নদীর দেশের ভরসা নৌ ফায়ার সার্ভিসের বেহাল দশা, ধুকছে ‘অগ্নিঘাতক’

Spread the love

নাগরিক রিপোর্ট : নদীতে অগ্নিদূর্ঘটনা নিয়ন্ত্রনে নৌফায়ার ষ্টেশনের সবচেয়ে শক্তিশালী জাহাজের নাম ‘অগ্নিঘাতক’। বরিশাল নৌফায়ার ষ্টেশনের আওতাধীন এ জাহাজটির স্থায়ী ঠিকানা নগরীর পরিত্যাক্ত মৎস্য অবতরন কেন্দ্রে (বিএফজি) সংলগ্ন কীর্তণখোলা নদীর তীরে। সেখান থেকে ১৭ কিলোমিটার দুরে ঝালকাঠীর সুগন্ধা নদীতে বৃহস্পতিবার দিবাগত মধ্যরাতে ঢাকা থেকে বরগুনাগামী অভিযান- ১০ লঞ্চে অগ্নিদূর্ঘটনা ঘটে।। অগ্নিকান্ডের খবর পেয়ে ‘অগ্নিঘাতক’ রাত ৩টা ২০ মিনিটে রওনা হয়ে শুক্রবার বিকাল ৩টায় ঘটনাস্থলে পৌছায়। অর্থাৎ ১৭ কিলোমিটার দুরের ঘটনাস্থলে পৌছতে ‘অগ্নিঘাতক’র সময় লেগেছে ১২ ঘন্টা। নৌফায়ার ষ্টেশনের আরও দ্রুতগামী যান স্পীডবোটটি একই সময়ে রওনা হয়ে সাড়ে ৩ঘন্টা পর সকাল সাড়ে ৬টায় ঘটনাস্থলে পৌছে। রাতের কুয়াশা ভেদ করে নৌযান দুটির চলার সক্ষমতা না থাকায় এ অবস্থা হয়।
নদীমাতৃক দক্ষিণাঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন ‘বরিশাল নৌফায়ার ষ্টেশন’টির এটি খন্ডচিত্র মাত্র। এটি বরিশাল বিভাগের ৬ জেলা এবং ঢাকা বিভাগের ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরিয়তপুর ও রাজবাড়ি জেলার জন্য একমাত্র নৌফায়ার ষ্টেশন। প্রতিষ্ঠানটি নানামুখী সংকটে জর্জরিত। নেই দ্রুতগতির আধুনিক নৌযান ও উদ্ধার অভিযান সরঞ্জাম এবং প্রয়োজনীয় জনবল। দূর্ঘটনাকবলিত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠাতে নেই একটি রিভার অ্যাম্বুলেন্স। অথচ উপকূলের দশ জেলায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার নৌপথে (নদনদী ও সাগর মোহনায়) যেকোন নৌদূর্ঘটনা পরবর্তী জানমালের নিরাপত্তা ও উদ্ধার অভিযানের দায়িত্ব এ প্রতিষ্ঠানটির। তাদের দুরাবস্থা দেখলে মনে হবে নদীপথের নিরাপত্তায় ‘ঢাল-তলোয়ার’ একটি বিহীন প্রতিষ্ঠানের নাম ‘বরিশাল নৌফায়ার ষ্টেশন’।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের বরিশাল দপ্তরের উপ সহকারী পরিচালক মো. বেল্লাল হোসেন বলেন, পটুয়াখালীতে আরেকটি রিভার ফায়ার ষ্টেশন থাকলেও সেখানে ১টি স্পীডবোট ও দুজন ডুবুরী আছেন। ১০ জেলায় যেকোন অগ্নিকান্ডসহ যেকোন নৌদূর্ঘটনায় জীবিত-মৃতদের উদ্ধার কাজটি বরিশাল রিভার ফায়ার ষ্টেশনকে করতে হয়। তাদের পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জাম না থাকায় সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের (কোষ্টগার্ড, বিআইডব্লিউটিএ এবং নৌপুলিশ) সঙ্গে সমম্বয় করে কাজ করেন। সংকটের বিষয়গুলো উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তারা সমাধানের আশ্বাসও দিয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটির ডুবুরী দলনেতা মো: হুমায়ুন কবির বলেন, ১০ জেলার জন্য আছেন মাত্র ৪জন ডুবুরি। তাদের দুজন থাকেন পটুয়াখালী ষ্টেশনে। বরিশাল ও পটুয়াখালীতে ১টি করে স্পীডবোট। একমাত্র শক্তিশালী জলযান অগ্নিঘাতক ১৯৯৩ সালে নির্মিত হয়। সেটির গতি কমে গেছে। কুয়াশার ভেদ করে চলার শক্তিশালী রাডার নেই এ জাহাজে। স্পীডবেটেরও একই অবস্থা। ডুবুরীদের জন্য বরাদ্ধ ড্রাইভিং (নদীতে ডুব দেয়ার) সরঞ্জামাদীও অনেকটা অকেজো। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কানেকটিং ফাইট, অ্যাংকর, বিসিডি, অরিন, বাইনোকুলার, লাইফ লাইন, ড্রাইভিং সুট।
