নাগরিক রিপোর্ট : মা ও বোনকে নিয়ে ঢাকা থেকে নানাবাড়ি বরগুনার বেতাগী উপজেলার করুনা গ্রামে যাচ্ছিল দশম শ্রেনীর ছাত্র রিশাদ বিন সিকদার রণি (১৫)। অভিযান- ১০ লঞ্চের দ্বিতীয় তলায় ডেক যাত্রী ছিল তারা। রাত ৩টার দিকে লঞ্চে আগুন লাগলে আত্মরক্ষায় মা-বোনকে নিয়ে ছাদে ওঠে রণি। আগুন থেকে আর বাঁচা যাবেনা বুঝতে পেরে রণিকে ধাক্কা দিয়ে নদীতে ফেলে দেয় তার মা। তার আগে মা বলেন- ‘বাবা তুই বেঁচে থাক, ভাল থাকিস, লেখপড়া ঠিকমতো করিস’। উদ্ধারকর্মীরা রণিকে নদী থেকে উদ্ধার করায় সে বেঁচে আছে। তার কানে ভাসছে ধাক্কায় নদীতে পড়ে যাওয়ার আগে মায়ের সেই কথাগুলো। কিছুক্ষন পর পরই চিৎকার করে মা-বোনের স্মৃতি নিয়ে বিলাপ করতে থাকে রণি।
তার মা রিণা বেগম (৩২) ও বোন লিনা (১৪) জীবিত আছেন নাকি মৃত কেউ জানেন না। গত ২৩ অক্টোবর দিবাগত রাতে ঝালকাঠীর সুগন্ধ্যা নদীতে অভিযান- ১০ লঞ্চ ট্রাজেডির ঘটনায় প্রশাসনের নিঁখোজের তালিকাভূক্ত নিঁখোজ ৩০ জনের অন্যতম রিনা বেগম ও লিনা। তাদের আর কোনদিন সন্ধান পাওয়া যাবে কি-না তা নিয়ে উদ্বিগ্ধ স্বজনরা। মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত না হওয়ায় মিলছেনা কোন আর্থিক সাহায্যে।
এদিকে আর কোন মৃতদেহ পাওয়ার সম্ভবনা না থাকায় উদ্ধার অভিযানও স্থগিত করেছে প্রশাসন। নিঁখোজদের স্বজনরা বলেছেন, আগুনে পুড়ে অঙ্গার পরিচয়হীন মৃতদেহের ডিএনও প্রতিবেদনই এখন তাদের শেষ ভরসা। তারা অপেক্ষায় আছেন- কবে আসবে ডিএনএ রিপোর্ট।
বরগুনা জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান বলেন, অভিযান- ১০ ট্রাজেডিতে উদ্ধার মোট ৪৫টি মৃতদেহ তারা গ্রহন করেছেন। পুড়ে অঙ্গার ২৫ মৃতদেহের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। বরগুনা সদরের পোটকাখালী গ্রামের খকদোন নদী তীরে পৃথক ২১টি কবরে ২৩ টি মৃতদেহ শনাক্ত করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক বলেন, দুুটি মৃতদেহের সঙ্গে সন্তানের মৃতদেহ আকরে থাকায় তা পৃথক করা যায়নি। ধারনা করা হচ্ছে- ওই মৃতদেহগুলো মা ও শিশু সন্তানের। অপর দুটি মৃতদেহ সমাহিত করা ঝালকাঠীতে।
তিনি বলেন, অজ্ঞাত ২৫ মৃতদেহের পরিচয় শনাক্তে ৪৮ জনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে গত ২৯ ডিসেম্বর। স্বাভাবিক নিয়মানুযায়ী পুলিশের সিআইডি বিভাগ থেকে ডিএনএ রিপোর্ট পেতে দুইমাস সময় লাগে। ফেব্রুয়ারীর শেষ সপ্তাহে রিপোর্ট পেলে কিছু সংখ্যক অজ্ঞাত মৃতদেহের পরিচয় শনাক্ত হবে।
ঝালকাঠী ফায়ার ষ্টেশন কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, দূর্ঘটনার রাত থেকে শুরু হওয়া উদ্ধার অভিযান গত রোববার (২ জানুয়ারী) স্থগিত করা হয়েছে। কারন ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, দূর্ঘটনার পর পর লঞ্চ ও নদী থেকে উদ্ধার করা হয় ৩৭টি মৃতদেহ। লঞ্চে পোড়া মৃতদেহগুলোর বেশীরভাগই ছিল কংকাল। এর পরের দশদিনে ৫টি মৃতদেহ নদীতে ভেসে উঠেছে। সর্বশেষ গত ২৯ জুলাই বিষখালী নদীর মোহনায় দুটি মৃতদেহ ভেসে ওঠে। এতদিন পর মৃতদেহ আর ভেসে ওঠার সম্ভবনা না থাকায় উদ্ধার অভিযান স্থগিত করা হয়েছে। এ কর্মকর্তা বলেন, কোথাও লাশ ভেসে ওঠলে স্থানীয়রা যাতে তাদের খবর পৌছাতে পারেন সেজন্য নদীর তীরের জনপদে তাদের মোবাইল নম্বর দেয়া আছে।
নিঁখোজরা কোথায় হারালো : প্রশাসনের তালিকায় অভিযান- ১০ লঞ্চে নিঁখোজ যাত্রী ৩০ জন। তবে রেড ক্রিসেন্টের ঝালকাঠী ইউনিটের যুব প্রধান মো. মশিউর রহমান জানিয়েছেন, তাদের তালিকায় এখনও ৫০ জন নিঁখোজ আছেন। নিঁখোজদের খোঁজে দূর্ঘটনাস্থলে আসা স্বজনদের কাছ থেকে তারা এ তথ্য সংগ্রহ করেছেন। মশিউর বলেন, ৫০ জনের তালিকায় ৩৩ জনের স্বজনরা এখনও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। অপর ১৭ জনের স্বজনদের মুঠোফোনে বার বার কল দেয়ার পরও সারা না দেয়ায় তাদের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছেনা। সুগন্ধা নদীতে এখন আর কোন স্বজনও আসেন না নিঁখোজদের খুঁজতে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীসহ আগুনে পোড়া মানুষের বিভৎসতা দেখা বেশীরভাগ প্রত্যক্ষদর্শীর ধারনা, অনেক মানুষই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ডিএনও টেষ্ট রিপোর্ট পাওয়ার পর অজ্ঞাত পরিচয়ে সমাহিত হওয়া কিছু মৃতদেহের পরিচয় মিলবে। আবার অনেকের মতে, আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের নিক্ষিপ্ত পানিতে পোড়া মানুষের কংকাল ও হাড় নদীতে পড়ে গেছে।
উদ্ধার কাজে অংশ নেয়া ফায়ার সার্ভির্সের ঝালকাঠী ষ্টেশন লিডার মো. শহীদুল ইসলাম ও ফায়ারকর্মী আল-আমিন বলেন, উদ্ধার হওয়া মৃতদেহের বেশীরভাগই ছিল কংকাল। ডিএনও টেষ্ট রিপোর্ট ছাড়া তাদের পরিচয় শনাক্তের উপায় নেই। রেড ক্রিসেন্টের যুব প্রধান মশিউর রহমান বলেন, লঞ্চের তিন তলার একটি কেবিনে ৩টি মাথার খুলি দেখে বোঝা যাচ্ছে সেখানে ৩ জন মানুষই ছিল। তিনি বলেন, লঞ্চের বিভিন্ন স্থানে লোহার ওপর সাদা আবরন দেখেছেন। এগুলো মানুষের হাড় পুড়ে পাউডারে অংশবিশেষ বলে তার ধারনা। বরিশাল নৌ ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরী মো. রাব্বী বলেন, পানিতে ডুবে যাওয়া মৃতদেহ সর্বোচচ ৪৮ ঘন্টার মধ্যে ভেসে উঠবেই। দূঘর্টনার দিনই ৯টি মৃতদেহ ভেসে ওঠে। পরবর্তী ৬দিনে পাওয়া যায় আর ৫টি। এখন আর নদীতে কোন লাশ পাওয়ার সম্ভবনা নেই।
নিঁখোজদের ফেরার স্বপ্ন দেখেন স্বজনরা : দূর্ঘটনার পর প্রশাসনের উদ্ধারকর্মীদের পাশাপাশি নিঁখোজদের স্বজনরাও ট্রলার নিয়ে সুগন্ধা নদী চষে বেড়িয়েছেন। ছুটেছেন এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে। কোথাও মৃতদেহ উদ্ধার হলেই ছুটে গেছেন সেখানে। ক্লান্ত ও হতাশা নিয়ে পর্যায়ক্রমে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন তারা। প্রশাসনের উদ্ধার অভিযান স্থগিতের খবরও জানা নেই তাদের। তবে অনেকেরই বিশ্বাস, তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বজন ফিরে আসবেন।
বরগুনার বেতাগী উপজেলার করুনা গ্রামের জগলুল বাশার বলেন, ২-৩ দিন আগে তিনি স্বপ্নে দেখেছেন তার নিঁখোজ স্ত্রী রিনা বেগম (৩২) নদীর পাড়ে হেঁটে হেঁটে নিঁখোজ মেয়ে লিনাকে খুজছেন। বাশারের স্ত্রী-মেয়ে ছাড়াও ছেলে রনি অভিযান- ১০ লঞ্চে ছিল। আগুন লাগার পর রিনা ছেলে রণিকে ধাক্কা দিয়ে নদীতে ফেলে দিলে সে বেঁচে যায়। একই উপজেলার মোকামিয়া গ্রামের খদিজা বেগম বলেন, এখনও তার মনে হচ্ছে স্বামী আরিফুল (৩৫) ও মেয়ে কুলসুম (৪) ঢাকায় বেড়াচ্ছেন। যেকোন সময়ে বাড়িতে ফিরবে। বাবার সঙ্গে ঢাকায় ফুফু বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল চার বছরের কুলসুম। বাড়িতে ফেরার পথে লঞ্চের আগুনে নিঁখোজ হয় তারা। পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী গ্রামের ডিভোর্সী নারী ফজিলাতুন্নেছা পপি (৩৭)। ঢাকায় গার্মেন্টেসে চাকুরী করে ৮ম শ্রেণী পড়–য়া মেয়েসহ মা ও এতিম ভাইবোনের ব্যয় বহন করতেন তিনি। লঞ্চের আগুন পপি নিঁখোজ হওয়ায় তাদের সংসারের বাজারই বন্ধ হয়ে গেছে বলে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদলেন মা আমেনা বেগম। তিনি বলেন, পপির মেয়ে এখনও বলছে, ‘মা ফিরে আসলে নফল নামাজ পড়ব’।
প্রতিবেদন দেয়নি ৩ তদন্ত দল : অভিযান- ১০ ট্রাজেডির ঘটনার কারন উদঘাটনে নৌ পরিবহন মন্ত্রাণালয়, বিআইডব্লিটিএ, ঝালকাঠী জেলা প্রশাসন এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স পৃথক ৪টি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। প্রত্যেককে ৭ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য বলা হয়েছিল।
জানা গেছে, এ পর্যন্ত শুধুমাত্র নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কমিটি তাদের প্রতিবেদন প্রদান করেছেন। ঝালকাঠী জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. নাজমুল আলম বলেন, তারা আরও ৭দিন সময় বৃদ্ধি করেছেন। বর্ধিত ৭দিন শেষ হওয়ার আগে তাদের প্রতিবেদন দেয়া হবে। তিনি নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন জমা দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স তদন্ত কমিটির সদস্য ঝালকাঠীর উপ সহকারী পরিচালক ফিরোজ কুতুবী বলেন, তাদের সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে কতদিন বৃদ্ধি হয়েছে তা তিনি জানেন না। বিআইডব্লিউটি’র তদন্তের বিষয়ে জানতে বরিশাল বন্দর কর্মকর্তাকে মোস্তাফিজুর রহমানকে একাধিকবার কল দেয়া হলে তিনি রিসিভ করেননি।
এদিকে বরিশাল খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশাল শেরেবাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় হাসপাতালে বুধবার পর্যন্ত লঞ্চে দগ্ধ ১২ জন যাত্রী চিকিৎসাধীন আছেন। সেখানে মোট ৭২ জনকে ভর্তি করা হয়েছিল। অপরদিকে ঝালকাঠী হাসপাতালে ১২ জনকে ভর্তি করা হলেও এখন একজনও নেই।
এখনও কাঁদেন দুই উদ্ধারকর্মী : আগুন নেভাতে গিয়ে লঞ্চে মাত্র একজন জীবিত মানুষ পেয়েছিলেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। প্রাণপন চেষ্টার পরও আনুমনিক অজ্ঞাত শিশুটিকে (৭/৮) শেষ পর্যন্ত জীবিত উদ্ধার করতে পারেননি তারা। এ বেদনায় এখনও ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদেন ঝালকাঠীর ষ্টেশন লিডার শহীদুল ইসলাম ও ফায়ারকর্মী আল আমিন। তারা জীবনের সর্বোচ্চ ঝুকি নিয়ে শিশুটিকে জীবিত উদ্ধারের চেষ্টা চলিয়েছিলেন।
ওই ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে দুজন বলেন, ‘ট্রলারে অবস্থান নিয়ে আগুন নেভাতে পাম্প দিয়ে লঞ্চে পানি নিক্ষেপ করছি। হঠাৎ শুনতে পাই লঞ্চের পেছনের অংশে এক শিশুর চিৎকার। একদম পেছনের অংশে আগুন পৌছায়নি। এক পর্যায়ে শিশুটি টয়লেট কক্ষ থেকে বের হয়ে চিৎকার দিয়ে দ্বিগবিগিদ দৌড়াচ্ছে। লঞ্চের ভেতরে আগুন বাহিরে নদী। নিজেকে রক্ষায় জায়গা খুঁজছে সে। শিশুটিকে উদ্ধারের চেষ্টা চালাই। আগুনের তাপ থেকে রক্ষার জন্য পানির কুয়াশা তৈরী করে তাকে লঞ্চের ভেতরে ঢোকার ইশারা করি। সে সামনের দিকে এগুতেও থাকে। এক পর্যায়ে লঞ্চের শেকলের সঙ্গে পায়ে হোচট খেয়ে উপুর হয়ে পড়ে যায়। আল আমিন বলেন, জীবনের ঝুকি নিয়ে জলন্ত লঞ্চের মধ্যে ঢুকে শিশুটিকে কোলে তুলে নেই। কোলের মধ্যেই ৩-৪ বার ছটফট করে শিশুটি মারা যায়। তার নাক দিয়ে রক্তক্ষরন ছাড়া আর কোন ক্ষত পাইনি। বুধবার দুপুরে ঝালকাঠী ফায়ার ষ্টেশনে ওই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে ওঠেন উদ্ধারকর্মী শহীদুল ও আল আমিন।##
২০২২-০১-০৭
