএনও-ওসি
বরিশাল সদর উপজেলার ইউএনও মো. মুনিবুর রহমানকে বরিশাল থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রাণালয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব পদে পদায়ন করা হয়েছে। এ আদেশ হয়েছে গত ১০ আগষ্ট। এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে ইউএনও মো. মুনিবুর রহমান মঙ্গলবার রাতে সমকালকে বলেন, বরিশাল জেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষ যেদিন তাকে অবমুক্তির আদেশ দিলে তিনি মন্ত্রাণালয়ের নতুন কর্মস্থলে যোগদান করবেন। অপরদিকে কোতোয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলামকে সিলেট রেঞ্জে বদলীর আদেশ হয় গত ১৮ আগষ্ট সকালে। ২৫ আগষ্টের মধ্যে ওসি নুরুল ইসলামকে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের আদেশ দেয়া হলেও তিনি বর্তমান কর্মস্থলেই আছেন। বরিশাল মহানগর পুলিশের দায়িত্বশীল একটি সুত্র নিশ্চিত করেছেন ওসি নুরুল ইসলামের বদলীর আদেশ সাময়িক স্থগিত হয়েছে।
চোখ হারালেন তিন নেতা
বুধবার রাতে উপজেলা পরিষদ চত্বরে আওয়ামীলীগ ও অঙ্গ সংগঠনের সঙ্গে সংঘর্ষের শুরুতে সেখানে দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা সর্টগানের গুলিবর্ষন করে। এতে অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হন। তারমধ্যে ২৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সভাপতি মনির হোসেন, ১৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামীলীগ কর্মী তানভীর ও নগরীর উপকন্ঠ কাশীপুর ইউনিয়নর পরিষদের সদস্য রায়হান একটি করে চোঁখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তাদের স্বজনরা। এ তিনজন ঢাকায় জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনষ্টিটিউট ও হাসপাতালে পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসাধীন আছেন।
মনির হোসেনের পরিবার থেকে দাবী করা হয়েছে, মনির ডান চোঁখের দৃষ্টি পুরোপুরি হারিয়েছেন। ওই চোখে আর দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবার কোন সম্ভবনা নেই বলে চিকিৎসকরা স্বজনদের জানিয়েছেন। তানভীরের ভাই তানজিল জানান, তানভীরের ডানচোখে ৫টি গুলিবিদ্ধ হয়েছে। একটিও বের করা যায়নি। সেগুলো বের করার চেষ্টা করা হলে ডানচোখেরও দৃষ্টিশক্তি হারাবে বলে চিকিৎসকরা তাদের জানিয়েছেন। রায়হানের স্বজনরা জানিয়েছেন, তারও ডান চোঁখের দৃষ্টিশক্তিও পুরোপুরি হারাতে হবে।
একচোখের দৃষ্টি হারানো তিনজনের স্বজনরা জানান, তারা পুলিশ হেফাজতে থাকায় স্বাভাবিক চিকিৎসা বিঘিœত হচ্ছে। দল থেকে খোঁজ খবর নেয়া হলেও এখন পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা পাননি কেউ। উন্নত চিকিৎসার জন্য দলের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট একেএম জাহাঙ্গীর বলেন, দলের পক্ষ থেকে ওই তিনজনের উন্নত চিকিৎসায় ব্যবস্থা নেয়া হবে। মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকেও চিকিৎসা সহায়তা করার আশ্বাস দেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বরিশাল সদর উপজেলা পরিষদে সদর আসনের সংসদ সদস্য পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্ণেল (অব:) জাহিদ ফারুক শামীমের স্থাপন করা বিলবোর্ড-ব্যানার বুধবার রাত ১০টায় সিটি করপোরেশনের কর্মী পরিচয়ে অপসারন করতে যায় মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর অনুসারী যুবলীগ-ছাত্রলীগের একদল কর্মী। এসময় প্রথমে আনসার সদস্যরা ও পরে ইএনও মো. মুবিবুর রহমান বাঁধা দিলে তার বাসভবনে হামলা করে ছাত্রলীগ-যুবলীগ কর্মীর। এর জের ধরে রাত ২টা পর্যন্ত পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় ইউএনও এবং পুলিশের দায়ের করা মামলায় জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ন সাধারন সম্পাদক হাসান মাহমুদ বাবু এবং সিটি কাউন্সিলর ও আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ সাইয়েদ আহমেদ মান্নাসহ ২২ নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়ে কারাবন্দী রয়েছেন।##