অগ্নিঘাতক’র চালক মো: রিপন ও এনামুল বলেন, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ঝালকাঠীর সুগন্ধা নদীতে যাত্রীবাহি লঞ্চে অগ্নিকান্ডের খবর পেয়ে রাত ৩টা ২০ মিনিটে রওনা দেন। ঘন কুয়াশায় ৫ হাত দুরেও কিছু দেখা যাচ্ছিলনা। পথে জাহাজটি দিক হারিয়ে একটি ডুবোচরে আটকে যায়। শুক্রবার বেলা ১২টায় জোয়ারে পানি বৃদ্ধি পেলে জাহাজটি চরমুক্ত হয়ে বিকাল ৩টায় ঘটনাস্থলে পৌছান। তার আগেই সব শেষ হয়ে গেছে। ‘অগ্নিঘাতক’ ঘন্টায় ৮ নটিক্যাল চলতে পারে বলে জানান ওই দুই চালক। তারা বলেন, বর্তমান সময়ে নির্মিত জাহাজের গতি ঘন্টায় প্রায় ২০ থেকে ২০ নটিক্যাল। অগ্নিঘাতকের ইঞ্জিনসহ সবকিছুই এখন মান্ধাদা আমলের হওয়ায় এটি অচল সার্ভিসে পরিনত হয়েছে।
আরেক ডুবরি মো: রাব্বি বলেন, অগ্নিঘাতকের সঙ্গে তিনি আরেকটি স্পীডবোটে ঘটনাস্থলে রওনা হন। কুয়াশায় দিক হারিয়ে তার বোটটিও একটি চরে আটকে পরে। পরে স্থানীয় একগ্রামবাসীকে বোটে তুলে তার দেখানো পথে ভোর সাড়ে ৬টায় ঘটনাস্থলে পৌছেন। যদিও তার আগে ঝালকাঠী ফায়ার ষ্টেশন পাবলিক ট্রলারে পানির পাম্পসহ ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার কাজ শুরু করেছে।
মো: রাব্বি বলেন, ডুবুরী সংকটের কারনে স্মরনকালের সবচেয়ে বড় ও ব্যতিক্রমী দূর্ঘটনায়ও উদ্ধার কাজে মাত্র দুজন ডুবুরীকে কাজ করতে হয়েছে। ১০ জেলার যেখানেই নৌদূর্ঘটনা সেখানেই ডাক পড়ে তাদের। খোলাপিকআপে ঘটনাস্থলে পৌছতে তারা নিজেরাই শারীরিকভাবে দূর্বল হয়ে পড়েন। এতো সংকটের মধ্যে বিশাল এ অঞ্চলে উদ্ধার কাজ পরিচালনা করা কঠিন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের বরিশাল বিভাগীয় উপ পরিচালক কামাল উদ্দিন ভুইয়া স্বীকার করেন যে, উপকূলীয় এলাকা বরিশালের জন্য নৌফায়ার ষ্টেশনটি যুগপযোগী নয়। সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন আধুনিক ও দ্রুতগতির অগ্নিনিবার্পক নৌযান। তাছাড়া দুরত্বের কারনে বরিশাল শহর থেকে বিভাগের ৬ জেলা ও ঢাকা বিভাগের ৪ জেলায় সেবা দেওয়া কষ্টকর। এজন্য আরও কয়েকটি নৌষ্টেশণ প্রয়োজন। বিশেষ করে হিজলা উপজেলা সংলগ্ন মেঘনায় এবং পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটায় পৃথক দুটি নৌষ্টেশনের প্রয়োজনীতা আছে।
কামাল উদ্দিন ভূইয়া বলেন, সংকটের বিষয়গুলো আগে থেকে ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সের উর্ধ্বতন কর্র্তপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন) লে: কর্ণেল জিল্লুর রহমান গত সোমবার ঝালকাঠী দূর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসেছিলেন। তিনি বরিশালে দরবার করেছেন। তখন তাকে এখানকার ফায়ার ষ্টেশনের বাস্তবচিত্র অবহিত করা হয়েছে। তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। ##

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *